যশোর ডিস্ট্রিক্টে। এখন ইস্ট পাকিস্তান
তুমি তাহলে হাফ বাঙাল?
বুঝতে না পেরে সুধেন্দু বলল, হাফ বাঙাল মানে?
পদ্মার ওপারের মালগুলো হল রিয়েল বাঙাল। তোমরা না ইস্ট বেঙ্গলের, না ওয়েস্ট বেঙ্গলের। মাজখানে ঝুলে আছো।
দিনির্ণয় যন্ত্রের কাটার মতো রামগোপালের আঙুল রমেনের দিকে ঘুরল, তোমার দেশ?
রমেন বলল, ঢাকায়। ঢাকা সিটিতেই আমরা কয়েক পুরুষ আছিলাম। পার্টিশানের পর কইলকাতায় চইলে আসি। তার গলায় পূর্ব বাংলার টান। কলকাতার ভাষাটা এখনও রপ্ত করে উঠতে পারেনি ঠিকমতো। ঢাকাই ডায়লেক্টের ভেজাল মিশে অদ্ভুত শোনায়।
রামগোপাল কণ্ঠস্বর উঁচুতে তুলে বলে উঠলেন, অ্যাই–অ্যাই হল আসল বাঙাল। এখনও জিভের আড় ভাঙেনি। হাঁ করেচে, অমনি পদ্মার ওপারের গন্ধ বেরুচ্চে ভুর ভুর করে।
এরপর বিনয়ের পালা। তোমার কোথায় হে?
খুব ছেলেবেলার কয়েকটা বছর বাদ দিলে বিনয়ের জীবনের সেরা সময়টাই কেটেছে রাজদিয়ায়। রাজদিয়ার খাল-বিল-নদী, অবারিত ধানের খেত, অফুরান আকাশ, পাখিতে পাখিতে ছয়লাপ মহাশূন্য–এ-সবের মধ্যেই তার বড় হয়ে ওঠা। পূর্ব বাংলার সেই ছোট্ট ভূখণ্ডটিই তার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। রাজদিয়াকেই সে নিজের দেশ মনে করে। বলল, আমার বাড়িও ঢাকায়। তবে ঢাকা সিটিতে নয়। সেখান থেকে অনেকটা দুরে, ছোট একটা মফস্বল টাউনে।
তুমিও বাঙাল! কপালে একটা চাপড় মেরে রামগোপাল বলে উঠলেন, বাঙালে বাঙালে কোলকেতাটা একেবারে ছেয়ে গেল! ছ্যা ছ্যা। যেখনেই যাবে সেখেনেই বাঙাল!
রামগোপালের কথাগুলোর মধ্যে বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ বা ঘৃণা রয়েছে, তা মনে হয় না। বরং এমন একটা লঘু মজার ব্যাপার রয়েছে যে বিনয়রা হেসে ফেলল।
রামগোপাল ফের বললেন, যেভাবে তোমরা ওপার থেকে এসে পঙ্গপালের মতো কোলকেতাটাকে হেঁকে ধরেচ, আমাদের ঘটিদের ন্যাজ গুটিয়ে পালাতে হবে দেকছি।
স্রেফ রগড়। বিনয়রা হাসতেই থাকে।
রামগোপাল থামেননি, তবে হ্যাঁ, একটা কথা মানতেই হবে। তোমাদের হেঁকোড় আচে। ওয়েস্ট বেঙ্গল যদি পাকিস্তানে পড়ত, আমরা যে কী করতুম, ভাবলে ভয়ে গায়ে কাঁটা দেয়।
একটু চুপচাপ।
তারপর রামগোপাল নতুন উদ্যমে শুরু করলেন, রিফুজিরা বনজঙ্গল সাবাড় করে কলোনি হাসাচ্চে, হকারি কোরচে, দোকানপাট খুলচে, যারা লেখাপড়া জানে তারা চাকরি বাকরি জোটাচ্চে। বাঙাল মেয়েগুনোও তাক লাগিয়ে দিলে। মদ্দদের সঙ্গে তারাও কাজকম্মো জোগাড় করে পয়সা রোজগারে নেমে পড়েছে। সিধে কথা, বাঁচতে হবে। আমরা হলে পরতুম না গো। স্রেফ কেতরে পড়তুম। আবার বলচি, তোমাদের হেঁকোড় আচে।
