মাছ নামিয়ে উনুন সাফ করে, ডাল বসিয়ে, চা করে নিয়ে এসেছিল সুধা। উমাকে আনাজ কাটার দায়িত্ব দিয়ে এসেছে। তবে চা খেতে খেতে মাঝে মাঝে রান্নাঘরে গিয়ে সব দেখে আসছে। ডাল ফুটে উঠলেই সম্বরা দিয়ে নিজের হাতে অন্য রান্নাগুলো সেরে ফেলবে।
সুধা বিনয়কে জিজ্ঞেস করল, আনন্দদা কখন আসবে, তোকে বলে গেছে?
বিনয় মাথা নাড়ল, না।
ভাল করে জেনে নিসনি কেন?
বিনয় জানে, তার এই ছোটদিদিটি ছোটখাটো, তুচ্ছ ব্যাপারেও ভীষণ অস্থির হয়ে পড়ে। সে উত্তর দিল না।
একটু চিন্তা করে সুধা এবার বলল, তুই এক কাজ কর—
কী?
চান করে তোর হিরণদার সঙ্গে খেয়ে রেডি হয়ে থাক। আনন্দদা এলে তক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে পারবি।
সুধার এই কথাগুলো মনঃপূত হল বিনয়ের। আনন্দ আসার পর তাকে বসিয়ে রেখে চান-খাওয়া সারতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। প্রথম দিনই লেট করলে তার সম্বন্ধে অফিসের লোকজনের, বিশেষ করে কর্তৃপক্ষের ধারণা খারাপ হবে। সেটা একেবারেই চায় না বিনয়। বলল, ঠিক আছে।
সুধা কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, উমা এসে খবর দিল, ডাল ফুটে গেছে।
এখন আর এক মুহূর্তও বসার সময় নেই। এক ঢোকে বাকি চা শেষ করে সুধা রান্নাঘরে ছুটল।
বিনয়ের এই ছোটদিদি একসময় ছিল কুঁড়ের বাদশা। পাশ ফিরে শুতেও তার যেন কষ্ট হতো। কিন্তু বিয়ের পর কবছরে আগাগোড়া পালটে গেছে। এখন সে ঘরের লক্ষীমার্কা সুগৃহিণী। সারাক্ষণ সংসারের যাবতীয় ঝক্কি দশভুজা হয়ে সামলায়।
ক্ষিপ্র হাতে সাড়ে আটটার ভেতর সব রান্না সেরে ফেলল সুধা। এর মধ্যে হিরণ আর বিনয়ের চান হয়ে গিয়েছিল। কাঁটায় কাঁটায় পৌনে নটায় তাদের খেতে বসিয়ে দিল।
খাওয়াদাওয়া সেরে হিরণ অফিসে চলে গেল। আর সাদামাঠা ঘরোয়া পোশাকে অপেক্ষা করতে লাগল বিনয়। আনন্দ এলে জামাকাপড় পালটাতে আর কতক্ষণ? তারপর দুজন বেরিয়ে পড়বে।
নটার পর দশটা বাজল। তারপর এগারোটা। বেলা যত বাড়ছে ততই চঞ্চল হয়ে উঠতে থাকে সুধা। বিনয়কে বলে, কি রে, আনন্দদা এখনও এল না যে? অফিস তো দশটায় বসে যায়।
বিনয়েরও যে চিন্তা হচ্ছিল না তা নয় কিন্তু সেটা জানালে সুধা আরও অস্থির হয়ে পড়বে। তার দুর্ভাবনা কাটিয়ে দেবার জন্য স্বাভাবিক থাকতে চেষ্টা করল বিনয়। বলল, অফিস থেকে হয়তো দেরি করে নিয়ে যেতে বলেছে। আনন্দদা আগে এসে কী করবে?
