এই পটভূমিতে প্রতিবেদক নীলম নামে মেয়েটির কথা সবিস্তার জানিয়েছেন।
সাতচল্লিশে, স্বাধীনতার কিছু আগে, দেশজোড়া সেই দাঙ্গার সময়, সশস্ত্র হিংস্র ঘাতকের দল একদিন রাতে মশাল জ্বালিয়ে তুমুল হল্লা করতে করতে লাহোরের বড় একটা মহল্লায় ঢুকে পড়েছিল। এলাকাটা পাঁচমেশালি। নানা ধরনের মানুষ সেখানে থাকত। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, হাতে-গোনা কটি খ্রিস্টান পরিবারও। হানাদারদের টার্গেট হিন্দু এবং শিখেদের বাড়িগুলো। তেমন বাড়ি পাওয়ামাত্র পেট্রোল বা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। দাউ দাউ জ্বলতে জ্বলতে বাড়িগুলো চোখের সামনে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। প্রাণ বাঁচাতে ভয়ে, আতঙ্কে উদ্ভ্রান্তের মতো যারা ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল, শুধু তরুণীরা বাদে বাকি সবাই মুহূর্তে লাশে পরিণত হচ্ছিল।
মহল্লার যে মানুষগুলো কয়েক পুরুষ পাশাপাশি বাস করে এসেছে তাদের সকলে সেই নিদারুণ দুঃসময়ে পশু হয়ে য়নি। চিরকাল এমন অনেকেই আছে, হাজার উসকানিতেও তারা অটল থাকতে পারে। মনুষ্যত্ব জলাঞ্জলি দেবার কথা ভাবতেই পারে না। এই ধরনের কিছু মানুষ বিপন্ন শিখ এবং হিন্দু পড়োশিদের বাঁচাতে ছুটে এসেছিল। কিন্তু হানাদার ঘাতক বাহিনীকে পুরোপুরি ঠেকাবার শক্তি তাদের ছিল না।
মহল্লার বেশ কিছু বাড়ি ধ্বংসস্তূপ আর বেশ কিছু জীবন্ত মানুষকে লাশ বানিয়ে পঁচিশ তিরিশটি তরুণীকে জোর করে টানতে টানতে নিয়ে চলে গিয়েছিল দাঙ্গাবাজরা। এই মেয়েদের একজন নীলম। তারা হিন্দু, জাঠ।
নীলমদের ছিল মাঝারি ধরনের পরিবার। বাবা, মা, ঠাকুমা, ছোট একটা ভাই এবং সে নিজে। বাড়িতে আগুন লাগানোর পর বাইরে বেরিয়ে দিশেহারার মতো যে যেদিকে পারে পালিয়ে গিয়েছিল। হানাদারেরা তাদের নাগাল পায়নি। বাড়ির সবাই পারলেও নীলমের পক্ষে পালানো সম্ভব হয়নি।
নীলমের বাবার নাম রাজিন্দর সিং। মা জানকী। ছোট ভাই হল অজিত। ঠাকুমার নাম মহালছমী।
রাজিন্দর আর জানকী মহল্লা থেকে অনেকটা দূরে একটা জংলা মতো জায়গায় ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছিল। অজিত আরও দূরে প্রকাণ্ড এক তালাও অর্থাৎ দিঘিতে চাপ-বাঁধা টোপা পানার ভেতর গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে ছিল। আর তাদের মহল্লারই এক প্রতিবেশী জামাল খান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মহালছমীকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিল।
