নীলমকে উদ্ধার করে পাকিস্তান ফেরত পাঠিয়েছে, সে তার মা-বাবার কাছে আসতে চায়, পুলিশ অফিসার এই খবরটা দেবার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমটা সমস্ত কলোনি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরক্ষণে তড়িৎপ্রবাহ খেলে যায়। তখন কৌতূহলের বদলে চারদিকে শুরু হল গুঞ্জন, উত্তেজনা, তুমুল চাঞ্চল্য।
যে মেয়ে খোয়া গেছে, যার স্মৃতি প্রায় ঝাপসা হয়ে এসেছে সে যে কোনওদিন ফিরে আসবে, কে ভাবতে পেরেছিল? রাজিন্দর একেবারে বিহ্বল হয়ে পড়ে। তারপর অবোধ বালকের মতো দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে ওঠে। অজিত দিশেহারা। পুলিশ অফিসারের দিকে পলকহীন তাকিয়ে ছিল সে। জানকী একটি কথাও বলছিল না। কেউ বুঝি তার বাকশক্তি হরণ করে নিয়েছে। এমনভাবে সে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন এক পাথর-প্রতিমা। শুধু দুচোখ বেয়ে জলের ধারা বয়ে যাচ্ছিল। অথর্ব মহালছমীর মস্তিষ্কে ক্ষণিকের জন্য হয়তো সাড় ফিরে এসেছিল। হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে দুর্বোধ্য, জড়ানো গলায় সমানে চিৎকার করে যাচ্ছিল সে। অদৃশ্য কোনও অস্ত্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন জন্তুর মতো। রাজিন্দাদের বুকের ভেতরকার যে দগদগে ক্ষতটা শুকিয়ে এসেছিল সেটা ফের রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে।
পুলিশ অফিসার সহৃদয় গলায় বলেছিলেন, কাঁদবেন না সিংজি। আজ তো আপনাদের আনন্দের। দিন। আমার সঙ্গে হোমে চলুন। মেয়েকে নিয়ে আসবেন। আমি নিজে পৌঁছে দিয়ে যাব।
হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে সম্বিত ফিরে পেয়েছিল যেন রাজিন্দর। কী ভেবে হাতজোড় করে বলেছে, কৃপা করকে আপ থোড়া ঠহরিয়ে মা আর স্ত্রীকে নিয়ে ভেতর দিকের একটা ঘরে চলে গিয়েছে সে। খানিকক্ষণ পর ফিরে এসে, ভাঙা গলায় বলেছিল, আমি যাব না। নীলম যেখানে আছে সেখানেই থাক।
অফিসার চমকে ওঠেছেন, মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে। কত আশা নিয়ে আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছে, ভাবতে পারবেন না। ও যাতে অতীত ভুলে যেতে পারে–
এদিকে উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠেছে সুরেশ, এ আপনি কী বলছেন রাজিন্দর চাচা! প্রিয় নারীটিকে প্রায় ভুলতেই বসেছিল সে। হঠাৎ নীলম ফিরে আসায় তার সৌরজগৎ ওলটপালট হয়ে গেছে।
রাজিন্দর পুলিশ অফিসার বা সুরেশের কথার উত্তর দেয়নি। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, তার মনোভাবটা বোঝা যাচ্ছিল। যে মেয়ে দাঙ্গার সময় লুট হয়ে গেছে, যে ধর্ষিত, নিজের অনিচ্ছাসত্ত্বেও যাকে দিনের পর দিন ঘৃণ্য জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে বাড়িতে ঠাই দিলে লোকে কী বলবে? বাকি জীবন কারও দিকে মুখ তুলে তাকানো যাবে? মাত্র কটা বছরে ভারত নামে এই ভূখণ্ডটি জুড়ে কত কীই তো ঘটে গেল। দাঙ্গা, গণহত্যা, দেশভাগ, লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ওপার থেকে এপারে আসা, এপার থেকে ওপারে চলে যাওয়া। আদ্যোপান্ত বদলে গেছে কত কিছুই। কিন্তু বিনাশ নেই সংস্কারের। ধর্ষিত মেয়েকে ফিরিয়ে নেওয়াটা মহাপাতক। পূর্ব-পুরুষের যে-সব আত্মা পঞ্চভূতে মিশে আছে তারা কোনওদিনই ক্ষমা করবে না। এই বদ্ধমূল বিশ্বাস, এই ধারণা থেকে মুক্তি নেই রাজিন্দরদের।
