সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের ত্রাণ এবং পুনর্বাসন দপ্তর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে আসা মানুষদের জন্য ঢালাও সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে। সামান্য লেখাপড়া জানলেই হাজারটা কাজের সুযোগ। যারা ব্যবসা করতে চায় তাদের বিনা সুদে কিংবা নামমাত্র সুদে ঋণ। তবে অনুদানই বেশি। হাতের কাজ শেখার জন্য কত যে পলিটেকনিক খোলা হয়েছে তার হিসেব নেই। স্থায়ী বাসস্থানের জন্য দেওয়া হচ্ছে জমি। যত তাড়াতাড়ি এদের স্বয়ম্ভর করে তোলা যায় সেজন্য চেষ্টার ত্রুটি নেই।
রাজিন্দররা অন্য সবার মতো জমি পেল। বাড়ি তৈরির জন্য টাকা পেল। সে টাকার বেশিটা ফেরত দিতে হবে না। বাকিটা সুদহীন লোন। তাও পনেরো বছর ধরে কিস্তিতে কিস্তিতে শোধ করলে চলবে।
লাহোরের একটা বড় মার্কেটে রাজিলরদের বিরাট কাপড়ের দোকান ছিল। তিন-চার পুরুষের ব্যবসা। বিজনেসটা তাদের রক্তে। দিল্লিতে এসে বাড়ি তৈরির জন্য সরকারি টাকা তো পেয়েছিলই, ব্যবসার জন্য লোন নিয়ে কাছাকাছি একটা মার্কেটে কাপড়েরই দোকান খুলে বসল রাজির। একমাত্র ছেলে অজিত লাহোরে ক্লাস টেনে পড়ত। তাকে দিল্লির স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হল।
লাহোরের দাঙ্গার পর রাজিলরদের মনে হতো, পৃথিবী নামে এই গ্রহটায় আলো নেই। বাতাস নেই। সব থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে চাপ চাপ অন্ধকার। আকাশ খান খান হয়ে ভেঙে পড়েছে কিন্তু সময় এক আশ্চর্য জাদুকর। ধীরে ধীরে অন্তহীন শোক, অশেষ যন্ত্রণাও ভুলিয়ে দেয়। মুছে দেয় যাবতীয় সন্তাপ।
জীবনকে পাকিস্তান থেকে উপড়ে এনে সীমান্তের এপারে নতুন করে গড়ে তুলতে তুলতে লাহোরের আগুন, হত্যা, রক্তপাত, ধর্ষণের স্মৃতি ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে রাজিরদের কাছে। অনেকটা জলে ধোওয়া ঝাপসা ছবির মতো।
নতুন দেশে, সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশে ব্যবসা জমিয়ে তুলতে হবে। সারাদিনই রাজিন্দরের ব্যস্ততা। অজিত বরাবরই লাহোরে ভাল রেজাল্ট করত। দিল্লিতে এসে ভর্তি হবার পর তার একমাত্র ধ্যান জ্ঞান আরও ভাল করতে হবে। সকালে উঠে পড়াশোনা, তারপর স্কুল, স্কুলের পর প্রাইভেট টিউটরের কাছে ছোটা। এক মুহূর্তও তার ফুরসত নেই। রিলিফ ক্যাম্পে থাকার সময় জানকীর কোনও কাজ ছিল না। ক্যাম্প থেকেই চার বেলা খাবার দেওয়া হতো। তখন সমস্ত দিনই অবসর। কিন্তু ত্রাণ শিবির থেকে নতুন বাড়িতে উঠে গিয়ে ফের সংসার শুরু করার পর তারও বসে থাকার জো নেই। কাজের লোক রাখার মতো রোজগার তখনও হয়নি রাজিলরের। ব্যবসা সেভাবে দাঁড়ায় নি। ফলে সংসারের যাবতীয় :জ একাই সামলাতে হতো জানকীকে। দুবেলা রান্না, কাপড় কাঁচা, ঘর বোয়ামোছা, ইত্যাদি। তারই