দাঙ্গা থামাবার জন্য তখন সবে মিলিটারি নামানো হয়েছে। একটা টহলদার ভ্যান আচমকা ভোরের দিকে এসে নানা জায়গা থেকে রাজিন্দরদের উদ্ধার করে শেখপুরার রেসকিউ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়। শুধু রাজিরদেরই নয়, ব্যাপক খুনখারাপির পর মহল্লার যে কজন বেঁচে ছিল, তাদেরও। দেশভাগের পর তারা চলে আসে দিল্লি। শুধু নীলম পড়ে থাকে লাহোরে। পুলিশ এবং মিলিটারিকে জানানোও হয়েছিল তার কথা। তখন চারদিকে লুটপাট, হত্যা। পুলিশ বা মিলিটারি সে-সব ঠেকাবে, না সারা লাহোরের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে নীলমকে উদ্ধার করে আনবে? এমন ঘটনা তো একটা দুটো নয়–অগুনতি।
মেয়ের জন্য একেবারে ভেঙে পড়েছিল রাজিররা। দিল্লিতে যখন এল, পুরোপুরি বিধ্বস্ত। লাহোরের সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি সারাক্ষণ তাদের বুকে শেল বিধিয়ে দিত। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে নীলমের মুখটা যেন ভাসতে থাকত। লহমার জন্যও তাকে ভোলা যেত না। তখন চোখ মেললেও নীলম, চোখ বুজলেও নীলম। সে যে কী তীব্র যন্ত্রণা! কী নিদারুণ ক্লেশ! শোকাচ্ছন্ন রাজিন্দর, জানকী, মহালছমী আর অজিত খেত না, ঘুমতো না। জানকী আর মহালছমী অবিরল কেঁদেই যেত। কেঁদেই যেত। এই কান্না কোনওদিনই বুঝি বা শেষ হবে না।
শুধু রাজিন্দররাই না, আরও একটি যুবক নীলমের জন্য ভেঙেচুরে শতখান হয়ে গিয়েছিল। সে সুরেশ। লাহোরে একই মহল্লায় তারা থাকত। নীলমের সঙ্গে একই কলেজে পড়ত সে। নীলম সেকেন্ড ইয়ারে, সে ফোর্থ ইয়ারে। একই এলাকায় তাদের জন্ম, তাদের বড় হয়ে ওঠা, একই কো-এড স্কুল এবং কলেজে তাদের পড়াশোনা। হঠাৎ একদিন কোনও অদৃশ্য মায়াবী নকিব জানান দিয়ে গেল, একজনকে ছাড়া আর-একজনের চলবে না। এক মহল্লায় আলাদা আলাদা বাড়িতে নয়, একই বাড়িতে, একসঙ্গে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে হবে। তারা ঠিকই করে ফেলেছিল, পড়াশোনা শেষ হলে আর সুরেশের চাকরি বাকরি জুটলে দুই বাড়িতে তাদের সবচেয়ে জরুরি সিদ্ধান্তের কথাটা জানিয়ে দেবে। কিন্তু তার আগেই লাহোরের দাঙ্গায় সমস্ত তছনছ। সব স্বপ্ন ছিন্নভিন্ন। নানা রঙে ভবিষ্যতের যে ঝলমলে নকশাটা তারা এঁকেছিল, চকিতে বিলীন হয়ে গেল।
জোর করে নারীহরণের ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানে বিশেষ কোনও তফাত নেই।
লেখাটা পড়তে পড়তে গাঢ় বিষাদে মন ভরে যাচ্ছিল বিনয়ের। খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকে সে। তারপর বাকি অংশটুকু পড়তে শুরু করে। ..
দিল্লিতে আসার পর কয়েক মাস ত্রাণশিবিরে কেটে যায় রাজিন্দরদের। শহরতলিতে নতুন নতুন কলোনি তৈরি হচ্ছিল। তার একটায় আরও অনেকের সঙ্গে তাদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এদের বেশির ভাগই লাহোর থেকে আসা উদ্বাস্তু। তাদের কারও কারও সঙ্গে সীমান্তের ওপারে থাকতেই পরিচয় ছিল রাজিরদের। কেউ কেউ লাহোরে একই মহল্লায় থাকত। যেমন সুরেশরা। ওদের খুবই ছোট্ট পরিবার। সে আর তার বাবা ধনরাজ কাপুর। সুরেশের মা তার ছেলেবেলায় মারা গেছেন। তার কোনও ভাইবোন নেই।
