প্রথমে পুরুষেরা খাবে। তারপর সুধা সুনীতি উমা এবং সরস্বতী।
মুখোমুখি খেতে বসেছিল হিরণরা। একদিকে সে আর বিনয়। অন্যদিকে দ্বারিক দত্ত এবং আনন্দ। পরিবেশন করছিল সুধা আর সুনীতি। উমা তাদের হাতে এটা সেটা এগিয়ে দিতে লাগল দরকার মতো। রান্না হয়েছে প্রচুর। উমাকে সঙ্গে নিয়ে দশভুজা হয়ে সব প্রায় একাই করে ফেলেছে সুধা। সুনীতি এ-বাড়িতে এসেছে বেলা করে। এসেই রান্নায় হাত লাগিয়েছে। সেও দু-একটা পদ বেঁধেছে।
খেতে খেতে নানা কথা হচ্ছিল। তার সবটাই আজকের এই দানপত্রের বিষয়ে। আনন্দ বলছিল, ক, কলকাতায় তোমাদের একটা ভাল প্রপার্টি হল।
হিরণ খুব খুশি। দুটো মাস প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিল সে। দ্বারিক দত্ত আর সরস্বতী যেভাবে বেঁকে বসেছিলেন তাতে মনে হয়েছিল খান মঞ্জিল হাতছাড়া হয়ে যাবে। আজ সব দুর্ভাবনার অবসান। এতদিনের দৌড়ঝাঁপ সার্থক।
হিরণ হেসে হেসে বলল, তা হল। কোনওদিন ভাবিনি, কলকাতায় আমরা বাড়ি করতে পারব।
আনন্দ বলল, যত তাড়াতাড়ি পার, বাড়িটা সারিয়ে টারিয়ে নাও ।
তা তো নিতেই হবে। দুচারদিনের ভেতর প্রভিডেন্ট ফান্ডের লোনের জন্যে অ্যাপ্লাই করব।
তার পরও যদি কিছু টাকা দরকার হয়, আমাকে বোলো। লজ্জা কোরো না।
আগে দেখি কতটা পাওয়া যায়। তাতে না কুলোলে আপনার কাছে হাত পাততেই হবে।
একটু ভেবে আনন্দ জিজ্ঞেস করল, বাড়িটার নাম খান মঞ্জিলই থাকবে না কি?
হিরণ মাথা নেড়ে বলে, না না, দাদুর সঙ্গে আগেই কথা হয়েছে অন্য একটা নাম দিতে হবে। সবে তো আজ দানপত্র হল। পরে সবাই মিলে বসে নামটা ঠিক করে নেব। সেদিন সুনীতি দিদি আর আপনাকেও ডাকব। এর মধ্যে আপনারাও নাম ভাবতে থাকুন। আমরাও ভাবি। যেটা বেশি ভোট পাবে সেই নামই রাখা হবে।
খেতে খেতে বিনয় লক্ষ করছিল, দ্বারিক দত্ত কোনও মন্তব্য করছেন না। চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছেন। কিছু একটা চিন্তার ভেতর মগ্ন হয়ে আছেন। কেমন যেন ঝিম-ধরা ভাব। অথচ খানিক আগে শওকতরা যখন ছিলেন, অনবরত কথা বলছিলেন।
কী ভাবছেন তিনি? দেশের বাড়িঘর জমিজমা ফেলে চলে আসতে হয়েছে। হয়তো বেদখল হয়ে যেত, তবু বলা যেত, সে-সব তাঁদেরই। তারাই রাজদিয়ার ওই সম্পত্তির বৈধ স্বত্বাধিকারী। কিন্তু দানপত্রে সই করার পর রাজদিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের যে পলকা গিটটা ছিল, পট করে সেটা ছিঁড়ে গেল। সেই জন্যই কি দ্বারিক দত্ত এমন নিঝুম? এমন বিমর্ষ?