হেঁকোড় কথাটার মানে কী? ক্ষমতা? সাহস? উদ্যম? পরিষ্কার বোঝা না গেলেও আন্দাজ করা যাচ্ছে ওইরকম একটা কিছু। রামগোপালের সঙ্গে যেটুকু আলাপ হয়েছে তাতে অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু শব্দ শেখা গেল যা আগে কখনও শোনেনি বিনয়। কলকাতার অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে তার। কিন্তু তাদের উচ্চারণ বেশ খানিকটা আলাদা। এমন সব শব্দ তাদের মুখ থেকে বেরোয়নি। অথচ রামগোপাল নাকি এই শহরের আদি বাসিন্দা, তার নিজের কথায় তারা কলকাতার প্রাচীন তেলাপোকা। তবে কি সেকেলে কলকাতার বংশধরদের ভাষা টা একটু অন্য ধরনের? প্রথম দিনই তা জিজ্ঞেস করা যায় না। এখন থেকে প্রায়ই তো লাইব্রেরিতে আসতে হবে। পরে ধীরে ধীরে নিশ্চয়ই তা জানা যাবে।
রামগোপালের হঠাৎ যেন কী মনে পড়ে গেল। চিড়িক মেরে উঠে বললেন, আমার সঙ্গে বসে বসে গুলতুনি মারলেই হবে? আপিসের ডিউটি আছে। ওঠ, উঠে পড়। দিল্লি বম্বের কাগজগুনো ওইখানে আচে। যাও হাত উঁচুতে তুলে আঙুল বাড়িয়ে ডানদিকের কোণটা দেখিয়ে দিলেন।
বিনয়রা হতচকিত। যে লোকটা লঘু মেজাজে গল্প করছিলেন, লহমায় তিনি আদ্যোপান্ত বদলে যাবেন, ভাবা যায়নি। ধড়মড় করে সবাই উঠে পড়ে। রামগোপালের আঙুল বরাবর দেওয়ালের কাছে এসে দেখতে পায় সারি সারি চওড়া স্টিলের র্যাক। প্রতিটি র্যাকের মাথায় টিনের পাতে একটা করে কাগজের নাম লেখা আছে। আনন্দবাজার, যুগান্তর, বসুমতী, স্বাধীনতা, স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, হিন্দু, ফ্রি প্রেস জার্নাল, হিন্দুস্থান টাইমস, দা নেশন ইত্যাদি। পুরু শালু দিয়ে প্রতিটি কাগজের এক মাসের সব কপি একসঙ্গে যত্ন করে বাঁধিয়ে এক-একটা তাকে রাখা আছে। দুমাস আগে নতুন ভারত-এর লাইব্রেরি করা হয়েছে। বোঝা যায় তখন থেকেই এইসব কাগজ রাখছেন জগদীশবাবুরা। প্রতি তাকে দুমাসের জন্য দুটো করে ফাইল।
কলকাতার কাগজগুলোর নাম বিনয় জানে। সুধাদের বাড়িতে দুখানা কাগজ রাখা হয়। একটা বাংলা, একটা ইংরেজি। অন্য পত্রিকাও মাঝে মাঝে কিনে আনে হিরণ। কিন্তু এখানে কলকাতার বাইরের যে-সব কাগজ রয়েছে সেগুলোর নাম আগে তো শোনেইনি, কোনটা দেশের কোন শহর থেকে বেরোয় সে সম্পর্কেও তার কোনও ধারণা নেই। সে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই কাগজগুলোর কোনটা থেকে লেখার মালমশলা জোগাড় করা যাবে, কে জানে।
নিরুপায় বিনয় সুধেন্দুদের দিকে তাকায়। এরা সবাই তার চেয়ে চোদ্দ পনেরো বছরের বড়। সাত আট কি দশ বছর ধরে সাংবাদিকতা করে হাড় পাকিয়ে ফেলেছে। খবরের কাগজের কাজের ঘোঁতঘাত নাড়ি-নক্ষত্র সব ওদের জানা।