পুলিশ অফিসার অনেক বুঝিয়েছেন কিন্তু মুখ তোলে নি রাজিন্দর। কিছুই যেন শুনতে পাচ্ছিল না। একেবারে বধির।
অনেক বুঝিয়েও যখন কাজ হল না, হতাশ সুরে অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, কী হবে মেয়েটার? সে আপনার নিজের সন্তান
এবার মুখ খুলেছে রাজিন্দর। ক্ষীণ, কাঁপা গলায় বলেছে, এটাই ওর নসিব স্যার। সরকার আছেন, ভগোয়ান আছেন, তাঁরাই ওকে দেখবেন।
এতক্ষণ নীরবে সব শুনে যাচ্ছিল সুরেশ। হঠাৎ সে ফেটে পড়েছে, আপনারা কি মানুষ রাজিন্দর চাচা? অফিসারের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করছিল, আমি কি নীলমের সঙ্গে দেখা করতে পারি স্যার?
অফিসার একটু অবাক হয়েছেন, আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।
সুরেশ নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছে, লাহোরে নীলমরা আর আমরা একই মহল্লায় থাকতাম। পার্টিশানের পর রাজিন্দর চাচাঁদের সঙ্গে দিল্লি চলে আসি। এই কলোনিতেই ওঁদের কাছাকাছি বাড়ি করেছি–
অফিসার কী ভেবে বলেছেন, আচ্ছা, চলুন আমার সঙ্গে
সুরেশ সেদিনই শুধু যায়নি। তারপর আরও কয়েকদিন গেছে। শেষবার উদ্ধার আশ্রমে গিয়েছিল দুসপ্তাহ পর। সঙ্গে তার বাবা। কলোনিবাসীদের চমকে দিয়ে সেদিনই ফিরে এসেছিল নীলমকে নিয়ে। পুলিশ এবং হোমের কর্মকর্তাদের সামনে, বাবার মত নিয়ে সে নীলমকে বিয়ে করেছে।
পৃথিবীর কারওকে তোয়াক্কা করেনি সুরেশ। কে কী বলল, না-বলল, গ্রাহ্য করেনি। যাবতীয় সংস্কার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে যৌবনের বিপুল অহঙ্কারে নিজের কাম্য নারীটিকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে। ….
কাগজের প্রতিবেদনটা এখানেই শেষ। পড়ার পর অনেকক্ষণ নিঝুম বসে থাকে বিনয়। তার এবং সুরেশের জীবনের ঘটনা তো প্রায় একই। সুরেশ পেরেছে। কিন্তু আকাশ পাতাল চিরে ফেড়ে চিৎকার করে সে বলতে পারেনি, হবার হবে, ঝিনুককে আমি বিয়ে করব।
আত্মগ্লানিতে মন ভরে যায় বিনয়ের। নিজেকে শতবার ধিক্কার দেয়। সে ভীরু। সে অপদার্থ। সে কাপুরুষ। কেঁচোর মতো মেরুদণ্ডহীন।
একসময় টের পেল, পায়ের তলায় মেঝেটা ঢেউয়ের মতো দুলছে। আবছা হয়ে যাচ্ছে চারদিক। মাথাটা সোজা রেখে বসে থাকা যাচ্ছে না। হুড়মুড় করে টেবলের ওপর ভেঙে পড়ল বিনয়।
লম্বা টেবলটার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে খুব মগ্ন হয়ে দিল্লি বম্বের কাগজগুলোর পাতা উলটে যাচ্ছিল সুধেন্দুরা। আচমকা ভারী কিছু পড়ার আওয়াজ কানে আসতে সবাই চমকে ওঠে।
