প্রসাদ সায় দিলেন, জগদীশবাবু ঠিকই বলেছেন। উদ্বাস্তুদের ব্যাপারটা সঠিক ধরতে পারলে আমরা ভাস্ট রিডারশিপ পেয়ে যাব। শুরু থেকে সার্কুলেশন হু হু করে বেড়ে যাবে।
কী?
সব কাগজই রিফিউজিদের নিয়ে কিছু কিছু লিখছে। শিয়ালদায় রোজ ঢাকা, মেল কি খুলনা মেলে যে উদ্বাস্তুরা আসছে তাদের সম্বন্ধে খবর টবর জোগাড় করে আর রাইটার্সে রিফিউজি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের মিনিস্টার আর সেক্রেটারির ইন্টারভিউ নিয়ে ছাপছে। এ-সব তো আছেই। আমার মনে হয়, আলাদাভাবে স্পেশাল কিছু করা দরকার। এ নিয়ে আপনি কিছু ভেবেছেন?
হ্যাঁ। তারাপদ ভৌমিক বিশদভাবে জানালেন, কলকাতার আশেপাশে এবং পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় অগুনতি মিলিটারি ব্যারাক বানানো হয়েছিল। যুদ্ধের পর ব্রিটিশ আর আমেরিকান টমিরা জাহাজ আর প্লেন বোঝাই হয়ে দেশে ফিরে যায়। তাদের ছেড়ে যাওয়া খালি ব্যারাকগুলোতে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের সাময়িক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া, রোজই তো সীমান্তের এপারে মানুষের ঢল নামছে। নতুন নতুন ত্রাণশিবির বসিয়ে তাদের রাখা হচ্ছে। শুধু তাই না, ফাঁকা মাঠ, জলা নিচু জায়গা, বনজঙ্গল যা পাচ্ছে সেখানে বসে পড়ছে উদ্বাস্তুরা। গড়ে তুলছে জবরদখল কলোনি। এইসব কলোনি সংখ্যায়, যে কত, তার লেখাজোখা নেই।
তারাপদ বলতে লাগলেন, অন্য কাগজগুলো সরকারি ক্যাম্পের, মিলিটারি ব্যারাকের আর জবরদখল কলোনির রিফিউজিদের সম্বন্ধে প্রায় কিছুই লিখছে না। উদ্বাস্তুদের ওপর আমরা জোর দেব। বিনয় প্রত্যেক সপ্তাহে একটা করে কলোনি বা ক্যাম্পে গিয়ে সেখানকার মানুষজন কীভাবে আছে, কী তাদের সমস্যা, সব ডিটেলে জেনে বড় একটা লেখা লিখবে। ওর সঙ্গে ফোটোগ্রাফার যাবে। লেখার সঙ্গে কলোনি টলোনির বাসিন্দাদের ছবিও ছাপা হবে।
প্রসাদ প্রায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, ভেরি গুড আইডিয়া
আরও একটা কথা ভেবেছি।
কী?
যে-সব গ্রাম ছেড়ে মানুষ চলে আসছে ফি উইকে সেইরকম দুটো গ্রামের ওপর রিপোর্টাজও লিখতে হবে বিনয়কে। লেখাটার নামও আমি ঠিক করে রেখেছি। আমার দেশ, আমার গ্রাম। অবশ্য এর চেয়ে বেটার কিছু পাওয়া গেলে সেটাই দেওয়া হবে। আপনারাও ভাবুন।
প্রসাদের মনে সামান্য সংশয় দেখা দেয়। তিনি জিজ্ঞেস করেন, লেখার মেটিরিয়াল পাবে কী করে?
তারাপদ বললেন, যে-সব গ্রাম থেকে উৎখাত হয়ে মানুষ আসছে তাদের জিজ্ঞেস করে। ওদের গ্রামের ফোটো অবশ্য পাওয়া যাবে না। আর্টিস্টকে দিয়ে স্কেচ আঁকিয়ে নিতে হবে।
খুব মগ্ন হয়ে তারাপদ আর প্রসাদের কথা শুনছিল বিনয়। ভয়ে ভয়ে বলল, আমি একটা কথা বলব?
