শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিল সুধা।
আনন্দ বিনয়কে বলল, বাড়িতে বসে থেকে কী হবে? চল, বেরিয়ে পড়া যাক।
বিনয় ওধারের একটা ঘর থেকে পাঁচ মিনিটের ভেতর ধবধবে ধুতি এবং ফুল শার্টের ওপর সোয়েটার পরে চলে এল। চুল পরিপাটি করে আঁচড়ে নিয়েছে। জুতোও পরা হয়ে গেছে।
যাচ্ছি রে ছোটদি
বিনয়রা বেরুতে যাবে, হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল সুধার। শশব্যস্তে সে বলল, দাঁড়া দাঁড়া। জুতো খুলে আমার সঙ্গে আয়
বিনয় অবাক। কোথায়?
আয় না ।
সুধার কার্যধারার তল পাওয়া মুশকিল। অগত্যা জুতো খুলতে হল বিনয়কে। তার একটা হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে আনন্দকে বলল, এক মিনিট আনন্দদা। আমরা যাব আর আসব—-
আনন্দ হাসিমুখে বলল, ঠিক আছে।
সুধা ভাইকে টানতে টানতে তার আর হিরণের শোবার ঘরে নিয়ে এল। খাট আলমারি ড্রেসিং টেবল ইত্যাদি দিয়ে ঘরটা সাজানো। একধারে কাঠের সিংহাসনে রয়েছে লক্ষ্মী দুর্গা সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং কাঁচ দিয়ে বাঁধানো কালীর ফোটো।
আগে পুজোটুজোর তেমন ঝোঁক ছিল না সুধার। কিন্তু ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময় যেভাবে পার্ক সার্কাসে অনিবার্য মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে তারা নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পেরেছিল, সেটাকে দৈব করুণা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না সে। তখন থেকেই তার ঈশ্বর-ভক্তি বেড়ে গেছে। রোজ সকালে বাসি কাপড় ছেড়ে, গা ধুয়ে, পরিষ্কার শাড়ি পরে, দুর্গা লক্ষ্মী ইত্যাদি চার দেবদেবীকে প্রণাম করে তার দিন শুরু হয়। হিরণ অফিসে বেরিয়ে যাবার পর স্নান সেরে ফের শাড়ি বদল। এবার দেবদেবীর ফোটোগুলো গঙ্গাজলে ধুয়েমুছে ফুলচন্দন দিয়ে সাজিয়ে ঘণ্টাখানেক ধরে পুজো চলে। সন্ধেবেলায় পেতলের পঞ্চপ্রদীপ এবং সুগন্ধি ধূপ জ্বেলে হাতজোড় করে অনেকক্ষণ ধ্যান করে সে। দৈনিক তিন পর্বে তার আরাধনা। শীত-গ্রীষ্ম বারোমাস, এই রুটিনের হেরফের নেই।
সরস্বতী আসার পর পুজোর মাত্রা দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। দেশ থেকে তিনি কুলদেবতা দেবাদিদেব মহেশ্বরকে নিয়ে এসেছিলেন। পাথরে খোদাই মূর্তিটা রয়েছে তার শোবার ঘরে। তিনিও তিনবার পুজোয় বসেন। হিরণ মাঝে মাঝে রগড় করে সুধাকে বলে, তুমি আর জেঠিমা দুজনে মিলে বাড়িটাকে একেবারে পোবন বানিয়ে ছাড়বে দেখছি।
সুধার দ্বিতীয় দফার পুজো হয়ে গিয়েছিল। দেবদেবীর সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাইকে বলল, শুভ কাজে যাচ্ছিস। ঠাকুর প্রণাম করে যা।
ঈশ্বর-টিশ্বর নিয়ে সুধার মতো বাড়াবাড়ি নেই বিনয়ের। এই ব্যাপারে কোনওদিন সে মাথা ঘামায়নি। খানিকটা নিস্পৃহ ভাব। ভগবান ভগবানের মতো থাকুন, আমি আমার মতো থাকি, এইরকম আর কি। কিন্তু আজ কী যে হয়ে গেল, হাঁটু মুড়ে বসে মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে আলাদা আলাদা করে চার দেবতাকে প্রণাম করল। নতুন জীবনে প্রবেশ করতে চলেছে। মনে মনে হয়তো ঈশ্বরের করুণা চেয়ে নিল।
বিনয় উঠে দাঁড়াতেই সিংহাসন থেকে দুচারটে পুজোর ফুল তুলে নিয়ে তার কপালে ঠেকিয়ে পকেটে পুরে দিতে দিতে সুধা বলল, ফেলে দিস না কিন্তু তার বিশ্বাস, পুজোর এই ফুল ভাইয়ের কর্মজীবনকে রক্ষাকবচের মতো নির্বিঘ্ন করবে।
বিনয় মাথা নেড়ে জানায়, ফেলবে না।
সুধা বলল, চল এবার। আনন্দদা অপেক্ষা করছেন।
দুজনে বাইরের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
.
