সুধেন্দুদের সঙ্গে দোতলায় নেমে এল বিনয়। চারদিক সরগরম। কাঠ আর কাঁচ দিয়ে বানানো কুঠুরিগুলোতে যারা কাজ করছিল তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করে লাইব্রেরির হদিস পাওয়া গেল।
ডানদিকের শেষ প্রান্তে একটা চওড়া দরজার মাথায় পেতলের প্লেটে বড় বড় কালো অক্ষরে লেখা : লাইব্রেরি।
ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল, কামরাটা বিশাল। কম করে তিন শ স্কোয়ার ফিট। দেওয়াল ঘেঁষে উঁচু উঁচু কাঁচের আলমারি বোঝাই নানা ধরনের বই। অর্থনীতি, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, সিনেমা, স্পোর্টস–এমনি কত যে বিষয়। আছে এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে শুরু করে ইয়ার বুক, ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঘরের মাঝখানে মস্ত লম্বা টেবলের দুপাশে পাঁচটা করে চেয়ার। একসঙ্গে দশজন বসে পড়তে পারে। কিন্তু কামরাটা একেবারে ফাঁকা।
কোথায় চালু খবরের কাগজগুলোর কপি রয়েছে, কে জানে। বিনয়রা যখন এধারে ওধারে তাকাচ্ছে, আচমকা কেউ বলে উঠল, এই যে এদিকে শ্লেষ্ম জড়ানো নাকি সুর। সর্দি হলে কিংবা অতিরিক্ত নস্যি টানলে যেমনটা শোনায়।
এবার দেখা গেল, ডানদিকের শেষ মাথায় একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক বসে আছেন। তার সামনে বড় টেবল। টেবলের এপাশে দুটো চেয়ার।
বিনয়রা এগিয়ে গেল। ভদ্রলোকের রং ধবধবে ফর্সা। চেহারা গোলগাল, নাড়ুগোপাল মার্কা। ভীষণ শীতকাতুরে। পরনে ধুতি এবং পাঞ্জাবির ওপর সোয়েটার। তার ওপর চাদর। গলায় মাফলার জড়ানো। ঠাণ্ডা যাতে না লাগে সেজন্য নিজেকে দুর্ভেদ্য করে রেখেছেন। হাতে ঢাউস একটা বই। খুব সম্ভব সেটা পড়ছিলেন।
বইটা টেবলে নামিয়ে রেখে ভদ্রলোক বললেন, আগে তো চাঁদবদনদের দেখিনি। নতুন ভারত এ নতুন আমদানি বুঝি! তার বলার ভঙ্গিতে একটা মজাদার ব্যাপার আছে।
সুধেন্দু বলল, হ্যাঁ। আজই আমরা জয়েন করেছি। দিল্লি বম্বের ইংরেজি ল্যাংগুয়েজের কাগজগুলোর লাস্ট মাস্থের সব কপি দেখতে চাই। দয়া করে
হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, হবে হবে, সব হবে। আগে একটু গা-শোঁকাকি হোক। বিনয়দের পা থেকে মাথা অবধি নিরীক্ষণ করলেন, হাঁটুর বয়িসি সব ছেলে। তোমাদের কিন্তু তুমি করে বলছি—
লোকটাকে বেশ ভাল লেগে গেল বিনয়ের। গা-শোঁকাকি শুনে আন্দাজ করে নিল আলাপ পরিচয় করতে চাইছেন।
এদিকে সুধেন্দু বলে উঠেছে, তুমি করেই তো বলবেন।
আমার সামনে মোটে দুখানা চেয়ার। তোমরা চারজন। ওখেন থেকে আর দুখানা টেনে এনে বোসো দিকিন। বলে ভদ্রলোক ঘরের মাঝখানের মস্ত পড়ার টেবলটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিলেন।