কে ফাঁকে যখন নীলমকে মনে পড়ত, চোখ বুজে চুপচাপ বসে থাকত সে। বুকের ভেতরটা আমূল উথালপাতাল হয়ে যেত। কিন্তু কতক্ষণ আর! সংসারের শত কাজ পড়ে আছে। অনিচ্ছুক শরীরটাকে টেনে তুলতে হতো তাকে। রাজিন্দরের মা মহালছমীর যথেষ্ট বয়স হয়েছিল। লাহোর থেকে আসার পর জানকীর মতো সেও নাতনির জন্য বুক চাপড়ে কাঁদত। কিন্তু রিলিফ। ক্যাম্পে থাকতে থাকতেই কেমন যেন অথর্ব হয়ে পড়েছিল সে। নতুন বাড়িতে আসার পর একেবারে। জবুথবু। বোধবুদ্ধি অসাড় হয়ে যাচ্ছিল তার। কেউ কিছু বললে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত।
সুরেশরাও একই কলোনিতে বাড়ি তুলেছিল। লাহোরের মতো তারা এখানেও রাজিন্দরদের পড়োশি। ইন্ডিয়ায় আসার পর রিলিফ ক্যাম্পে সারাক্ষণ আচ্ছন্নের মতো কেটে যেত তার। কিন্তু সময় তো এক জায়গায় থেমে থাকে না। লাহোরে ফোর্থ ইয়ারে পড়ত সুরেশ। একদিন দিল্লির • কলেজে ভর্তি হল। বি এ পাস করে ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গেল। তার বাবা ধনরাজ কাপুর লাহোরের একটা কলেজে পড়াতেন। পণ্ডিত মানুষ। তিনি দিল্লির কলেজেও কাজ পেয়ে গেলেন।
কলোনিতে বাড়ি তৈরি করার পর গোড়ার দিকে সুরেশ রোজই রাজিন্দরদের বাড়ি দিনে বা রাতে একবার করে আসতই। এলে একই আলোচনা-নীলম, দাঙ্গা, দুঃস্বপ্নের মতো সেই দিনগুলোর কথা ভেবে অবিরল শিউরে ওঠা। পরে সুরেশের আসাটা কমে যেতে লাগল। সপ্তাহে একবার, আরও পরে ক্কচিৎ কখনও। আসলে নানাভাবে জড়িয়ে পড়ছিল সে। পড়াশোনার চাপ। ইউনিভার্সিটি। নতুন নতুন বন্ধুবান্ধব। পুরানো দুঃখের স্মৃতিতে কতদিন আর ডুবে থাকা যায়?
যত দিন যাচ্ছিল, লাহোরের দাঙ্গায় লুট হয়ে যাওয়া একটি যুবতী তার মা-বাবা-ভাই এবং অন্য সব আপনজনের কাছ থেকে দূরে, আরও দূরে সরে যাচ্ছিল। হয়তো চিরদিনের মতো নীলম লুপ্ত হয়ে যেত, কিন্তু গেল না।
দেশভাগের পর পরই ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তানে রেসকিউ কমিটি গড় হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের কমিটি হঠাৎ একদিন লাহোরের এক বাড়ি থেকে নীলমকে উদ্ধার করে দিল্লিতে পাঠিয়ে দেয়। তাকে তোলা হয় একটা হোমে। পাকিস্তানে যে মেয়েদের ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাদের খুঁজে বার করে এই উদ্ধার আশ্রমে রাখা হয়।
নীলমের কাছ থেকে তার মা-বাবা-ভাই এবং ঠাকুমা সম্পর্কে সবিস্তার জেনে নিয়ে দিল্লি পুলিশের একজন অফিসার আর দুই কনস্টেবল খুঁজে খুঁজে এক রবিবারের বিকেলে কলোনিতে রাজিলরদের বাড়িতে এসে হাজির। ছুটির দিন। লোকজন বিশেষ কেউ বেরোয়নি। যে যার বাড়িতেই ছিল। পুলিশ দেখে সবাই ছুটে এসে ভিড় জমায়। তাদের সঙ্গে সুরেশও। সবার চোখেমুখে তীব্র কৌতূহল। প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা।