তারাপদ বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
বিনয় জানালো, রোজ যারা ওপার থেকে আসছে, পথে তাদের কী ধরনের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আতঙ্কজনক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে কীভাবে প্রাণ হাতে নিয়ে তারা ইন্ডিয়ায় আসতে পেরেছে, আবার অনেকে পারেনি, রাস্তায় তাদের শোচনীয় মৃত্যু ঘটেছে–সপ্তাহে তেমন দু-চারজনকে নিয়ে যদি লেখা যায়, উদ্বাস্তুদের নিদারুণ অসহায়তা সম্বন্ধে পাঠকের পরিষ্কার একটা ধারণা হতে পারে।
একসেলেন্ট তারাপদ প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, গোয়ালন্দ থেকে আসার সময় ট্রেনে একজন বৃদ্ধ মাস্টার মশাইয়ের মৃত্যুর কথা লিখে আমাকে দেখিয়েছিলে। পড়ে চোখে জল এসে গিয়েছিল। হৃদয়কে টাচ করে এমন লেখা খুবই জরুরি।
তারাপদ ভৌমিক মানুষটি যে যথেষ্ট আবেগপ্রবণ, আগেই জেনেছে বিনয়। খুবই উদার। আর সেই লেখাটা পড়ে ঢালাও প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন। আনন্দর সুপারিশে নতুন ভারত-এ তার চাকরি হতোই। সে আনন্দর শ্যালক এবং উদ্বাস্তু। করুণাবশত কোনও একটা ডিপার্টমেন্টে হেলাফেলা করে তাকে হয়তো বসিয়ে দিতেন জগদীশ। কিন্তু তারাপদর অঢেল বাহবায় বার্তা বিভাগে সসম্মানে সে কাজটা পেয়েছে। তারাপদর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তার।
উৎসুক সুরে প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, কোন মাস্টার মশাইয়ের মৃত্যুর কথা লিখেছে বিনয়?
রামরতন গাঙ্গুলির কথা বললেন তারাপদ।
প্রসাদ ভীষণ উৎসাহিত। বললেন, এই ধরনের হিউম্যান স্টোরি পেলে কাগজের উপকার হবে। কিন্তু
কী?
শিয়ালদা স্টেশন, রিফিউজি ক্যাম্প, কলোনি, এত কিছু সামলে বিনয় কি এ-সব লিখতে পারবে? ওর ওপর ট্রিমেন্ডাস প্রেসার পড়ে যাবে।
তারাপদ বললেন, ইয়াং ম্যান। এই তো খাটার বয়েস। আমার মনে হয়, পারবে। চ্যালেঞ্জটা নিক না– একটু থেমে ফের মনে করিয়ে দিলেন, জগদীশবাবুর ইচ্ছে, রিফিউজিদের ব্যাপারে বিনয়কে ভালভাবে কাজে লাগানো হোক। কথা হয়ে গেল। বিনয়কে নিয়ে আপনার সেকশানে যান। খুব তাড়াতাড়ি রিপোর্টারদের কার্ডগুলো কিন্তু করিয়ে দিতে হবে।
আজই ওদের ফোটো তোলার ব্যবস্থা করছি। দুতিন দিনের ভেতর কার্ডগুলো হয়ে যাবে?
কীসের কার্ড, কেন রিপোর্টারদের ফোটো তোলা হবে, কিছুই বুঝতে পারল না বিনয়। তবে এ নিয়ে তার কৌতূহল হলেও কোনও প্রশ্ন করল না।
প্রসাদ উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বিনয়কেও তার সঙ্গে যেতে হবে। সেও উঠে পড়ল।
.
নিউজ ডিপার্টমেন্টের বাঁদিকে খানিকটা জায়গা নিয়ে রিপোর্টারদের বসার ব্যবস্থা। চিফ রিপোর্টারের জন্য বেশ বড় টেবল। সামনে অনেকগুলো চেয়ার। অন্যদের টেবলগুলো তুলনায় ছোট। সেখানে এসে দেখা গেল রমেন বিশ্বাস, সুধেন্দু চক্রবর্তী আর মণিলাল কর চিফ রিপোর্টারের টেবলের এধারে বসে কথা বলছে। প্রসাদকে দেখে তারা সবাই উঠে দাঁড়াল।
