প্রসাদ সবাইকে বসতে বলে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। বিনয় সুধেন্দুদের পাশে বসে পড়ল।
প্রসাদ বললেন, তোমরা কি লক্ষ করেছ, কলকাতার রাস্তায় আমাদের কাগজের পোস্টার পড়েছে।
বিনয় খেয়াল করেনি। তবে সুধেন্দুরা দেখেছে। তারা জানালো, হ্যাঁ। নতুন ভারত শীঘ্রই প্রকাশিত হতে চলেছে।
কাল থেকে কলকাতার সব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বেরুবে।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, কাগজ বেরবার ডেট ঠিক হয়েছে?
প্রসাদ বললেন, আজ থেকে ঠিক পনেরো দিন পর বেরুবে। ছাদে ম্যারাপ বাঁধা হচ্ছে দেখেছ কি?
অফিসে ঢোকার সময় ছাদে মজুরদের কাজ করতে দেখেছিল বিনয়। তারপর জগদীশ গুহঠাকুরতার চেম্বার হয়ে তারাপদ ভৌমিকের কামরায় এসে নানা কথায় প্যান্ডেলের ব্যাপারটা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। সে উৎসুক হয়ে উঠল, হা হা, দেখেছি। কী হবে ওখানে?
প্রসাদ জানালেন, নতুন ভারত পত্রিকার প্রকাশ উপলক্ষে বড় একটা অনুষ্ঠান করা হবে। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় সেই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন। নামকরা বিজনেসম্যান, শিল্পপতি, শিল্পী, সাহিত্যিক, গায়ক, চলচ্চিত্র পরিচালক, রাজনৈতিক নেতা, বিখ্যাত খেলোয়াড়, অভিনেতা বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট মানুষজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। জগদীশ গুহঠাকুরতা খুবই প্রভাবশালী। তার বিপুল প্রতিপত্তি। তিনি ডাকলে কেউ না বলতে পারবেন না। সবাই চলে আসবেন।
রাজদিয়ায় থাকতে বিধানচন্দ্রের নাম বহুবার শুনেছে বিনয়। ডাক্তার হিসেবে তিনি লিজেন্ডের নায়ক। ভারতবর্ষের সেরা ধন্বন্তরি। মৃত্যু অবধারিত, এমন কত রোগীকে যে তিনি বাঁচিয়ে দিয়েছেন তার হিসেব নেই। বিধানচন্দ্র যে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সেটা অনেক আগেই জেনেছে বিনয়। তাকে তো বটেই, প্রসাদ অন্য যে-সব খ্যাতিমান মানুষদের নাম করলেন তাঁদেরও দেখা যাবে। ভাবতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে।
প্রসাদ এবার বললেন, সুধেন্দুরা নিউজ পেপারে চাকরি করেছে। ওরা জানে কাগজে তিন শিফটে কাজ চলে। মর্নিং, ডে আর নাইট। সকাল আটটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত একটা শিফট। দুটো থেকে রাত দশটা অবধি একটা শিফট। রাত দশটা থেকে ভোর পর্যন্ত আর-একটা শিফট। বিনয়, তুমি বোধহয় এই ব্যাপারটা জানো না?
