বিনয় আর দাঁড়াল না। প্যাসেজের ভেতর দিয়ে ভেতর দিয়ে তারাপদ ভৌমিকের কামরার সামনে। চলে এল।
.
২৪.
নিউজ এডিটরের কামরার দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ নয়। খানিকটা খোলা রয়েছে। তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, তারাপদ ভৌমিক এদিকে মুখ করে বসে আছেন। তাঁর টেবলের এধারে রয়েছে আরও কয়েকজন। তাদের মুখ দেখা যাচ্ছে না। পিঠের দিকটা চোখে পড়ছে। বোঝা যায়, ওরা জরুরি কোনও মিটিং করছে। আজ এখানে পা দিয়ে সারা অফিস বিল্ডিং জুড়ে যে তুমুল ব্যস্ততা বিনয় লক্ষ করছে তাতে মনে হয়, নতুন ভারত খুব শিগগিরই বাজারে বেরিয়ে যাবে। সেই ব্যাপারেই হয়তো নিউজ এডিটরের ঘরে আলোচনা চলছে। দ্বিধান্বিতের মতো বাইরে দাঁড়িয়ে রইল বিনয়। এই অবস্থায় ভেতরে ঢোকা ঠিক হবে কি না, সে বুঝতে পারছে না।
মরিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত দরজার খুব কাছে চলে এল বিনয়। কিন্তু এবারও ঢুকতে গিয়ে সেই দ্বিধা। খানিকটা ভয়ও। মিটিংয়ের সময় বিরক্ত করলে নিউজ এডিটর নিশ্চয়ই অসন্তুষ্ট হবেন।
তারাপদ ভৌমিক তাঁর কামরায় অন্যদের কী বোঝাচ্ছিলেন, হঠাৎ তার চোখ এসে পড়ল বিনয়ের ওপর। হাত নেড়ে বললেন, ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে এস ।
তারাপদর কামরাটা মাঝারি মাপের। নতুন টেবল, চেয়ার, টেলিফোন ইত্যাদি দিয়ে সাজানো। একধারের দেওয়াল জুড়ে বুক-সমান উঁচু বইয়ের সারি সারি র্যাক। সেখানে নানা ধরনের রেফারেন্সের বই, ইয়ার বুক, ডিকশনারি। সিলিং থেকে ঝুলছে চার ব্লেডওলা ফ্যান। এখন নিশ্চল। এই হিম ঋতুতে সেটা চালানোর প্রশ্নই নেই।
ভেতরে আসতে তারাপদ বললেন, বোসো
বাইরে থেকে বোঝা যায়নি, ঠিক কজন টেবলের এধারে বসে ছিল। এখন দেখা গেল মোট চারজন। ওদের পাশে আরও তিনটে চেয়ার ফাঁকা রয়েছে। তার একটায় বসে পড়ল বিনয়। জড়সড় ভঙ্গি।
তারাপদ বললেন, তোমার জন্যে আমরা ওয়েট করছিলাম। সে যাক। আগে তোমাদের আলাপ করিয়ে দিই।
যারা বসে ছিল তাদের তিনজনের বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। একজন পঞ্চাশের কাছাকাছি। বয়স্ক লোকটির একহারা, রোগাটে চেহারা। খুব ফর্সা। মাথায় কাঁচাপাকা ঘন চুল। মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতর তার শান্ত চোখে গভীর দৃষ্টি। চোয়াল এবং থুতনির গড়নে বেশ একটা ব্যক্তিত্ব ফুটে বেরিয়েছে। তবু মনে হয়, তার মধ্যে কোথায় যেন গাঢ় বিষাদ জমা হয়ে আছে। পরনে ধুতি পাঞ্জাবির ওপর গরম কাপড়ের জহর কোট। তার দিকে আঙুল বাড়িয়ে তারাপদ বললেন, ইনি প্রসাদ লাহিড়ি। আমাদের চিফ রিপোর্টার। কলকাতায় অন্য একটা নামী পত্রিকার নাম করে বলেন, জগদীশবাবু ওঁকে ওই কাগজ থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন।
অন্য তিনজন হল সুধেন্দু চক্রবর্তী, মণিলাল কর এবং রমেন বিশ্বাস। এরাও রিপোর্টার। প্রসাদ লাহিড়ি আগে যেখানে ছিলেন সুধেন্দু আর মণিলাল সেই কাগজে কাজ করত। প্রসাদের সঙ্গে ওরাও। নতুন ভারত-এ চলে এসেছে।