সুধা উত্তর দিল না। তার চাঞ্চল্য কতটা কমল, আদৌ কমল কি না, কে জানে।
শেষ পর্যন্ত উৎকণ্ঠার অবসান। সোয়া বারোটায় আনন্দ এল। সদর দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পেয়ে উমা নিচে গিয়ে তাকে বাইরের ঘরে নিয়ে এল। সুধা আর বিনয় সেখানে বসে ছিল।
অন্য দিনের মধ্যে দ্বারিক দত্ত এগারোটা নাগাদ খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছেন। বুড়ো মানুষ। শরীর নড়বড়ে হয়ে গেছে। খাওয়ার পর ঘন্টা তিনেক দিবানিদ্রা না হলে তার খুব কষ্ট হয়। বাড়ির অন্য কারও এখনও খাওয়া হয়নি। সরস্বতী বাথরুমে। স্নানের পর তার পুজো আছে। তারপর খেতে বসবেন। তার খাওয়া হলে সুধা আর উমা খাবে।
সুধা জিজ্ঞেস করল, এত দেরি করলেন যে আনন্দদা?
কোথায় দেরি? একটা বেতের চেয়ারে শরীর ঢেলে দিয়ে আয়েশ করে বসে পড়ল আনন্দ।
সোয়া বারোটা বাজে। দেরি নয়?
আনন্দ বুঝিয়ে দিল, খবরের কাগজের অফিস, বিশেষ করে নিউজ ডিপার্টমেন্ট, অর্থাৎ বার্তা বিভাগ চব্বিশ ঘন্টাই খোলা থাকে। তবে কাজের ব্যস্ততা বাড়ে দুপুরের পর থেকে। তখন প্রধান সম্পাদক থেকে শুরু করে নিউজ এডিটর, চিফ রিপোর্টার সবাই চলে আসেন। পৃথিবী নামে গ্রহটি তো আগের মতো অপার শান্তির স্বর্গ হয়ে নেই। প্রায়ই কোথাও না কোথাও ঘটছে ভয়াবহ সব ঘটনা। গণহত্যা। স্বাধীনতার জন্য লড়াই। বৈধ গণতান্ত্রিক সরকারকে ফেলে দিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে সেই যে শুরু হয়েছে তার শেষ নেই। শুধুই অশান্তি। এছাড়া মারাত্মক মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো রয়েছেই। ভূমিকম্প। বন্যা। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস। কোনও আগ্নেয়গিরি বহু কাল ঘুমিয়ে থাকার পর আচমকা জেগে উঠে লাভা উগরে দিয়ে ধ্বংস করে দেয় অগুনতি জনপদ। চারদিকে শুধু লোকক্ষয়। এই ধরনের কিছু ঘটলে, সকাল হোক আর মধ্যরাতই হোক, সম্পাদক বার্তা-সম্পাদক সবাই অফিসে দৌড়ে আসেন।
বিনয় যাঁদের কাছে কাজ করবে, এমনিতে তাদের কেউ দুটোর আগে আসেন না। তাই তাড়াতাড়ি যাবার মানে হয় না। আনন্দ বিনয়কে বলল, হাতে অনেক সময় আছে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ধীরেসুস্থে খেয়ে নাও।
বিনয় বলল, আমার খাওয়া হয়ে গেছে। হিরণদা অফিস থাকলে পৌনে নটায় খেতে বসে। ছোটদি তার সঙ্গে আমাকেও জোর করে বসিয়ে দিয়েছিল। যদি দেরি করে গেলে চাকরিটা ফসকে যায়, তাই।
আনন্দ তার শ্যালিকাটিকে ভালই জানে। কারণে অকারণে তার দুশ্চিন্তা। হেসে হেসে বলল, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
সুধা অপ্রস্তুত। ঠোঁট কামড়ে সামান্য হেসে বিনয়কে বলল, সেই কখন খেয়েছিস। আর দুটি খেয়ে নে। আনন্দদা, আগের দিন যখন এসেছিলেন নেমন্তন্ন করা হয় নি। হাতজোড় করে মজার সুরে বলতে লাগল, নিজগুণে ত্রুটি মার্জনা করে আপনিও দুমুঠো খান।
বিনয় এবং আনন্দ কেউ রাজি হল না। বিনয় বলল, অসম্ভব। এখনও ভাত হজম হয়নি। আনন্দ জানায়, বিনয়কে নিয়ে যাবে বলে সে আজ অফিসে যায়নি। বাড়ি থেকে এইমাত্র খেয়েদেয়ে আসছে। আদরের শ্যালিকাটি যেন জোরজার না করে।
