জমিন না নিয়া ট্যাকা নিতে পারেন।
টাকা নেব কী করে? দলিল টলিল সব পড়ে আছে রাজদিয়ায়, দাদুর কাছে। এখন আমাদের কারও পক্ষে পাকিস্তানে গিয়ে সে-সব নিয়ে আসা সম্ভব নয়।
নিত্য দাস দুহাত তুলে হাঁ হাঁ করে ওঠে, আপনেগো পাকিস্থানে যাওন লাগব না। টালিণ্ডঞ্জের এই বাড়িত বইয়াই ট্যাকা পাইয়া যাইবেন। পদ্ধতিটাও সে বিশদভাবে জানিয়ে দেয়। বিনয় সুধা আর সুনীতি, তিন ভাইবোন স্ট্যাম্প পেপারে লিখে জমি বিক্রি বা হস্তান্তরের ক্ষমতা হেমনাথকে দেবে। নিত্যর লোক সেটা নিয়ে রাজদিয়ায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করবে। কলকাতা থেকে পাকিস্তানে চলে যেতে চায়, নিত্যর হাতে এমন বহু ক্রেতা আছে। সবচেয়ে বেশি দাম যে দেবে তার নামেই বিনয়দের জমিটা রেজিস্ট্রি করে দেবেন হেমনাথ। টাকাটা ঢাকার মারোয়াড়িদের কাছ থেকে হুন্ডি করিয়ে ওদের কলকাতার বাজারের গদি থেকে তুলে নিতে তিলমাত্র অসুবিধা হবে না। এইভাবে মারোয়াড়িদের মারফত ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানের মধ্যে আকছার টাকা পয়সার লেনদেন চলছে। বিনয়দের কষ্ট করে বড়বাজার অবধি যেতেও হবে না। নিত্য দাস নিজে গিয়ে টাকাটা এনে দেবে।
একটু ভেবে সে আরও বলে, আপনেরা সন্দ (সন্দেহ) করলেও করতে পারেন যে আমি ট্যাকাটা মাইরা দিমু। কিন্তুক এক দ্যাশে আমাগো বাড়ি। আপনেরা আমার আপন মানুষ। হ্যামকত্তারে কত সোম্মান করি। তেনার নাতি-নাতিনগো আমি ঠকামু না। মাথার উপুর ভগমান আছে, ধম্ম আছে। আমারে বিশ্বাস করতে পারেন। যদিন আপনেগো ট্যাকা মারনের মতলব করি, নিঃবংশ হমু। আমাগো মাথায় ঠাটা (বাজ) পড়ব।
এত বুঝিয়ে সুঝিয়েও সুফল কিছুই হল না। বিনয় নিস্পৃহ সুরে বলল, রাজদিয়ার জমি নিয়ে আমরা কিছুই করব না। যা করার দাদুই করবেন।
হিরণদের জমি বাড়ি তো হাতছাড়া হয়েছেই। সে-সবের জন্য দালালির আশা নেই। এদিকে বিনয়রাও তাদের অতটা জমি বেচবেও না, এক্সচেঞ্জও করবে না। কী যে এদের ভাবগতিক! নিত্য দাস মুষড়ে পড়ে। হতাশার সুরে বলে, নিজেগো কতখানি ক্ষেতি করলেন, অখন বুঝতে পারবেন না ছুটোবাবু। একখান কথা কইয়া থুইলাম, পরে কপাল থাপাড়াইতে হইব। তখন আর কিছু করনের থাকব না।
একটু চুপচাপ।
তারপর নিত্য দাস বলল, ম্যালা রাইত হইয়া গ্যাছে। আইজ উইঠা পড়ি। শীতের রাইতে গাড়িঘুড়া কইমা যায়। এইর পর কসবার বাস পামু না। ছুটোবাবু আপনে খাড়া না কইয়া দিছেন। তর্ভু আমি লাইগা থাকুম কিলাম (কিন্তু)। পরের হপ্তায় হ্যামকত্তার চিঠি লইয়া আহুম। এইর মইধ্যে রাইজদার জমিনটা বেচবেন কিনা, ভাইবা দেইখেন। দুই বইনের লগে, দুই ভগ্নীপতির লগে পরামশ্য কইরেন। দ্বারিক কত্তা বুড়া মানুষ। পিরেথিমীতে কত কিছু দ্যাখছেন, কত কিছু হোনছেন। তেনার মতও লইয়েন।
