সেদিন ছাপাখানায় বেশি লোক ছিল না। বড় জোর পাঁচ সাত জন। লাইনো মেশিন চালাচ্ছিল দু-তিনটি কম্পোজিটার। আজ দুজায়গাতেই প্রচুর লোক। সারা এলাকায় ঝড় তুলে রোটারি মেশিন চলছে। ওধারে কম্পোজিটাররা সামনে হাতে-লেখা কপি রেখে দ্রুত বোতাম টিপে টিপে কম্পোজ করে চলেছে।
হল-ঘরটার একধারে সিঁড়ি। আনন্দ আর বিনয় দোতলায় উঠে এল। এখানেও একতলার মত লম্বা হল-ঘর। কাঠ আর কাঁচ দিয়ে গোটা হল জুড়ে অগুনতি খুপরি বানানো হয়েছে। একটা খুপরিও ফাঁকা নেই।
দোতলা থেকে তেতলা। সব ফ্লোরের নকশাই একরকম। এখানে হল-ঘরের অর্ধেক জুড়ে বিশাল নিউজ ডিপার্টমেন্ট। সেটার একধারে নিউজ এডিটর এবং অ্যাসিস্টান্ট এডিটরদের আলাদা আলাদা কামরা। বাকি আধখানা ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ডিরেক্টর, এডিটর, জেনারেল ম্যানেজারদের চেম্বার।
আজ নিউজ ডিপার্টমেন্ট গম গম করছে। দুটো টেলিপ্রিন্টার খট খট আওয়াজ তুলে হিল্লি দিল্লির খবর উগরে দিচ্ছে। ক্লান্তিহীন। অবিরাম।
বিনয়কে সঙ্গে করে আনন্দ নিউজ ডিপার্টমেন্টের উলটো দিকে জগদীশ গুহঠাকুরতার চেম্বারের সামনে চলে এল। পালিশ-করা কাঠের চওড়া দরজার পাল্লায় চকচকে পেতলের প্লেট লাগানো হয়েছে। সেটায় লেখা ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড এডিটর। আগের দিন এই প্লেটটা দেখেনি বিনয়।
সেদিনের সেই বেয়ারাটাই দরজার বাইরে টুলের ওপর বসে ছিল। আনন্দকে সে চেনে। ত্বরিত পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, নমস্কার স্যার
প্রতি-নমস্কার হিসেবে মাথাটা সামান্য হেলিয়ে আনন্দ বলল, তোমাদের সাহেবকে খবর দাও। আমরা ওঁর সঙ্গে দেখা করব।
সাহেবের ঘরে এখন কেউ নেই। একাই আছেন। আপনার ব্যাপারে খবর দিতে হবে না। যান জগদীশ গুহঠাকুরতার সঙ্গে আনন্দর সম্পর্ক কতটা নিবিড়, বেয়ারাটা তা জানে। সে পান্না ঠেলে দরজাটা আধাআধি খুলে দিল।
জগদীশ বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবলের ওপর ঝুঁকে খুব মগ্ন হয়ে কী সব টাইপ-করা কাগজপত্র দেখছিলেন। পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকালেন, ও-আনন্দ। এস এস। বোসো
বিনু মানে বিনয়কে নিয়ে এলাম। বলতে বলতে বসে পড়ল আনন্দ।
সেভাবে বিনয়কে লক্ষ করেননি জগদীশ। এবার তার দৃষ্টি ওর মুখের ওপর স্থির হল। চিনতে একটু সময় লাগল যেন। আনন্দকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সেই শ্যালক না?
