জামতলি ক্যান, ট্যাকা পাইলে পাকিস্থানের যেইহানে কইবেন হেইহানে চইলা যাইব। কন (বলুন) জামতলিতে কী করতে হইব?
রামরতন গাঙ্গুলি এবং তার পরিবার সম্পর্কে সবিস্তার জানিয়ে বিনয় বলল, ওঁদের জমি বাড়ির দলিল আছে নাসের আলি নামে এক ভদ্রলোকের কাছে। তিনি জামতলি হাই স্কুলের অ্যাসিস্টান্ট হেড মাস্টার। একসময় রামরতনবাবুর প্রিয় ছাত্র ছিলেন। খুবই ভাল মানুষ। রামরতনবাবু তাকে সম্পত্তি বিক্রির দায়িত্ব দিয়ে এসেছিলেন। খুব সম্ভব তিনি এখনও তা করে উঠতে পারেননি।
নিত্য দাস জোরে মাথা ঝাঁকায়, হ। ফন্দিফিকির না জানলে পাকিস্থানে বইয়া হিন্দুর সোম্পত্তি ব্যাচন (বেচা) অত সোজা না।
আপনি কি আপনার লোকদের দিয়ে রামরতনবাবুর বাড়িটাড়ি বিক্রি করতে পারবেন? ওঁর ফ্যামিলি ভীষণ কষ্টে আছে। টাকাটা পেলে ওঁরা বেঁচে যাবেন। অবশ্য আপনার যা প্রাপ্য, ঠিকই পাবেন।
উদ্দীপনায় দুচোখ জ্বল জ্বল করে ওঠে নিত্য দাসের। নিয্যস পারুম। আপনে তো জানেন আমার হাতে কত গাহেক আছে। তেনারা এহানেই ট্যাকাপয়সা দিয়া দানপত্র ল্যাখাইয়া বডারের উই পারে চইলা যাই।
বিনয় বলে, তাহলে তো খুবই ভাল হয়। যত তাড়াতাড়ি পারেন, ব্যবস্থা করে দিন।
আগে নাসের আলির কাছে লোক পাঠাই। গাঙ্গুলি মশয়ের সোম্পত্তিগুলান নিয়া তেনি কদ্দূর কী করতে পারছেন, খবর লই। হের পর যা করনের করুম।
কবে আপনার লোক নাসের আলির কাছে যেতে পারবে?
খানিক চিন্তা করে নিত্য দাস বলল, কাইলই বারের উই পারে খবর পাঠামু। লগে লগে তক্ষনই আমার লোক জামতলিতে চইলা যাইব। পরের হপ্তায় তো হ্যামকার চিঠি লইয়া আপনের কাছে আইতেই আছি। নাসের আলির লগে দ্যাখা কইরা আমার নোক কী জানতে পারছে, আপনেরে কইয়া যামু। যদিন নাসের সাহেব অহনও কিছু না কইরা উঠতে পারেন, গাঙ্গুলি মশয়ের ফেমিলির লগে আমার দ্যাখা করন লাগব।
বিনয় বলল, কোনও অসুবিধে নেই। যেদিন বলবেন সেদিনই আপনাকে রামরতনবাবুর স্ত্রী আর মেয়েদের কাছে নিয়ে যাব।
নিত্য দাস আর বসল না। চেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। উৎসাহে সে টগবগ করছে। মনে লয় (হয়), মা কালীর দয়ায় এই কামটা আমি কইরা দিতে পারুম ছুটোবাবু। চলি– সবার। কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে দরজার দিকে পা বাড়ায়।
.
২২.