বিনয়রা চেয়ার এনে ভদ্রলোকের মুখোমুখি বসে পড়ল। তিনি এবার বললেন, প্রথমে নিজের কথা বলি। আমার নাম রামগোপাল দত্ত। আমরা দত্তরা কোলকেতার খাস বাসিন্দে। কত জেনারেশন ধরে এখেনে আচি, হিসেব নেই। দেড়শ বছর আগে আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা, নাকি তারও ঠাকুরদা এই শহরে এসে শেকড় গেড়েছিল। আমার গায়ে নাক ঠেকালে সেকেলে কোলকেতার গন্ধ পাবে। সে যাক গে, আমি দত্ত বংশের কুলাঙ্গার। আমার বাপ-ঠাকুরদারা টাকা ছাড়া কিচ্ছুটি বুঝত না। ব্যবসা করে প্রচুর পয়সা কামিয়ে গেছে। আমি আবার বই ছাড়া কিছু বুঝি না। পৃথিবীতে কত জানবার আচে। বই ছাড়া জানব কী করে? বি এ পাস করার পর বনের মোষ তাড়ানো শুরু করলাম। মানে একটা বড় পাবলিক লাইব্রেরি চালাতাম। নতুন ভারত-এর মালিক জগদীশবাবুর সঙ্গে একটু আধটু জানাশোনা ছিল। তিনি হিড়হিড় করে টেনে এনে এখানে জুড়ে দিলেন। বললেন, ভাল একটা লাইব্রেরি করতে হবে। লাইব্রেরি ছাড়া কাগজ চলে না। জার্নালিস্টরা যে লিখবে, তার জন্যে নানা রেফারেন্সের বই দরকার। ভুল বেরুলে কাগজের বদনাম হয়ে যাবে। রিডার নতুন ভারত চিমটে দিয়েও ছুঁয়ে দেখবে না। মনের মতন কাজ পেয়ে চান-খাওয়া শিকেয় তুলে দুমাসে এই লাইব্রেরি খাড়া করেছি। এখনও অনেক কাজ বাকি। আরও বইটই কিনতে হবে। বলে পকেট থেকে একটা নস্যির কৌটো বার করে বড় এক টিপ নস্যি নিয়ে নাকে পুরলেন। তারপর ঝিম মেরে চোখ বুজে বসে রইলেন। নস্যির ঝঝটা মস্তিষ্কে চারিয়ে যাচ্ছে। সেটা তিনি বেশ উপভোগ করছেন।
বিনয় যা আঁচ করেছিল সেটা মিলে গেল। তাদের লাইব্রেরিয়ানের নস্যির নেশা আছে।
কিছুক্ষণ বাদে চোখ মেলে পটকা ফাটার মতো আওয়াজ করে নাক ঝেড়ে রুমালে মুছে নিলেন। রামগোপাল। তারপর বললেন, আমার সম্বন্ধে পরে আরও জানতে পারবে। এবার তোমাদের ঠিকুজি শোনা যাক। নামগুলো বল
সুধেন্দুরা তাদের নাম জানিয়ে দিল।
কে কোন ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হলে?
রিপোর্টিংয়ে–
সব্বাই?
হ্যাঁ।
আগে কোনও কাগজে কাজ করতে?
সুধেন্দু জানালো, সে মণিলাল আর রমেন অন্য দৈনিকে সাত-আট বছর কাজ করেছে। তবে বিনয়ের এটাই প্রথম চাকরি।
রামগোপাল সস্নেহে বিনয়ের দিকে তাকালেন, তুমি তাহলে এই গোয়ালের একমাত্তর কচি বাছুর। আর সব্বাই ঝানু মাল
রামগোপালের কথাবার্তা, স্বরক্ষেপণ, মুখচোখের ভাব–সবই নাটকের কমেডিয়ানের মতো। বিনয় হেসে ফেলল, তা বলতে পারেন।
এবার রামগোপাল মণিলালের দিকে তর্জনী তুলে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আমার মতন কোলকেতার পুরনো তেলাপোকা, না বাইরে থেকে এসে জুটেচ?
মণিলাল বলল, আমাদের বাড়ি হাওড়ায়—
কাছেই। ঘটি। রামগোপালের তর্জনী সুধেন্দুর দিকে ঘুরে গেল, তোমার দেশ ছিল কোতায়?
