কিন্তু উত্তরটা দিলেন দ্বারিক দত্ত, রাজদিয়ার মানুষ খুবই ভাল ছিল। এতকাল আমরা কী আনন্দে যে পাশাপাশি থেকে এসেছি। কিন্তু এখন আর আগের মতো সবকিছু নেই। তবে —
সামনের দিকে ঝুঁকে শওকত জিজ্ঞেস করলেন, তবে কী?
আপনাদের কোনও ভয় নেই। আপনারা বিপদে পড়েন, এমন কিছুই ওরা করবে না।
ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। স্বজাতের মানুষজনকে রাজাকাররা নিশ্চয়ই রেহাই দেবে।
তবু কোথায় যেন খানিক ধন্দ থেকেই যায় শওকতের। একটু চিন্তা করে তিনি বলেন, আপনার একটা পরামর্শ চাইছি চাচাজি
বলুন
রাজদিয়ায় গিয়ে যদি অসুবিধায় পড়ি, কার কাছে যাব? মানে যিনি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন দ্বারিক দত্ত। তারপর বলেন, একজনের কথা বলতে পারি। নির্দ্বিধায় আপনি তার কাছে যেতে পারেন।
কে তিনি?
আমার বন্ধু হেমনাথ মিত্র। বিনয়ের দাদা (দাদু)। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, পার্টিশান হয়ে যাবার পর লাখ লাখ হিন্দু ইন্ডিয়ায় চলে এসেছে। রোজই দলে দলে আসছে। আবার লক্ষ লক্ষ হিন্দু পাকিস্তানে থেকেও গেছে। তারা ভিটেমাটি ছেড়ে ইন্ডিয়ায় আসবে না। হেমনাথ তাদেরই একজন। রাজদিয়ার সে সব চাইতে রেসপেক্টেড পার্সন। আমাদের সেই ছোট্ট টাউনটা ঘিরে তিরিশ চল্লিশটা গ্রামের সব মানুষ, হিন্দুই হোক কি মুসলমান হোক, তাকে সম্মান করত। যতদূর জানি, এখনও করে। হেমনাথ যে আজীবন কত মানুষকে কত ভাবে সাহায্য করেছেন, বিপদের দিনে সবার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন তার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে দ্বারিক দত্ত বললেন, সে কারওকে ফেরায় না। তার দরজা সব সময় সকলের জন্যে খোলা।
শওকতের দুর্ভাবনা কিছুটা কেটে যায়। উৎসুক সুরে বলেন, মেহেরবানি করে আমার সম্বন্ধে, ওঁকে একটা চিঠি লিখে দেবেন?
নিশ্চয়ই দেব। আপনি তো এখনও কদিন ইন্ডিয়ায় আছেন। চিঠিটা এর মধ্যে লিখে রাখব। আপনি নিজে এসে নিয়ে গেলে খুশি হব। কারণ আপনার সঙ্গে আর একবার দেখা হবে। নইলে কারওকে পাঠাবেন। তার হাতে দিয়ে দেব।
আমি নিজেই আসব।
খুব ভাল।
হঠাৎ বিনয়ের মনে হয়, দ্বারিক দত্ত বেশ কিছুদিন আগে ইন্ডিয়ায় চলে এসেছেন। দেশের হাল তখন যা দেখে এসেছিলেন, এর ভেতর তার চাইতে ঢের খারাপ হয়ে গেছে। এখন আতঙ্ক অনেক বেশি তীব্র। দিনকে দিন সমস্ত বদলে যাচ্ছে। আজ যতটা খারাপ, কাল তার চেয়ে আরও খারাপ। হেমনাথ এই মুহূর্তে কী অবস্থায় আছেন, বিপুল সম্মান নিয়ে তার পক্ষে পাকিস্তানে থাকা সম্ভব হচ্ছে কি না, কিছুই জানা নেই।
নিত্য দাস তার যে চিঠিখানা দিয়ে গিয়েছিল, তারপর দুসপ্তাহের মতো কেটে গেছে। এর মধ্যে রাজদিয়ায় কী ঘটে চলেছে, কলকাতায় বসে সেই সব ঘটনাপ্রবাহের হদিস পাওয়া অসম্ভব। নিত্য দাসও আর আসেনি যে তার কাছ থেকে সেখানকার কোনও খবর পাওয়া যাবে। প্রয়োজন হলে শওকতের জন্য হেমনাথের পক্ষে এই মুহূর্তে কতটা কী করা সম্ভব, সে সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
