মেস ব্যাপারটা বিনয়ের জানা। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সরকারি এবং বেসরকারি অফিসের কর্মচারী, ছোটখাটো ব্যবসায়ী, ইন্সিওরেন্স কোম্পানির দালাল–এমনি নানা ধরনের মানুষ, কলকাতায় যাদের ফ্যামিলি থাকে না, মেস হল তাদের অস্থায়ী আস্তানা। কলকাতার কাছাকাছি যাদের পৈতৃক বাড়ি তারা শনিবার হাফ-ডের পর চলে যায়, ফেরে সোমবার। আর যাদের বাড়ি দূরে, বড় ছুটি না পড়লে তাদের যাওয়া হয় না। কেন না দেড় দিনের মধ্যে কাজের জায়গায় ফিরে আসা সম্ভব নয়। বিনয় জানে, দেশভাগের আগে পূর্ব বাংলার বহু মানুষ কলকাতার মেসে সারা বছর পড়ে থাকত। পুজোর লম্বা ছুটিতে তারা দেশে স্বজন-পরিজনের কাছে চলে যেত। রাজদিয়ার এমন অনেককেই সে দেখেছে।
বিনয় একটু ধন্দে পড়ে গেল। প্রসাদ কেন তাকে তার মেসে যেতে বললেন, বোঝা যাচ্ছে না। এ নিয়ে সে কোনও প্রশ্ন করল না। শুধু বলল, পারব।
প্রসাদ ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দিলেন, আমার কাছে অনেকগুলো জবরদখল কলোনি আর ক্যাম্পের ঠিকানা লেখা আছে। লিস্টটা রয়েছে আমার মেসে। তুমি এলে সেগুলো দিয়ে দেব। তোমার কাজের সুবিধে হবে। বলেই কী ভেবে ব্যস্তভাবে জানালেন, না না, সকালে কষ্ট করে আসার দরকার নেই। কাল দুপুরে অফিসে তো আসছই। আমি লিস্টটা নিয়ে আসব। তখন দিয়ে দেব।
যদিও মাথার উপরে তারাপদ ভৌমিক আছেন কিন্তু সরাসরি কাজটা তাকে করতে হবে প্রসাদের অধীনে। তার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটা খুবই জরুরি। পরে না বললেও তিনি নিশ্চয়ই চান বিনয় তার মেসে যাক।
অফিসের পরিবেশ একরকম। সেখানে নানা ব্যস্ততার মধ্যে কারওকেই পুরোপুরি বোঝা যায় না। কিন্তু মেসে গেলে খোলামেলা আবহাওয়ায়, চাপমুক্ত অবস্থায় জানা যাবে প্রসাদ লাহিড়ি মানুষটা কী ধরনের, তার মেজাজ কেমন, ইত্যাদি। বিনয় বলল, আমার একটুও কষ্ট হবে না। সকালে তো কোথাও কাজ নেই। চুপচাপ বাড়িতে বসে থাকা। ট্রাম-বাস কিছু একটা ধরে চলে যাব।
প্রসাদের হয়তো মনে হল, কাজ শুরু করার জন্য উৎসাহে টগবগ করছে ছেলেটা। কম বয়স। উদ্যম বেশি। একটু হাসলেন তিনি, ঠিক আছে, এস। এবার তোমাদের ফোটো তোলার ব্যবস্থা করি। বলেই একটা মাঝবয়সী বেয়ারাকে ডেকে বললেন, অধীরকে ক্যামেরা নিয়ে এক্ষুনি আমার এখানে আসতে বল। দেরি যেন না করে।
বেয়ারা চলে গেল।
.