হ্যাঁ, জগদীশকাকা–।
বিনয় দাঁড়িয়ে আছে। আনন্দর কাছে সে শুনেছে, জগদীশ গুহঠাকুরতা একজন বিরাট বিজনেসম্যান। নানা ধরনের কলকারখানার মালিকও। ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। এত সব ব্যবসা এবং ইন্ডাস্ট্রি সামলানো কি মুখের কথা! আজ এই সমস্যা। কাল সেই সমস্যা। লেবার ট্রাবল। ইনকাম ট্যাক্সের ঝামেলা। ফ্যাক্টরিগুলোতে পোডাকশন বাড়ানোর ছক তৈরি করা। যে-সব বিজনেস লোকসানে চলছে সেগুলো চাঙ্গা করে লাভজনক করার জন্য পরিকল্পনা। তার বিভিন্ন কোম্পানিতে ডিরেক্টররা রয়েছেন। আছেন দক্ষ ম্যানেজাররা। কিন্তু সমস্ত ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাকেই। ফলে সর্বক্ষণ প্রচণ্ড চাপে থাকেন। বিনয়ের মতো একজন তুচ্ছ, আনকোরা রিপোর্টার কবে তার কাগজে কাজ শুরু করবে, হয়তো খেয়ালই নেই জগদীশের। না-থাকারই কথা।
আনন্দ ফের বলে ওঠে, আজ বিনয়ের এখানে জয়েন করার তারিখ। তাই চলে এলাম।
জগদীশ গুহঠাকুরতার কপালে ভাঁজ পড়ল। আনন্দর দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, নো আনন্দ, নো
আনন্দ হকচকিয়ে গেল। জগদীশ কী বলতে চান, সে বুঝতে পারছে না।
জগদীশ থামেননি, ওকে সঙ্গে করে আনা ঠিক হয়নি।
আনন্দ আমতা আমতা করতে থাকে, না, মানে–
ছেলেটিকে স্বাবলম্বী হতে দাও। বলে জগদীশ আবার বিনয়ের দিকে তাকালেন, যে-ডিপার্টমেন্টে তোমার জয়েন করার কথা, সেখানে গিয়ে ডিপার্টমেন্টাল এডিটরের সঙ্গে দেখা কর। তিনি তোমার কাজ বুঝিয়ে দেবেন। যাও ।
কদিন আগে যে-জগদীশের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল তিনি ছিলেন নরম, স্নেহশীল একজন মানুষ। কিন্তু সেক্রেটারিয়েট টেবলের ওধারে আজ যিনি বসে আছেন তিনি একেবারে আলাদা। আবেগহীন। যান্ত্রিক। আনন্দ বিনয়কে নিয়ে এসে জগদীশকে ধরে তার কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ঠিক আছে। তারপর কেউ তাকে আগলে আগলে রাখুক সেটা তিনি চান না।
এদিকে আনন্দ উঠে দাঁড়িয়েছিল। বিনয়কে বলল, চল, তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
তর্জনী বাড়িয়ে আনন্দ যে-চেয়ারে বসে ছিল সেটা দেখিয়ে দিলেন জগদীশ। ধমকের সুরে বললেন, সিট ডাউন। আমি ওকে একা গিয়ে দেখা করতে বলছি। একটা কথা মনে রেখ আনন্দ, যখন ইচ্ছে তুমি আমার কাছে আসতে পার, কিন্তু তোমার শ্যালকের ব্যাপারে এখন থেকে কোনও অনুরোধ করবে না। প্রোটেকশন দিয়ে চললে ও নিজের পায়ে দাঁড়াতেই পারবে না। লেট হিম ফেস দা ওয়র্ল্ড।
জগদীশের চেম্বারের বাইরে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল বিনয়। তার মনে পড়ল, আজ তাকে নিউজ এডিটর তারাপদ ভৌমিকের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়েছে।
হল-ঘরের ওদিকটায় অর্থাৎ যেখানে সাব-এডিটর, রিপোর্টার, প্রুফ-রিডারদের বসার জায়গা সেখানে একটানা ভনভনে আওয়াজ হচ্ছে। তার সঙ্গে তবলার সঙ্গতের মতো টেলিপ্রিন্টারের অনবরত খটখটানি।
তারাপদ ভৌমিকের কামরাটা বিনয় চেনে। প্রথম যেদিন এখানে আসে, ওই কামরায় তাকে যেতে হয়েছিল। নিউজ ডিপার্টমেন্টের সাংবাদিকদের বসার জন্য টেবলগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে হল-ঘরের এধার থেকে ওধারে যাবার জন্য ফাঁকে ফাঁকে প্যাসেজ রয়েছে।