চকিতে অন্য একজনের মুখ বিনয়ের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মোতাহার হোসেন চৌধুরি। হেমনাথের পর ওই অঞ্চলের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ। হিন্দু মুসলমানের বিভাজন কোনওদিনই মেনে নেননি। দুই সম্প্রদায়ের ভেদ-বিভেদ যখন মাথা চাড়া দিয়ে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছল, কী কষ্টই না পেয়েছেন! দেশভাগের পর একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। বিনয় তো সেইসময় দেখেছে, সারাক্ষণ মুহ্যমান হয়ে থাকতেন মোতাহার হোসেন। মনে হতো, মানুষ নয়, একটা ভগ্নস্তূপ।
সেই ছেচশ্লিশ সাল থেকে রাজদিয়ার বেশির ভাগ লোকজন রাতারাতি পালটে গেল। দুদিন আগেও যারা হেসে হেসে কথা বলত, তাদের মুখ থেকে হাসি উধাও হল। তখন তাদের দুচোখে ঘৃণা। সন্দেহ। কিন্তু মোতাহার হোসেন চৌধুরি একই রকম থেকে গেলেন। হেমনাথের মতো তিনিও অন্যের জন্য দুহাত বাড়িয়ে রেখেছেন।
মোতাহার হোসেনের কী জাত, কোন সম্প্রদায়, এ নিয়ে রাজদিয়ার কেউ কখনও মাথা ঘামায়নি। তিনি মাস্টার মশায়, শ্রদ্ধেয় গুরুজন। ব্যস, এ-ই ছিল তার একমাত্র পরিচয়। বাকি সব কিছুই অনাবশ্যক। অর্থহীন।
কিন্তু এই মুহূর্তে আচমকা বিদ্যুৎচমকের মতো বিনয়ের মাথায় যা খেলে গেল তা হল, মোতাহার হোসেন হিন্দু-মুসলমানের পারস্পরিক বিদ্বেষ যতই অপছন্দ করুন, দেশভাগ যতই তার বুকে শেল বিধিয়ে দিক, তিনি একজন মুসলমান। পাকিস্তানের এখন যা পরিস্থিতি তাতে হেমনাথ মিত্রের চেয়ে মোতাহারই হয়তো অনেক বেশি উপকার করতে পারবেন।
বিনয় শওকতকে বলল, আমিও একজনকে চিঠি লিখে দেব। তার সঙ্গেও দেখা করবেন।
শওকত জিজ্ঞেস করলেন, কার কথা বলছেন?
বিনয় মোতাহার হোসেন সম্পর্কে বিশদভাবে জানায়।
এইসব কথাবার্তার মধ্যেই দুই আইনজ্ঞ দুনম্বর দানপত্রে সাক্ষীদের দিয়ে সই-সাবুদ করিয়ে নিয়েছেন।
প্রতিটি দানপত্রের দুটো কপি করা হয়েছে। আপাতত একটা করে কপি দুই উকিলের কাছে থাকবে। পরে সেগুলো তাদের মক্কেলদের দেওয়া হবে।
যে-উদ্দেশ্যে আজ জাফর শা রোডের এই বাড়িটিতে এতগুলো মানুষ জড়ো হয়েছে তা সুচারুভাবে শেষ হল। কোথাও এতটুকু ত্রুটি নেই।
এবার আপ্যায়নের পালা।
হিরণ ভেতরে গিয়ে খবর দিতেই সুধা, সুনীতি এবং উমা লুচি তরকারি মিষ্টি-টিষ্টি নিয়ে এল।
.
অতিথিরা চলে যাবার ঘণ্টাদেড়েক পর খাবার ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে দ্বারিক দত্তদের খেতে বসিয়ে দিল সুধা। সুনীতিদের মতো এ-বাড়িতেও টেবল-চেয়ারে নয়, মেঝেতে সুতোর ফুল-তোলা আসন পেতে খাওয়ার ব্যবস্থা।
