দ্বারিক দত্তর পরনে মোটা খদ্দরের ধুতি, পাঞ্জাবি এবং সোয়েটারের ওপর শাল। মাথায় কানঢাকা উলের টুপি। বিনয় আর হিরণের গায়ে ঘরে পরার পোশাক। পাজামা এবং পাঞ্জাবির ওপর ভারী পুল-ওভার। নিত্য দাসও তুষের রোঁয়াওলা চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে আষ্টেপৃষ্ঠে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে।
উত্তুরে বাতাস রুখবার জন্য ঘরের সব দরজা-জানালা সেই বিকেল থেকে বন্ধ। তবু অদৃশ্য ছিদ্র দিয়ে ঘরের ভেতর হিম এসে ছুঁচের মতো হাড়ের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।
টালিগঞ্জের এই এলাকাটায় মশাদের প্রচণ্ড উৎপাত। বেলা পড়ে এলে তারা ঝাঁকে ঝাকে চারপাশের বাড়িগুলোতে হানা দিতে থাকে। দরজা-জানালা বন্ধ করেও রেহাই নেই। মশাদের একটা পল্টন ঠিক ফাঁক খুঁজে খুঁজে হিরণদের এই বাইরের ঘরটায় চলে এসেছে। পিন পিন আওয়াজ তুলে সমানে চক্কর দিচ্ছে। আর তাক বুঝে চারটি মানুষের শরীরে যেখানে যেখানে খোলা জায়গা নজরে পড়ছে, ঝাঁপিয়ে পড়ে হুল বেঁধাচ্ছে।
উমা চা-বিস্কুট দিয়ে গিয়েছিল। একটা কাপ তুলে সশব্দে লম্বা চুমুক দিয়ে নিত্য দাস বলল, ভাবছিলাম কাইল দিনের বেইলে আহুম। কিন্তুক শুনাশুন একখান কথা কানে আইতে আইজই লৌড়াইয়া আইলাম।
অন্য সবাইও চায়ের কাপ তুলে নিয়েছিল। হিরণ জিজ্ঞেস করল, কী শুনে দৌড়ে এলেন?
প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে নিত্য দাস বলে, এইটা কি ভালা হইল হিরণ ভাই?
আপনার কথা কিছুই তো বুঝতে পারছি না। কোনটা ভাল হল না?
এই যে দ্যাশের বাড়ি-জমিন এচ্চেঞ্জ করলেন, হেই খবরটা একবার আমারে জানাইলেন না?
হিরণ অবাক। পলকহীন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে বলে, আপনাকে জানাবার কথা কি ছিল?
অনুযোগের সুরে নিত্য দাস বলল, হেয়া আছিল না। কিন্তুক আমি আপনেগো দ্যাশের লোক। আপনে তো জানেন, আমি হিন্দুস্থান-পাকিস্থানের সোম্পত্তি এক্ষেঞ্জের কারবার করি। আগে যেইদিন আইছিলাম, ঠিকানা দিয়া গ্যাছি। একখান পোস্টোকার্ড ছাইড়া দিলে কবে চইলা আইতাম।
লোকটা কী চাইছে, বুঝতে না পেরে তাকিয়েই তাকে হিরণ।
নিত্য দাস এবার বলে, রাইজদায় আপনেগো দুই-ফসলী ষাইট কানি সরস চাষের জমিন, বাগ বাগিচা, পুকৈর, বসত বাড়ি–হেই হগলের বদলে পাইলেন কিনা খান মঞ্জিল। যাইট সত্তর বছরের পুরানা একখান দালান।
অপার বিস্ময়ে হিরণ জিজ্ঞেস করে, খান মঞ্জিল-এর সঙ্গে আমাদের বাড়িটাড়ি এক্সচেঞ্জ করেছি, আপনি জানলেন কী করে?
এক বচ্ছরের উপুর এই কাম করতে আছি হিরণভাই। ম্যালা (অনেক) খবর আমারে রাখতে হয়। কারা ইন্ডিয়ার সোম্পত্তি বদলাবদলি কইরা পাকিস্থানে যাইতে চায়, কারা পাকিস্থান থিকা একই উদ্দিশ্য লইয়া ইন্ডিয়ায় আইতে চায়–এই হগল না জানলে কারবার চালামু ক্যামনে?
