হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
ইন্টারভিউর সময় ওটা লাগবে। তুমি যে জেনুইন রিফিউজি, ওটা তার ডকুমেন্ট।
ট্রাম কালীঘাট, ভবানীপুর, সাকুলার রোড পার হয়ে অনেক দূর চলে এসেছে। এখন বাঁ দিকে আদিগন্ত ময়দান। ঘন সবুজ ঘাসে ছাওয়া বিশাল এক জাদু কার্পেট। দূরে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মাথায় পরি নেচে চলেছে অবিরাম। আরও দূরে রেস কোর্সের সাদা গ্যালারি। তার গা ঘেঁষে রাস্তা। ওই রাস্তা ধরেও ট্রাম বাস মোটর চলছে। এধার থেকে সেগুলো খেলনা-গাড়ির মতো মনে হয়। ময়দানের নানা জায়গায় থোকায় থোকায় মানুষ বসে আছে। অনেকে ঘাসে পা ডুবিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোট ছোট বাচ্চার দঙ্গল ফাঁকা মাঠ পেয়ে উদ্দাম হয়ে উঠেছে। মনের খুশিতে তারা যেন উড়ে বেড়াচ্ছে। কোথাও স্থির চিত্র। কোথাও চলমান ছবি।
পাশ থেকে হঠাৎ আনন্দ বলল, জানো বিনু, আমার দিদি আর জামাইবাবু সেদিন আমাদের বাড়ি এসেছিল। ওদেরও খুব ইচ্ছে, আমার অফিসে তোমার চাকরিটা যেন হয়। আমাকে চাপ দিয়ে গেছে, যেমন করে পারি ওটা করে দিতেই হবে।
বিনয় প্রথমটা হতবাক হয়ে যায়। আনন্দর দিদি জামাইবাবু মানে শিশির এবং স্মৃতিরেখা। ঝুমার মা আর বাবা। তার চাকরির জন্য ওঁরা এত উৎসাহী কেন? নিজের অজান্তে প্রশ্নটা করেই ফেলল সে।
হাসির চিকন একটা রেখা খেলে গেল আনন্দর ঠোঁটে। আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বলল, কারণ কিছু একটা আছে।
বিনয় ধন্দে পড়ে যায়। তার চাকরি সম্বন্ধে শিশির এবং স্মৃতিরেখার আগ্রহের পেছনে কীসের একটা সংকেত যেন রয়েছে। ঠিক ধরা যাচ্ছে না। বলল, কী কারণ?
উত্তর দিতে গিয়ে থমকে গেল আনন্দ। সামলে নিয়ে বলল, ছেলেবেলা থেকে ওরা তোমাকে দেখছে। তোমার ভীষণ ওয়েল-উইশার। ভাল চাকরি পেলে জীবনে এস্টাব্লিশড হবে, সেটাই ওরা চায়। এই আর কি–।
বিনয় পরিষ্কার টের পায়, আসল উত্তরটা এড়িয়ে গেল আনন্দ। কয়েক পলক আনন্দকে লক্ষ করে সে। স্মৃতিরেখাদের সম্বন্ধে আর কোনও প্রশ্ন না করে ধীরে ধীরে জানালার বাইরে চোখ ফেরায়।
এসপ্ল্যানেডে এসে ট্রাম থেকে নেমে যে বাসগুলো সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ ধরে শ্যামবাজারের দিকে যায় তার একটা ধরে যখন বিবেকানন্দ রোডের কাছাকাছি বিনয়রা এসে নামল, দুটো বাজতে তখনও মিনিট সাতেক বাকি।
রাস্তার যে-দিকটায় ওরা নেমেছে তার উলটো দিকে জগদীশবাবুদের কাগজের অফিস। ওপারে যেতে যেতে বিনয়ের চোখে পড়ল মস্ত অফিসের গেটের মাথায় সাইন বোর্ড লাগানো হয়েছে। হলুদের ওপর বড় বড় লাল হরফে লেখা : নতুন ভারত।
বিনয় বলল, সেদিন যখন এসেছিলাম, সাইন বোর্ডটা তো দেখিনি–।
আনন্দ বলল, কেমন করে দেখবে? কী নাম পাওয়া যাবে তখনও তো ঠিক হয়নি। কদিন হল পাওয়া গেছে। সঙ্গে সঙ্গে সাইন বোর্ড করিয়ে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বুঝতে না পেরে বিনয় জিজ্ঞেস করল, নাম পাওয়া যায়নি মানে?
