খানিক চুপচাপ।
যার জন্য এতক্ষণ অস্থির হয়ে ছিল, এই ফাঁকে সেটা বলে ফেলে বিনয়, অনেক দিন পর আপনি এলেন। আর দু-একদিন দেখে আপনার বাড়িতে যেতাম। কেন জানেন? দাদুকে যে সেই চিঠি লিখেছিলাম তার উত্তর এখনও পাইনি। রাজদিয়া থেকে তার চিঠি কি এসেছে?
আস্তে মাথা নাড়ে নিত্য দাস, না। তয় (তবে) আমার হেই লোকটা, জয়নাল যার নাম, ঢাকা আর ফরিদপুর থিকা চিঠিপত্তর আইনা বর্ডারে পৌঁছাইয়া দ্যায়, হেয় খবর পাঠাইছে পরের হপ্তায় হ্যামকত্তার চিঠি লইয়া আইব।
দাদুর জন্যে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি।
চিন্তা তো হওনের কথাই। হ্যামকত্তার চিঠি যে আর কয়দিনের মইধ্যেই পাইবেন হেই কথাখান কওনের লেইগা কাইল আইতাম। কিন্তু হিরণ ভাইগো সোম্পত্তি এচ্চেঞ্জের খবর পাইয়া আইজই চইলা আইছি।
দাদু আর দিদারা কেমন আছেন কিছু জানেন?
না।
দিন কুড়ি আগে দাদু যে চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন তাতে লিখেছেন, রাজদিয়ার অবস্থা দিনকে দিন খুব খারাপ হচ্ছে। এখন ওখানে কী চলছে, কে জানে।
নিত্য দাস বলে, বডারে জয়নালের লগে দেখা না হওন তরি (পর্যন্ত) কিছুই কইতে পারুম না। আর তো কয়টা দিন। হের পর হ্যামকত্তার চিঠি আইনা দিমু। হগল জানতে পারবেন। তদ্দিন এটু ধৈয্য ধইরা থাকেন।
সরকারি ডাক বিভাগে এখনও ঠিকমতো কাজ হচ্ছে না। প্রায় অচল। হেমনাথের সঙ্গে যেটুকু যোগাযোগ সবই নিত্য দাসের মারফত। তার নোকজন পূর্ব পাকিস্তানের, বিশেষ করে ঢাকা আর ফরিদপুরের নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। তারা ওই দুই ডিস্ট্রিক্টের হিন্দুদের চিঠিপত্র বা অন্যান্য খবরাখবর বর্ডার অবধি পৌঁছে দেয়। সীমান্তের এপারেও বেশ কিছু লোককে কাজে লাগিয়েছে নিত্য দাস। তারা এখানকার মুসলমানদের চিঠি টিঠি সীমান্তে নিয়ে গিয়ে নিত্যর ওপারের লোকেদের হাতে তুলে দেয়। তেমন জরুরি কিছু হলে স্বয়ং নিত্যকেই বর্ডারে গিয়ে তার পাকিস্তানি এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলতে হয়।
যতদিন না নিত্য দাস হেমনাথের চিঠি নিয়ে আসছে, অপেক্ষা করে থাকা ছাড়া উপায় কী?
রাত বাড়ছিল। তাপাঙ্ক হু হু করে নেমে যাচ্ছে। বড় রাস্তা থেকে ক্কচিৎ ট্রাম বাস কিংবা অন্য যানবাহনের ছুটে যাওয়ার ক্ষীণ শব্দ বা লোকজনের অস্পষ্ট কথা ভেসে এসেই মিলিয়ে যায়। ঘরে বসেই টের পাওয়া যায়, রাস্তাঘাট দ্রুত ফাঁকা হয়ে আসছে। এই শীতের রাতে মহানগর যখন হিমে কুয়াশায় কুঁকড়ে রয়েছে, কে আর বাইরে থাকতে চায়?
নিত্য দাস অন্যমনস্কর মতো কী ভাবছিল। হঠাৎ তার দুই চোখ চকচক করে ওঠে। বেশ উত্তেজিত ভাবেই ডাকে, ছুটোবাবু
নিত্যর গলার স্বরের পরিবর্তনটা খট করে কানে ধাক্কা দেয় বিনয়ের। সে রীতিমতো অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবেন?