নিত্য উঠে পড়েছিল, হঠাৎই জামতলি হাই স্কুলের মৃত হেডমাস্টার রামরতন গাঙ্গুলির বৃদ্ধা স্ত্রী এবং তাঁদের তিন মেয়ে ছায়া মায়া আর বাসন্তীর মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিনয়ের। তারপাশা স্টিমারঘাটে পাহারা দিয়ে দিয়ে ওঁদের পৌঁছে দিয়েছিলেন রামরতনের প্রাক্তন ছাত্র নাসের আলি এবং তার অনুগত কয়েকটি সশস্ত্র যুবক।
তারপশায় নাসের আলি আর রামরতনের কথাবার্তা শুনে বিনয় জানতে পেরেছিল, জামতলিতে রামরতনদের চল্লিশ কানি উৎকৃষ্ট চাষের জমি ছাড়াও আছে বসত-বাড়ি, বাগান, পুকুর ইত্যাদি। তাদের সম্পত্তির দলিল রেখে এসেছেন নাসেরের কাছে। রামরতন বিশেষ করে অনুরোধ করেছিলেন নাসের যেন সুযোগ পাওয়ামাত্র তাদের জমিবাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা করেন। খালি হাতে কলকাতায় যাচ্ছেন। সেখানে টাকার বড় দরকার।
কদিন আগে বিমলদের বাড়ি গিয়েছিল বিনয়। রামরতনের স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, নাসের আলি এর মধ্যে তাদের বাড়িটাড়ি বেচার বন্দোবস্ত করতে পেরেছেন কি না। অবশ্য তেমন কিছু হলে বৃদ্ধা নিশ্চয়ই তাকে খবরটা দিতেন। খুব সম্ভব কলকাতায় আসার পর নাসেরের সঙ্গে তিনি যোগাযোগই করতে পারেননি।
নিত্য দাস যে ধরনের ফন্দিবাজ লোক, রামরতনের সম্পত্তির ব্যাপারে মাথা খাঁটিয়ে কিছু একটা ফিকির কি আর বার করতে পারবে না? বিনয় হাত নেড়ে বলল, আর একটু বসে যান। কাজের কথা আছে।
নিত্য দাস অবাক। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করল, কী কাম?
আগে বসুন তো। সব শুনুন। কাজটা করে দিতে পারলে আপনার বেশ ভাল লাভ থাকবে।
টাকা পয়সার গন্ধ পেয়ে মুষড়ে-পড়া ভাবটা কেটে যায় নিত্য দাসের। লহমায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে সে। কাপ করে ফের চেয়ারে বসে পড়ে।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, জামতলির নাম শুনেছেন?
নিত্য দাস বলল, হুনুম না ক্যান? তারপাশা ইস্টিমারঘাটা থিকা চার মাইল পুবে। আলিসান গেরাম। বামন কায়েত যুগী তেলী কুমার কামার মুসলমান-নানা জাইতের মাইনষের বাস। আছে বড় বড় দিঘি, পদ্মবিল। ম্যালা দালানকোঠা। এককালে দশ বিশটা টোল আছিল। পাকিস্থান–
নিত্য দাস যেভাবে শুরু করেছে তাতে জামতলির ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক বিবরণ আরও অনেকক্ষণ চলত। হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল বিনয়, বুঝেছি, ওই জায়গাটা আপনি ভাল করেই চেনেন।
হেইখানে গ্যাছিও কয়েক বার। তা আতখা (হঠাৎ) জামতলির কথা উঠাইলেন যে ছুটোবাবু?
দরকার আছে। পাকিস্তানে আপনার যে কাজের লোকেরা আছে তারা কি জামতলি যেতে পারবে?
