ট্রাম ধীর চালে চলতে থাকে। হিমঋতুর এই দুপুরে বোদ বেশ ঝলমলে, যদিও তেজ কম। শহরের গায়ে সোনালি মলিদার মতো সেটা জড়িয়ে রয়েছে। ট্রাম যত এগুচ্ছে, দুধারের বাড়ি, রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্ট, ডালপালাওলা উঁচু উঁচু গাছ পেছন দিকে সরে সরে যাচ্ছে। অনেক সময় সিনেমার ব্যাক প্রোজেকশনে যেমন দেখা যায়।
খানিকটা চলার পর আনন্দ ডাকল, বিনু
জানালার বাইরে অন্যমনস্কর মতো তাকিয়ে ছিল বিনয়। মুখ ফিরিয়ে উৎসুক চোখে তাকালো।
কদিন ধরেই তোমার সম্বন্ধে সুনীতির সঙ্গে আলোচনা করছিলাম।
কী আলোচনা?
বাবার বন্ধু জগদীশবাবুর কাগজের অফিসে তোমার চাকরি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু বাজারে আরও অনেক কাগজ রয়েছে। জগদীশবাবু খুবই আশাবাদী। তার ধারণা তার পেপার বছরখানেকের ভেতর দাঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু
কী?
এটা ফ্যাক্ট, পশ্চিমবাংলায় মানুষ অনেক বেড়ে গেছে। রিডারশিপও বাড়ছে। কিন্তু খবরের কাগজ পড়াটা হল হ্যাবিট। প্রত্যেকটা কাগজের কম হোক বেশি হোক, কিছু লয়াল পাঠক থাকে। তারা চট করে নতুন কাগজের দিকে ঝুঁকবে না। পিকিউলিয়ার সাইকোলজি। আর নিউ জেনারেশনের যে রিডার বাড়ছে তাদেরও ঝোঁক পুরোনো নামকরা কাগজগুলোর দিকে। পরিচিত কোনও কিছুর বাইরে মানুষ সহজে যেতে চায় না।
বিনয় ধন্দে পড়ে গেল। আপনি কী বলতে চাইছেন, ঠিক বুঝতে পারছি না।
আনন্দ বুঝিয়ে দিল, নতুন একটা কাগজের পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, শুধু থাকাই নয়, সেটা লাভজনক করে তোলা অত্যন্ত কঠিন। জগদীশ গুহঠাকুরতা যদিও যথেষ্ট উদ্যোগী এবং অত্যন্ত বিচক্ষণ শিল্পপতি, শেষ না দেখে ছাড়বেন না, তবু এক বছরের মধ্যে কাগজ কতটা কী করতে পারবে সে সম্বন্ধে সংশয় থেকেই যায়। যত টাকাই থাক, যদি ক্রমাগত লোকসান দিতে হয়, উৎসাহ ঝিমিয়ে পড়তে বাধ্য।
আনন্দ বলতে থাকে, আপাতত যা পাওয়া গেছে সেটাই করো। দুমাস পর আমাদের অফিসে কিছু লোক নেবে। নানা ডিপার্টমেন্টে কম করে বারো চোদ্দ জন জুনিয়র অফিসার দরকার। ছমাস প্রবেশান পিরিয়ড। তারপর পার্মানেন্ট করা হবে। প্রবেশানের সময় মাসে দেবে চার শ করে। পার্মানেন্ট হয়ে গেলে সাড়ে আট শ দিয়ে শুরু। তাছাড়া, অন্য সব বেনিফিট আছে। তোমার বড়দি বলছিল তোমার জন্যে ওখানেই ব্যবস্থা করে দিতে। একটা অ্যাপ্লিকেশন লিখে নেক্সট উইকে আমাকে দিও।
খবরের কাগজে বিনয়ের চাকরি হয়েছে, কিন্তু এ নিয়ে হিরণ আর সুধাও খুব একটা খুশি নয়। বরং বলা যায় বিনয়ের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তারা যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় আছে। নতুন কাগজ। কবে আছে, কবে নেই। সুধাদের ইচ্ছা, সরকারি বা নামকরা বড় কোনও কোম্পানিতে ভাইয়ের চাকরি হোক যাতে তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকে। হিরণ তাদের অফিসে তো বটেই, আরও দু-একটা অফিসে বিনয়ের দরখাস্ত জমা দিয়ে রেখেছে। সুধাদের মনোভাব অবিকল আনন্দদের মতোই। যত দিন না মনের মতো কিছু একটা জুটছে, খবরের কাগজের কাজটাই চালিয়ে যাক বিনয়। বেকার বসে থেকে লাভ নেই।
বিনয় বলল, ঠিক আছে। অ্যাপ্লিকেশনটা কার নামে দিতে হবে?