২৩.
সুধাদের বাড়ি থেকে বড় রাস্তায় এসে ঘড়ি দেখল আনন্দ। একটা বাজতে এখনও সাত মিনিট বাকি। চারদিকে বেশ লোকজন আছে। ট্যাং ট্যাং আওয়াজ করে ট্রাম চলছে। চলছে প্রাইভেট বাস। কন্ডাক্টরদের হাঁক কানে আসছে, রাসবিহারী….কালীঘাট……হাজরা…..ভবানীপুর…ধর্মতলা……খালি, গাড়ি, খালি গাড়ি….উঠে আসুন…।
মাসখানেক আগে পাকিস্তান থেকে এই শহরে আসার পর যে-কোনও বড় রাস্তায় পা ফেললে, তা টালিগঞ্জেই তোক কি শিয়ালদা বা শ্যামবাজারেই, কন্ডাক্টরদের একই লজ শুনে আসছে বিনয়। একই ধরনের খ্যানখেনে টানা সুর, একই বলার ভঙ্গি। মনে হয়, কোনও এক স্পেশাল গানের স্কুল থেকে স্বরলিপি রপ্ত করে এই কন্ডাক্টররা সুরটা গলায় তুলে নিয়েছে। অবশ্য বাসের রুট অনুযায়ী লিরিকটা পালটে পালটে যায়। টালিগঞ্জের বাস হলে রাসবিহারী…কালীঘাট….ইত্যাদি। শ্যামবাজারের বাস হলে হাতিবাগান…হেদো….বিবেকানন্দ রোড……কলেজ ইস্টিট…..
শীতের এই দুপুরবেলায় মানুষজন আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের কোনওরকম তাড়া নেই। ট্রাম বাস কি অন্য সব গাড়িটাড়ি চলছে ঢিকিয়ে টিকিয়ে। সবই কেমন যেন অলস। ত্বরাহীন। তিন সাড়ে তিন ঘণ্টা আগে অফিস টাইমের যে ব্যস্ততা ছিল, এখন তার লেশমাত্র চোখে পড়ে না।
রাস্তার একধারে লাইন দিয়ে কটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। আনন্দ সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল, চল, একটা ট্যাক্সি নেওয়া যাক—
উঁহু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়।
– উঁহু কেন?
রোজ রোজ তো আপনি ট্যাক্সি করে অফিসে পৌঁছে দেবেন না। ট্রামে-বাসে আমাকে যাতায়াত করতে হবে। তাই ধরা যাক। তাছাড়া হাতে যথেষ্ট সময় আছে। আম জনতার গাড়িতে গেলেও দুটোর ভেতর ঠিক পৌঁছে যাব।
আনন্দ হাসল, ঠিক আছে।
ওদের কথাবার্তার মধ্যেই একটা ট্রাম এসে গেল। দুজনে সামনের দিকের ফার্স্ট ক্লাসে উঠে পড়ে। গাড়ি প্রায় ফাঁকাই। জানালার ধারের জোড়া সিটে আনন্দ আর বিনয় পাশাপাশি বসল।