কিছুক্ষণ পর একটি যুবক প্রসাদ লাহিড়ির টেবলের পাশে এসে দাঁড়াল। বয়স কুড়ি একুশ। ছিপছিপে চেহারা। শ্যামবর্ণ। লম্বা ধাঁচের মুখে পাতলা, নরম দাড়ি। মাথাভর্তি এলোমেলো জংলা চুল প্রায় কাঁধ অবধি নেমে এসেছে। বহুকাল ওগুলোতে তেল পড়েনি। বোধহয় নিয়মিত আঁচড়ায়ও না। সব চেয়ে আশ্চর্য ওর চোখ। সারাক্ষণ যেন সে-দুটো স্বপ্ন দেখছে। পোশাক-আশাকের দিকে নজর নেই। পরনে দলামোচড়া আধময়লা ফুল প্যান্ট আর শার্টের ওপর মোটা উলের পুল-ওভার। কাঁধ থেকে একটা ঢাউস ক্যামেরা ঝুলছে।
বোঝাই যায় ছেলেটি অধীর। নতুন ভারত-এর ফোটোগ্রাফার সে। বিনয়দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে প্রসাদ তাকে বললেন, এদের পাসপোর্ট সাইজের ফোটো চাই। এখনই তুলে নাও। কাল ডেভলাপ করে দেবে। প্রত্যেকটা ফোটো দুকপি করে।
অধীর ঘাড় কাত করে বলল, আচ্ছা—
একটু দূরে, রিপোর্টিং সেকশানের এক কোণে বিনয়দের নিয়ে গিয়ে লেন্স ঠিকঠাক করে চারজনের ছবি তুলে ফেলল অধীর।
পনেরো মিনিটের ভেতর কাজ শেষ। তারপর বিনয়রা প্রসাদ লাহিড়ির কাছে ফিরে আসে। অধীর হল-ঘর পেরিয়ে নিউজ ডিপার্টমেন্টের অন্য প্রান্তে চলে গেল।
সুধেন্দু বলল, প্রসাদদা, আজ এখানে জয়েন করলাম কিন্তু প্রথম দিন অ্যাসাইনমেন্ট দিচ্ছেন না। চুপচাপ বসে থাকার মানে হয়? সে আর মণিলাল নতুন ভারত-এ আসার আগে অন্য একটা কাগজে প্রসাদের সহকর্মী ছিল। অনেক দিনের সম্পর্ক। তাই ওভাবে বলতে পারল।
সুধেন্দু যা বলল, হুবহু তাই ভাবছিল বিনয়। অফিসে এসে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে তারও ভাল লাগবে না। কিন্তু প্রসাদ তার ডিপার্টমেন্টের ইন-চার্জ। আজই পরিচয় হয়েছে। তার পক্ষে সুধেন্দুর মতো করে বলা সম্ভব নয়।
খানিক চিন্তা করে প্রসাদ বললেন, ঠিক আছে, তোমরা দোতলায় লাইব্রেরিতে চলে যাও। ওখানে ইন্ডিয়ার অন্য সব শহরের নামকরা ইংলিশ ডেইলি আর নিউজ ম্যাগাজিন রয়েছে। সেগুলো উলটে পালটে দেখ ইন্টারেস্টিং কিছু পাও কি না। তার বেসিসে প্রত্যেকে একটা করে রাইট-আপ তৈরি কর। রোজই তো ট্রায়াল দেবার জন্যে কাগজ ছাপা হচ্ছে। তোমাদের লেখাগুলো কম্পোজ করে পাতায় বসিয়ে দেওয়া হবে। যখন রেগুলারলি কাগজ বেরুতে শুরু করবে তখন যদি দেখা যায়, ওই লেখাগুলোর টপিক পুরোনো হয়ে যায়নি, ফের ছাপা যেতে পারে।
খবরের কাগজের কাজের পদ্ধতি সম্বন্ধে বিনয়ের ধারণা পরিষ্কার নয়। তবে নতুন ভারত এ চাকরি পাবার পর থেকে সারাক্ষণ নিজের মধ্যে একটা চনমনে ভাব টের পাচ্ছে। তার লেখা ছাপার হরফে বেরুবে। হাজার হাজার মানুষ সে-সব পড়বে। কম উত্তেজনা? প্রসাদ একটা লেখার কাজ দেওয়াতে সে খুশি হল। আজকের লেখাটা কাগজে ছাপা হবে ঠিকই, কিন্তু বাইরের লোক জানতে পারবে না। না জানুক, তবু তো ছাপা হবে। বিনয় ভাবল, খুব যত্ন করে লেখাটা লিখবে। রামরতন গাঙ্গুলির মৃত্যুর বিবরণ পড়ে অভিভূত হয়েছিলেন তারাপদ। আজ এমন কিছু লিখবে যাতে প্রসাদ সন্তুষ্ট হন। প্রথম দিন থেকেই সে চিফ রিপোর্টারের নজরে পড়তে চায়।