হিরণ উত্তর দিল না।
এদিকে বিনয় একদৃষ্টে নিত্য দাসকে লক্ষ করছিল। রাজদিয়া থেকে হেমনাথের চিঠি এসেছে কি না, জানার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পাচ্ছে না।
নিত্য দাস বলে ওঠে, আমার হাতে আরও বড় গাহেক (খদ্দের) আছিল। আপনেগো জমিন বাড়ির বদলে এই টালিগুঞ্জেই খান মঞ্জিল-এর দ্যাড়া (দেড় গুণ) বাড়ি আর পেরায় নয় কাঠা জমিন পাইয়া যাইতেন। আর হেই বাড়িও খান মঞ্জিল-এর লাখান অত কালের পুরানা না। একটু থেমে ফের শুরু করে, আপনেগো জবর লুকসান হইয়া গ্যাল। আমিও মধ্যিখান থিকা ফাঁকে পইড়া গ্যালাম। আপনেগো কাছ থিকা বেশি কিছু নিতাম না; কিন্তু অন্য পক্ষ কম কইরা পাঁচ সাত হাজার নিয্যস (নিশ্চয়) দিত। ইস, দানপত্র করনের আগের দিনও যদিন ট্যার পাইতাম, খান মঞ্জিল এর এচ্চেঞ্জটা আটকাইয়া দিতাম।
নিত্য দাসের এত মনস্তাপ, এমন আফসানির কারণ এতক্ষণে বোধগম্য হল। বিরাট অঙ্কের দালালিটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় শোক উথলে উঠেছে তার।
হিরণ আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে, তা পারতেন না।
ক্যান?
অনেক আগেই শওকত আলি খানের সঙ্গে এক্সচেঞ্জের কথাবার্তা বলে রেখেছিলাম। তখনও আপনি আমাদের এ-বাড়িতে আসেননি। দাদু আর জেঠিমা সেই সময় পাটনায়। দেশের জমিজমার বদলে মুসলিম প্রপার্টি নিতে ওঁদের ভীষণ আপত্তি ছিল। সুধারও মত ছিল না। পরে অবশ্য সবাই রাজি হল। শওকত সাহেব আমাদের আশায় এতদিন অপেক্ষা করে ছিলেন। তাকে কি ফট করে না বলে দেওয়া যায়?
দ্বারিক দত্ত নিঃশব্দে দুজনের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। এবার মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, কথা যখন দেওয়া হয়েছে তার নড়চড় করা ঠিক হতো না।
নিত্য দাস থতমত খেয়ে গেল। নিমেষে সামলে নিয়ে গলার স্বর একটু উঁচুতে তুলে বলল, একখান কথা কমু, কিছু মনে কইরেন না। আপনেরা অহনও সইত্য যুগে পইড়া আছেন। দিনকাল আর আগের লাখান নাই। যা করলে লাভ বেশি হেয়াই করন উচিত। যদিন সুযুগ পাওন যায় হেইটা পুরা উশুল কইরা নেওন হইল বুদ্ধিমানের কাম। কারে শুকনা মুখের কথা দিছিলেন হেয়া ধইরা বইয়া থাকলে চলে?
নিত্য দাস নামে এই ধুরন্ধর লোকটা জগতে মাত্র কয়েকটা জিনিসই বোঝে। অনেক টাকা। অনেক লাভ। আর সুযোগ এলে পুরোপুরি সেটা কাজে লাগাবার জন্য সারাক্ষণ চোখকান খোলা রাখা।
একনাগাড়ে উপদেশ বর্ষণ করে হাঁফিয়ে পড়েছিল নিত্য দাস। একটু দম নিয়ে আবার আরম্ভ করে, দ্যাশের অত সোম্পত্তির বদলে আপনেরা পাইলেন মোটে ছয় কাঠা জমিন আর পুরানা একখান দালান। আর আমার কপালে ঠনঠনঠন। একটা ঘষা আধলাও জুটল না। হগলই অদ্দিষ্ট। আক্ষেপে তার গলা বুজে আসে।
