ঢোক গিলে বিনয় বলল, সুধেন্দুদা, আমাকে একটু হেল্প করবেন?
সুধেন্দু তাক থেকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ফাইল নামাতে নামাতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো, কীসের হেল্প?
বিনয় তার সমস্যার কথা বলল।
হু, বুঝেছি। পয়লা দিন থেকেই জ্বালানো শুরু হল। এরপর এটা করে দাও, সেটা করে দাও এরকম চলতে থাকবে। আমার লাইফ মিজারেবল করে ছাড়বে দেখছি। বলে ভুরু কুঁচকে কী একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, এক কাজ কর, দিল্লির পেপারগুলো দেখ। শুনেছি, তোমাকে রিফিউজিদের ব্যাপারে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। ইস্ট পাকিস্তান থেকে যেমন লাখ লাখ মানুষ চলে আসছে তেমনি ওয়েস্ট পাকিস্তান থেকে আসছে হিন্দু আর শিখেরা। হিন্দুস্থান টাইমস কি দিল্লি এডিশনের কাগজগুলোতে ওদের খবর বেশি থাকে। মনে হয়, তোমার লেখার মতো ভাল মেটিরিয়াল পেয়ে যাবে।
দিল্লির নানা পত্রিকা ঘাঁটাঘাঁটি করে আপাতত গেল মাসের একটা ডেইলির ফাইল নিয়ে মাঝখানের প্রকাণ্ড টেবলটায় এসে বসল বিনয়। সুধেন্দুরাও এক-একটা ঢাউস ফাইল নিয়ে বসে পড়েছে।
বিনয় ধীরে ধীরে কাগজের পাতা উলটে যাচ্ছিল। কলকাতার পত্রিকাগুলোর মতো এখানেও প্রায় প্রতিদিনের প্রথম পাতার বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে কাশ্মিরের খবর। পশ্চিম সীমান্তের ওপার থেকে হানাদার বাহিনী সেখানে এসে অবিরাম উৎপাত চালাচ্ছে। পাকিস্তানি ফৌজ সমানে তাদের মদত দিয়ে যাচ্ছে। মনোরম ভূস্বর্গে রোজ আগুন। রোজ হত্যা। রোজ রক্তপাত। দেশভাগের। সময় থেকে সেই যে অশান্তি শুরু হয়েছিল, যত দিন যাচ্ছে সেটা ক্রমশ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। এই সমস্যার কোনওদিনই বুঝি বা অবসান ঘটবে না।
বিনয়ের মনে পড়ল, বেশ কিছুদিন আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লা খান বলেছিলেন, কাশ্মিরে ইউ এন ওর হস্তক্ষেপ চাই। তখন থেকে ছোট-বড় সব পাকিস্তানি নেতাই তারস্বরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মেদিনী কাঁপয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের প্রতিনিধিদের কাশ্মিরে আসতে হবে। আসতেই হবে।
কাশ্মির ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ভাষণ প্রায় প্রতিদিনই থাকে। সম্প্রতি এশিয়ায় নতুন স্বাধীন এক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। বার্মা। সে দেশের রাষ্ট্রপতি সাও সোয়ে যাইক এবং প্রধানমন্ত্রী থাকিন নু সারা পৃথিবীর, বিশেষ করে ভারতের বন্ধুত্ব প্রার্থনা করেছেন। মাঝে মাঝে তাদের খবরও চোখে পড়ছে। একদিনের কাগজে দেখা গেল, বেশ কিছু মুসলিম এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সরকারি অফিসার দেশভাগের সময় অপশন দিয়ে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই নানা অসুবিধার কারণে ইন্ডিয়ায়, তাদের ফেলে-যাওয়া স্বদেশে ফিরে আসতে চাইছেন।
দেশ-বিদেশের নানা সংবাদের মাঝখানে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুরা নেই বললেই চলে। তবে পশ্চিম পাঞ্জাব কি সিন্ধু থেকে উৎখাত হয়ে আসা মানুষের অনন্ত দুর্দশার সবিস্তার বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। সেই সঙ্গে দিল্লির চারপাশের ত্রাণ-শিবিরগুলোর ছবিও।