হ। নিত্য বলতে থাকে, আপনের বাবায় কেতুগঞ্জের মজিদ মিঞার কাছ থিকা তিরিশ কানি জমিন কিনছিলেন না? তিন ফসলী চেমৎকার খেতি। বচ্ছরে তিনবার ফসল হইত। আউশ আমন আর রবিখন্দের সোময় তিল কলই সউর (সর্ষে) রান্ধনি–
বিনয় সায় দেয়, হ্যাঁ, খুবই ভাল জমি।
শুনছি, আপনের বাবার তীর্থধম্মে মতি হইছে। তেনি সোংসার, পোলমাইয়ার মায়া ছাইড়া কুন এক গুরুর কাছে চইলা গ্যাছেন?
হ্যাঁ।
তা রাইজদার হেই জমিগুলানের কী ব্যবস্তা কইরা গ্যাছেন?
অবনীমোহন গুরুর কাছে চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে রাজদিয়ায় তার বিষয়আশয়ের ব্যাপারটা পুরোপুরি মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল বিনয়ের। নিত্য দাস কিন্তু ভোলেনি। পাকিস্তানে তার পরিচিত মানুষজনের কার কতটুকু জমি এবং অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, সমস্ত কিছু তার নখদর্পণে।
বিনয় বলল, বাবা কোনও ব্যবস্থাই করে যাননি। জমিগুলো যেমন ছিল তেমনিই রয়েছে। দাদু লোক দিয়ে কবছর ধরে চাষবাস করাচ্ছেন।
বিপুল উদ্যমে বিনয়ের ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিত্য দাস, আমার একখান পরামশ্য লন (নিন) ছুটোবাবু।
কী পরামর্শ?
হ্যামকত্তা তেনার বিষয় সোম্পত্তি এচ্চেঞ্জ করবেন কি না, তেনিই জানেন। ওনার মতিগতির তল পাই না। পাকিস্থান হইয়া গ্যাছে। উইখানের লগে আমাগো সম্পর্ক শ্যাষ। এত বড় বিদ্বান মানুষ, ক্যান যে বুঝেন না, হিন্দুরা বডারের উইধারে থাকতে পারব না। দ্যাশের উপুর ক্যান যে অ্যাত টান! ক্যান যে অ্যাত মায়া! হে যাউক, উনি যা ভালা মনে করবেন হেয়াই করবেন। কিন্তুক আপনেগো জমিনগুলান এচ্চেঞ্জ কইরা ফালান। আমার হাতে গাহেক আছে।
ইঙ্গিতটা আগেই পেয়ে গিয়েছিল বিনয়। কিন্তু জমিজমা, বিষয়আশয় সম্পর্কে তার কোনও রকম মোহ নেই। তাছাড়া রাজদিয়ার ওই জমি তার একার নয়, সুধা এবং সুনীতিরও। ওই ব্যাপারে তাদেরও খুব একটা আগ্রহ নেই।
বিনয় বলল, দেখুন, বাবা আমাদের তিন ভাই বোনকে বলে গেছেন, ওই জমিটা নিয়ে আমরা যা ভাল বুঝি তাই যেন করি। কিন্তু এ নিয়ে আমরা এখনও কিছু ভাবিনি। একটু থেমে ফের বলল, রাজদিয়ার জমি এক্সচেঞ্জ করলে ওয়েস্ট বেঙ্গলে খানিকটা জমি হয়তো পাব কিন্তু সে-সব কে দেখাশোনা করবে? কে চাষবাস করাবে? আমাদের অত সময় নেই। ওগুলো যেমন আছে তেমনই থাক।
নিত্য দাস সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। জোঁকের মতো সে লেগে থাকে। জমিনের বদলে যদিন এই পারের জমিন না ন্যান, অন্য এট্টা উপায়ও হইতে পারে।
লোকটা ফন্দিবাজ। নিশ্চয়ই তার মাথায় হঠাৎ কোনও একটা মতলব খেলে গেছে। বিনয় সামান্য। উৎসুক হল, কী উপায়?