বিনয় বলল, না। আমার তো এই প্রথম চাকরি
মাসে এক উইক করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তোমাদের নাইট ডিউটি দেওয়া হবে। তখন কিন্তু বাড়ি যেতে পারবে না।
বিনয় এতকাল জেনে এসেছে, চাকরি মানেই দশটা থেকে পাঁচটা। খবরের কাগজের নিয়ম যে আলাদা, এই প্রথম শুনল। বলল, আচ্ছা–
রাতে খুব একটা এমার্জেন্সি না হলে বারোটা সাড়ে বারোটার ভেতর কাজ শেষ হয়ে যায়। অফিসে বিছানা আছে। বাকি রাতটা ঘুমোত পারবে।
একটু চুপচাপ।
তারপর বিনয় বাদে বাকি তিনজনকে বললেন, নেক্সট উইক থেকে কে কোন শিফটে কাজ করবে, কাকে কী দায়িত্ব দেওয়া হবে, সব ঠিক করে দেব। এই উইকে তেমন প্রেসার নেই। তোমরা বেলা দেড়টা দুটোয় এস। রাতে আটটা নটায় চলে যেও। এখন সাব-এডিটর নিউজ ট্রানস্লেশন করে দিচ্ছে। তাছাড়া এটা সেটা দিয়ে পাতা মেক-আপ করে মেশিনের ট্রায়াল দেওয়া হচ্ছে। পরের সপ্তাহ থেকে পুরোদস্তুর কাজ শুরু হবে। রাইটার্স, পলিটিক্যাল পার্টির অফিস, হাসপাতাল, ইউনিভার্সিটি, লালবাজার–সব জায়গার রিপোর্ট চাই। খবরের কাগজে যা যা থাকে, সমস্ত দিয়ে পাতা সাজানো হবে। বিনয়কে বললেন, তোমাকে কিন্তু অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়ে গেছে। নেক্সট উইকের জন্যে তোমাকে ওয়েট করলে চলবে না। দু-চার দিনের ভেতর রিফিউজি কলোনি, আর রিলিফ ক্যাম্পগুলোতে যেতে শুরু কর। কাগজ বাজারে বেরুবার আগে যতগুলো লেখা সম্ভব, তৈরি করে ফেল। ওগুলো জমা করে রাখা হবে। যেদিন কাগজ বেরুবে সেদিন থেকে ছাপতে শুরু করব।
বিনয় মাথা হেলিয়ে বলল, আচ্ছা
প্রসাদ বললেন, তুমি তো সবে ইস্ট পাকিস্তান থেকে এসেছ। কোথায় কোথায় রিলিফ ক্যাম্প আর জবরদখল কলোনি বসেছে, জানো কি?
বিনয় জানালো, আগরপাড়া থেকে তিন মাইল দূরে যুগলদের মুকুন্দপুর কলোনি ছাড়া অন্য কোনও কলোনি সে দেখেনি। তবে শুনেছে, যাদবপুর বাঁশদ্রোণী গড়িয়া অঞ্চলে অনেক জবরদখল উপনিবেশ তৈরি হয়েছে। রিলিফ ক্যাম্পগুলো সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানে না। ভাসা ভাসা ধারণা আছে মাত্র।
একটু চিন্তা করে প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, তুমি থাকো কোথায়?
বিনয় বলল, টালিগঞ্জে, জাফর শা রোডে
একটা কাজ করতে পারবে?
বলুন
হরিশ মুখার্জি রোড চেনো? ভবানীপুরে পূর্ণ সিনেমার পেছন দিকটায়– ।
চকিতে মনে পড়ে গেল বিনয়ের। এই তো সেদিন হিরণদের সঙ্গে ঝিনুক আর সে ওখানকার হরিশ পার্কে জলসা শুনতে গিয়েছিল। জগন্ময় হেমন্ত শচীনদেব–কুড়ি পঁচিশ ফিট দূরে বসে স্বপ্নের এইসব শিল্পীদের নিজের চোখে দেখে, তাদের গান শুনে ঝিনুক অভিভূত। জলসা শেষ হলে বাড়ি ফিরে বালিকার মতো তার কী উচ্ছ্বাস! কত হইচই! অফুরান খুশির প্লাবনে ভেসে গিয়েছিল মেয়েটা। ঝিনুকের মুখ মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা চাপা কষ্টে দুমড়ে মুচড়ে যেতে থাকে বিনয়ের। নিচু গলায় বলল, চিনি–
প্রসাদ বললেন, ভালই হল। ওখানে হরিশ পার্কের উলটোদিকে একটা রাস্তা আছে। মহেশ হালদার লেন। ওই রাস্তার তেইশ নম্বর বাড়িটা হল মেসবাড়ি। নাম শান্তিনিবাস। আমি সেখানে থাকি। কাল সকাল সাড়ে-আটটা নটা নাগাদ একবার আমার মেসে আসতে পারবে?