খাওয়াদাওয়ার পর সবাই ঘণ্টা দুই বিছানায় গড়িয়ে নিল। তারপর শীতের বেলা ঢলে পড়লে চা খেয়ে আনন্দ আর সুনীতি বেরিয়ে পড়ল। ওরা বাড়ি ফিরে যাবে। হিরণ এবং বিনয় ওদের এগিয়ে দিতে সঙ্গে সঙ্গে চলল।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে আনন্দ বিনয়কে বলছিল, তোমার অফিসে জয়েন করার সময় কিন্তু হয়ে এসেছে। আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। মনে আছে তো?
বিনয় ঘাড় কাত করল, নিশ্চয়ই
সেদিন সকালে এখানে এসে তোমাকে সঙ্গে করে অফিসে নিয়ে যাব। মানে প্রথম দিন
কলকাতার রাস্তাঘাট এর মধ্যেই অনেকটা সড়গড় হয়ে গেছে বিনয়ের। সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে তাদের অফিসে চোখ বুজে সে চলে যেতে পারবে। টালিগঞ্জ থেকে ট্রাম বা বাসে ধর্মতলা, সেখান থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ ধরে যে বাসগুলো শ্যামবাজারের দিকে যায় তার কোনও একটা ধরলেই হল। তাদের অফিসের সামনেই স্টপেজ। তাছাড়া বিনয় নাবালক নয় যে তাকে অফিসে পৌঁছে। দিতে হবে। তবে আনন্দ যখন চাইছে তখন তার মুখের ওপর না বলল না সে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর গলা নামিয়ে বিব্রতভাবে আনন্দ বলল, বলার মুখ নেই, তবু বলছি। মা তোমাকে একবার আমাদের বাড়ি যেতে বলেছে।
চকিতে হেমনলিনীর চেহারাটা চোখের সামনে ফুটে ওঠে। নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন এক মহিলা। দাঁতে দাঁত চেপে থাকে বিনয়। উত্তর দেয় না।
ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল আনন্দর। সে বলে, জানি, আমাদের ভীষণ অন্যায় হয়ে গেছে। তবু বলছি, যদি তোমার ইচ্ছে হয়, একবার যেও।
বিনয় এবারও চুপ। এই জীবনে হেমনলিনীর মুখদর্শন করার ইচ্ছা তার নেই। বড় রাস্তায় এসে সুনীতি আর আনন্দকে একটা ফাঁকা ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে সে আর হিরণ বাড়ি ফিরে আসে।
২১-২৫. হিরণদের রাজদিয়ার জমিবাড়ি
২১.
হিরণদের রাজদিয়ার জমিবাড়ি এক্সচেঞ্জের পাকাপাকি ব্যবস্থা হয়ে যাবার দুদিন বাদে হঠাৎ লাফাতে লাফাতে নিত্য দাস এসে হাজির। সে এল সন্ধের পর। বেশ কিছুদিন বাদে তাকে সুধাদের বাড়িতে দেখা গেল।
এর মধ্যে হিরণ অফিস থেকে ফিরে এসেছিল। এখন বাড়িতে রয়েছে সে, বিনয়, দ্বারিক দত্ত এবং উমা। সুধা আর সরস্বতী নেই। কাছেই এক বাড়িতে সত্যনারায়ণের পুজো। ওঁরা বিশেষ করে যাবার জন্য বলে গিয়েছিলেন। সরস্বতী আগের তুলনায় ইদানীং অনেকটাই ভাল। জবুথবু ভাব আর ততটা নেই। মোটামুটি হাঁটাচলা করতে পারেন। সুধা তাঁকে নিয়ে পুজোবাড়িতে গেছে। পুজো শেষ হলে গীতাপাঠ হবে। তারপর প্রসাদ নিয়ে ওদের ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
অনাত্মীয় লোকজন এলে যেমনটা করা হয়, নিত্য দাসকেও তেমনি বাইরের ঘরে বসানো হয়েছে। ওখানেই রয়েছে বিনয়, হিরণ এবং দ্বারিক দত্ত।
আজ সেই বিকেল থেকেই জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। যত সময় যাচ্ছে, ঠাণ্ডার দাপট ততই বেড়ে চলেছে। কনকনে হাওয়া ছেড়েছে উত্তর দিক থেকে। চামড়ায় লাগলে মনে হয়, ছুরির ফলা কেটে কেটে বসে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে গাঢ় হয়ে নামছে কুয়াশা।