পাতা ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় চোখ আটকে গেল বিনয়ের। তিন কলম জুড়ে বিরাট একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। বড় বড় হরফে যে শিরোনাম রয়েছে, বাংলায় তর্জমা করলে তা এইরকম দাঁড়ায়। করাচি থেকে এক অপহৃত তরুণীকে উদ্ধার করে ভারতে প্রেরণ : যুবকের মহত্ত্ব।
পড়তে পড়তে বুকের ভেতরটা অসাড় হয়ে আসতে থাকে বিনয়ের। অবিকল ঝিনুকেরই কাহিনি। শুধু শেষটা অন্যরকম।
বিনয় জানে, দেশভাগের আগে আগে বাংলাদেশের মতো সিন্ধু এবং পাঞ্জাবেও ভয়াবহ দাঙ্গা হয়ে গেছে। এই দুই প্রভিন্সে, বিশেষ করে পাঞ্জাবে তখন প্রতিদিন গণহত্যা। রক্তের সমুদ্র বয়ে গিয়েছিল সেখানে। বড় বড় শহরেই শুধু নয়, সুদূর দুর্গম গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছিল তাণ্ডব। সারা পাঞ্জাব আর সিন্ধু তখন কসাইখানা।
হত্যার পাশাপাশি একটানা চলেছে আগুন, ধর্ষণ। বিনয় একটা ব্যাপার লক্ষ করেছে, সব জায়গায়–তা বাংলা হোক, বিহার হোক বা পাঞ্জাব-হননকারীদের মূল টার্গেট তিনটে। প্রপার্টি, মানুষের প্রাণ আর নারী। দাঙ্গার সময় শয়ে শয়ে যুবতী লুট হয়ে গেছে।
বাংলার মতো সাতচল্লিশের পনেরোই আগস্ট পাঞ্জাবও দুটুকরো হয়ে গিয়েছিল। দেশভাগের আগে এবং পরে লাহোর থেকে ট্রেন বোঝাই হয়ে শরণার্থীরা চলে এসেছিল অমৃতসর, দিল্লি কি লুধিয়ানায়। অনেকে কানপুর, বম্বে এবং কলকাতাতেও। তেমনি এপার থেকেও ট্রেন বোঝাই হয়ে উদ্বাস্তু গেছে সীমান্তের ওধারে। এমনও শোনা গেছে, দাঙ্গার সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে কোনও কোনও ট্রেনে এসেছে শুধুই লাশ। তেমনি পাকার মৃতদেহ নিয়ে সেই সব ট্রেন ওপারে ফিরে গেছে। লাশের বদলে লাশ। হত্যার বদলা হত্যা।
দেশভাগের পরও ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হওয়া মানুষের সীমান্তের এপার থেকে ওপারে যাওয়া, কিংবা ওপার থেকে এপারে আসা বন্ধ হয়নি। কবে যে এর অবসান ঘটবে, আদৌ ঘটবে কি না, কে জানে।
লাখে লাখে মানুষ এসেছে, ক্রমাগত আরও আসছে, কিন্তু যে তরুণীদের ছিনিয়ে নিয়ে গেছে হানাদারেরা তাদের শতকরা দুজনও ফিরে আসেনি।
নতুন ভারত-এর লাইব্রেরিতে বসে বিনয় এই মুহূর্তে দিল্লির কাগজের যে প্রতিবেদনটা পড়ছিল তাতে ছেচল্লিশের আগস্ট থেকে ধারাবাহিক দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে এনে লেখা হয়েছে, দুই দেশের সরকার উদ্ধার কমিটি তৈরি করেছিল বেশ কিছুদিন আগে। তাতে পদস্থ অফিসাররা ছাড়াও রয়েছেন সমাজসেবী এবং নানা ক্ষেত্রের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিশিষ্ট জনেরা। এঁদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দাঙ্গায় লুট হয়ে যাওয়া তরুণীদের খুঁজে বার করে যেন সরকারের হাতে তুলে দেন। ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তান সরকার এই লাঞ্ছিত মেয়েদের মা-বাবা, স্বামী কি আত্মীয় পরিজনের হাতে পৌঁছে তুলে দেবে। যদি কারও আপনজনের সন্ধান না পাওয়া যায়, সংশ্লিষ্ট সরকার তার সুরক্ষার ব্যবস্থা তো করবেই, ভবিষ্যতে সে যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে তার সুযোগও করে দেবে।