আনন্দ বলল, টু দা জেনারেল ম্যানেজার, তার তলায় আমাদের কোম্পানির নাম আর ঠিকানা লিখবে হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে, ভাল কথা, পাকিস্তান থেকে হেমদাদু তোমার ম্যাট্রিকুলেশন, ইন্টারমিডিয়েট আর গ্র্যাজুয়েশনের সার্টিফিকেট ডিগ্রিটিগ্রিগুলোর ডুপ্লিকেট পাঠাতে পেরেছেন?
না। সেই যে একখানা চিঠি লিখেছিলেন তারপর আর কোনও যোগাযোগ নেই। তবে কদিন আগে নিত্য দাস ছোটদির বাসায় এসেছিল। বলে গেছে, এক সপ্তাহের ভেতর দাদুর সেকেন্ড চিঠিটা নিয়ে আসবে। সেই চিঠির সঙ্গে পাঠাতে পারেন।
রাজদিয়া থেকে ঝিনুককে নিয়ে রাজেক মাঝির নৌকোয় নদী পাড়ি দিয়ে আসার সময় মামুদপুরে বিনয়দের মালপত্র লুট হয়ে যায়। বাক্স-পেটরার ভেতর ছিল তার সার্টিফিকেট, ডিগ্রির কাগজপত্র। হানাদাররা বাক্সটাক্সর সঙ্গে সে-সবও নিয়ে গেছে। আত্মীয়-পরিজনেরা এ খবর জানে। আনন্দ খানিক চিন্তা করে বলল, জগদীশবাবু ভাল মানুষ। তার ওপর নিজেই কাগজের মালিক। তিনি ডিগ্রিটিগ্রি না দেখে তোমাকে চাকরি দিলে কারও কিছু বলার নেই। কিন্তু গভর্নমেন্ট অফিসই হোক আর বড় মার্চেন্ট অফিসই হোক, তোমার সার্টিফিকেটগুলো খোয়ানোর কথা হয়তো বিশ্বাস করবে কিন্তু ওগুলো না দেখে চাকরি দেবে না। একটু থেমে বলল, পাকিস্তানে এখন যা অবস্থা, তাড়াতাড়ি ডিগ্রিটিগ্রির নকল পাওয়া অসম্ভব। অন্তত মার্কশিটের ডুপ্লিকেট কিংবা যে স্কুল আর কলেজে পড়েছ সেখানকার হেডমাস্টার আর প্রিন্সিপ্যাল যদি লিখে দেন তুমি ওই সব ইনস্টিটিউশন থেকে পাশ করেছ, তা হলেও আশা করি, কাজ চলে যাবে। আমার ধারণা, রিফিউজি হিসেবে এটুকু কনসিডারেশন তোমার প্রাপ্য।
এ-জাতীয় কথাবার্তা হিরণের সঙ্গে আগেই হয়েছে বিনয়ের। আনন্দের সঙ্গে হয়েছিল কি না, মনে পড়ল না। ডিগ্রিটিগ্রির ডুপ্লিকেট না পাওয়া যাক, হেডমাস্টার এবং প্রিন্সিপ্যালের চিঠি পাওয়া যাবে ধরে নিয়ে হিরণ তার চাকরির জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে।
বিনয় বলল, আপনি যা বললেন, দাদুকে সব জানিয়েছি। এখন দেখা যাক, কী উত্তর আসে।
পাকিস্তান থেকে আসার সময় যে বর্ডার স্লিপ দিয়েছিল সেটা যত্ন করে রেখেছ তো?