সুধেন্দু খুব লম্বা। ছফিটের ওপরে হাইট। পেটানো স্বাস্থ্য। লম্বাটে মুখ। রীতিমতো কালো। তার চেহারা যতই জবরদস্ত হোক, চোখ দুটিতে আশ্চর্য এক সারল্য রয়েছে। মনে হয় খুব ভালমানুষ। কোনওরকম ঘোরপ্যাঁচ নেই। পরনে ঢোলা ফুলপ্যান্ট এবং শার্টের ওপর পুল-ওভার।
মণিলাল কর তেমন লম্বা নয়। মাঝারি উচ্চতা। তামাটে রং। গোলগাল চেহারা, গোলাকার মুখ। চওড়া কপাল। চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা। পরনে ধুতি, ফুল শার্ট আর গরম চাদর।
রমেন বিশ্বাসের খুব সাদামাঠা চেহারা। গড়পড়তা বাঙালির যেমন হয়। বিশেষ করে নজরে পড়ার মতো কিছুই নেই। চোখে গোল চশমা। পরনে ধুতি পাঞ্জাবি এবং হাতাকাটা সোয়েটার। ঢাকার একটা কাগজে সে কাজ করত। মাস ছয়েক আগে পাকিস্তান থেকে চলে এসেছে। চাকরির জন্য কলকাতার নামকরা কাগজগুলোতে হন্যে হয়ে ঘুরছিল কিন্তু কোথাও ভ্যাকান্সি নেই। যখন পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েছে সেই সময় হঠাৎ খবর পায়, জগদীশবাবু নতুন কাগজ বার করতে চলেছেন। সোজা তার সঙ্গে দেখা করে সে চাকরির আর্জি জানায়। রমেনের সঙ্গে কথা বলে জগদীশবাবু খুশি। তারাপদর সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি তাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেন।
বিনয় সম্পর্কে অন্যদের সবিস্তার জানিয়ে দিলেন তারাপদ। তারপর বিনয়কে বললেন, আপাতত তোমাদের পাঁচজনকে নিয়ে আমাদের রিপোর্টিং সেকশনের টিম। তুমি মেনলি প্রসাদবাবুর কাছে কাজ করবে। তেমন দরকার হলে আমি তোমাকে ডেকে নেব। তুমিও ইচ্ছে হলে আমার কাছে চলে আসতে পার।
বিনয় ভাবছিল তার অন্য চার কলিগের কাগজে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। সে-ই শুধু আনকোরা। তার মানে নতুন ভারত-এর কর্তৃপক্ষ এবং পাঠকের নজরে পড়তে হলে এইসব ঝানু সাংবাদিকদের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হবে। ভয় নয়, মানসিক চাপ নয়, টের পেল, এক ধরনের জেদ তার মধ্যে চারিয়ে যাচ্ছে। তারাপদর কথার উত্তরে সে মাথা হেলিয়ে দিল,, আচ্ছা
তারাপদ সুধেন্দু, মণিলাল এবং রমেনকে বললেন, তোমাদের সঙ্গে আগেই কথা হয়ে গেছে। নিজেদের জায়গায় গিয়ে বোসো। প্রসাদবাবু আর বিনয়ের সঙ্গে আমার কিছু ডিসকাশন আছে।
সুধেন্দুরা চলে যাবার পর তারাপদ বললেন, প্রসাদবাবু, আপনাকে সেদিন বলেছিলাম, জগদীশবাবুর খুব ইচ্ছে বিনয়কে বিশেষভাবে কাজে লাগাতে হবে। রিফিউজি প্রবলেম আমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গলে এখন সব চাইতে মারাত্মক সমস্যা। ও মাসখানেক কি মাসদেড়েক হল ইস্ট পাকিস্তান থেকে চলে এসেছে। পাকিস্তানে হিন্দুরা কী আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, কেন তারা ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে, ও ভাল করেই জানে। কেন না নিজেও ও ভুক্তোভোগী। বিনয়ের এক্সপিরিয়েন্সটা। আমাদের কাজে লাগাতে হবে। একটু থেমে বললেন, রিফিউজিদের সমস্যা, পাকিস্তানে যে লক্ষ লক্ষ মাইনোরিটি কমিউনিটির মানুষ এখনও পড়ে আছে তাদের সমস্যা যদি আমরা ঠিকমতো তুলে ধরতে পারি, রিডারদের নজর আমাদের কাগজের ওপর এসে পড়বেই। স্পেশালি ইস্ট বেঙ্গলের, উদ্বাস্তুদের।