আজ বিনয়ের অফিসে জয়েন করার দিন। জীবনের একটা পর্ব শেষ। এবার নতুন পর্বের সূচনা। কাল রাতে ভাল করে ঘুমোতে পারেনি সে। বার বার ঘুমটা ভেঙে যাচ্ছিল। আর মাথার ভেতর নানা চিন্তা বিজ বিজ করছিল। ছিল অদ্ভুত এক মানসিক চাপ। চাপের কারণটা এইরকম। আনন্দ। তার বাবার এক সময়ের মক্কেল এবং তাদের পারিবারিক হিতাকাঙ্ক্ষী জগদীশ গুহঠাকুরতাকে ধরে চাকরিটার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বিনয়ের সঙ্গে কথা বলে তাকে পছন্দও হয়েছে জগদীশের। ছোটখাটো একটা পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। জগদীশের কাগজের নিউজ এডিটর তারাপদ ভৌমিক তাকে একটা প্রতিবেদন লিখতে দিয়েছিলেন। পরীক্ষায় সে ভালই উতরে গিয়েছিল। তারাপদ লেখাটার যথেষ্ট তারিফ করেছেন। তার লেখার হাত যে চমৎকার সেটা জগদীশকে জানিয়েও দিয়েছেন।
একটা লেখা না হয় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারাপদ বলেছেন, রোজই বিনয়কে কিছু না কিছু লিখতে হবে। এমন সব রিপোর্ট যা পাঠকরা গোগ্রাসে গিলবে। তাতে কাগজ সম্বন্ধে মানুষের আগ্রহ বাড়বে। প্রচারও বেড়ে যাবে হু হু করে। আর প্রচার বাড়লে, কাগজের লাভ হলে, কর্মীদেরও ষোল আনা লাভ। তাদের মাইনে এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও বাড়বে। সবই ঠিক। কিন্তু বিনয়ের দুশ্চিন্তা, নিত্য নতুন, চমকপ্রদ লেখার জোগান কি সে দিতে পারবে? জগদীশ গুহঠাকুরতা আর তারাপদ ভৌমিককে তার ভাল লেগেছে। জগদীশ রাশভারী। উচ্ছ্বাসহীন। তবু টের পাওয়া গেছে তিনি স্নেহপ্রবণ। তবে তারাপদ ভৌমিক একেবারে মাটির মানুষ। কিন্তু অন্য সহকর্মীরা কেমন হবে, কে জানে। এইসব মিলিয়ে বিনয় নার্ভাস হয়ে পড়েছিল।
সকালে উঠেও অস্থিরতা, দুর্ভাবনা কাটেনি। কর্মজীবনে প্রথম পা ফেলতে চলেছে, সেজন্য এব ধরনের উত্তেজনাও হচ্ছে। সেই সঙ্গে আনন্দও যে হচ্ছে না তা নয়। এ-সবের মধ্যেই মুখটুখ ধুয়ে বাইরের ঘরে হিরণ সুধা এবং দ্বারিক দত্তর সঙ্গে চা খেতে বসল সে।
বিনয় চাকরিতে জয়েন করবে। কিন্তু সুধার উত্তেজনা তার চাইতেও বেশি। চা খেতে খেতে ভাইকে জিজ্ঞেস করল, তোকে কখন বেরুতে হবে?
বিনয় বলল, আনন্দদা এসে আমাকে নিয়ে যাবে বলেছে। দেখি কখন আসে—
সুধা বলল, সেই কবে বলে গিয়েছিল। ভুলে টুলে যায়নি তো?
হালকা ধমকের সুরে হিরণ বলে, ভুলে যাবে! কী যে বল তার মাথামুণ্ডু নেই।
দ্বারিক দত্তও বললেন, আনন্দকে তো জানি। খুবই দায়িত্বশীল ছেলে। কথা যখন দিয়েছে ঠিক চলে আসবে। চিন্তা কোরো না।
হিরণ নটা নাগাদ অফিসে বেরিয়ে যায়। চান টান সেরে পৌনে নটায় খেতে বসে। তাই রোদ উঠতে না উঠতেই এ-বাড়িতে কয়লার উনুন ধরিয়ে রান্নার তোড়জোড় শুরু হয়। তবে সকাল বিকেল সন্ধে বা রাতে চাটা করা হয় ইলেকট্রিক হিটারে কিংবা স্টোভে।
রান্না হয় দুভাগে। প্রথমেই মাছের ঝোল। সরস্বতী বিধবা মানুষ। নিরামিষ খান। আমিষের ছোঁয়া পর্যন্ত বারণ। তাই মাছ হয়ে গেলে উনুন ভাল করে নিকিয়ে ভাত ডাল ভাজা দুতিন রকমের নিরামিষ তরকারি করা হয়। আজ হবে বেগুন ভাজা, মুগের ডাল, আলু কপির ডালনা এবং পালংয়ের ঘন্ট।