আনন্দ বুঝিয়ে দিল, ইচ্ছামতো পত্রপত্রিকা বার করা যায় না। সেজন্য দিল্লি থেকে সরকারি অনুমতি দরকার। কেননা, নিয়ন্ত্রণ না থাকলে একই নামে হয়তো পাঁচটা কাগজ বেরিয়ে যাবে। তাতে বিরাট সমস্যা। জগদীশবাবু মাস দুতিনেক আগে তার কাগজের জন্য অনেকগুলো নাম পাঠিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত নতুন ভারত নামটার অনুমোদন পাওয়া গেছে।
আনন্দ জিজ্ঞেস করল, কী, নামটা ভাল লেগেছে?
বিনয়ের পছন্দ হয়েছিল। বলল, খুব ভাল।
দেশ স্বাধীন হয়েছে। নতুন করে সেটা গড়ে তুলতে হবে। এব্যাপারে নিউজ পেপারের একটা বড় বোল রয়েছে। সেদিক থেকে নামটা বেশ সিগনিফিকান্ট।
হঠাৎ বিনয়ের নজরে পড়ল, অফিস বিল্ডিংটার গোটা ছাদ জুড়ে মস্ত প্যান্ডেল খাটানোর তোড়জোড় চলছে। বাঁশের ফ্রেম তৈরি করে আধাআধি তেরপল দিয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে। মজুররা হাঁকডাক করে বাকি অর্ধেক এখন ঢাকছে।
ছাদের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বিনয় জিজ্ঞেস করল, ওখানে কী হবে আনন্দদা?
আনন্দ মুখ তুলে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে। বেশ অবাক হয়ে বলে, বুঝতে পারছি না। ভেতরে চল। জগদীশবাবুকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেব।
কদিন আগে আনন্দর সঙ্গে প্রথম যখন বিনয় এখানে আসে, বাড়িটা ছিল প্রায় নিঝুম। বাইরে থেকে শুধু রোটারি মেশিন চলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আজ সেটা তো আছেই, সেই সঙ্গে ভেসে। আসছে অন্য আওয়াজও। বহু মানুষ একসঙ্গে কথা বললে যেমন শোনায় ঠিক তেমনই।
গেটের কাছে এসে দেখা গেল, একজন মাঝবয়সী হিন্দুস্থানী দারোয়ান টান টান দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে খাকি উর্দি, মাথায় পাগড়ি। সেদিন একে দেখা যায়নি। আনন্দ তাকে জিজ্ঞেস করে, জগদীশবাবু। এসেছেন?
লোকটা হেসে বলল, হাঁ সাব। এক বাজে মালিক আ গিয়া—
ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল, চারদিক সরগরম। সারা অফিসে তুমুল ব্যস্ততা। ছোটাছুটি। একতলার বিশাল হল-ঘরের আধখানা জুড়ে সেদিনই রোটারি মেশিন দেখে গিয়েছিল বিনয়, অন্য দিকটায় বেশ কটা লাইনো মেশিন। মেশিনগুলোর পাশে উঁচু দেওয়াল তুলে নিউজপ্রিন্ট রাখার ব্যবস্থা। বিশাল বিশাল গোলাকার চাকার মতো বিদেশি নিউজপ্রিন্টের রিল উঁই হয়ে পড়ে আছে। তার পাশে আবার একটা দেওয়াল। ওই দেওয়ালের পর কাতার দিয়ে নতুন সাইকেল। কম করে ষোল সতেরোটা। প্রতিটি সাইকেলের সামনের হ্যাঁন্ডেলের সঙ্গে আটকানো হলুদ রং করা টিনের প্লেটে লাল হরফে লেখা আছে : নতুন ভারত। এতগুলো সাইকেল দিয়ে কী হবে, কে জানে। বিনয় অবাক হলেও এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন করল না।
