শওকত আলি খান বললেন, চিরকাল কি এমন হাল থাকবে? সব বদলে যাবে চাচাজি দ্বারিক তার বাবার না হলেও কাকার বয়সী তো হবেনই। তাই চাচাজি বলা।
দ্বারিক দত্ত উত্তর দিলেন না।
শওকত এবার বললেন, আপনি যেতে না পারেন, হিরণবাবু আছেন। তার বয়েস কম, অনেক দিন বেঁচে থাকবেন। দেশের বাড়ি দেখতে যাবার ইচ্ছে কি কখনও তার হবে না?
দ্বারিক দত্ত বললেন, হয়তো হবে। হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, উকিলবাবুরা যদি মনে করেন, আপনার দানপত্রটা এখানে রেজিষ্ট্রি হতে পারে, কিন্তু আমি পাকিস্তানে গিয়ে আমার দানপত্র রেজিস্ট্রি করে দিয়ে আসতে পারব না।
শওকত বললেন, আপনাকে এজন্যে কষ্ট করে এখন বর্ডারের ওপারে যেতে হবে না। তিনি সবিস্তার জানালেন, তার এত্মীয় জাহাঙ্গির যে হিন্দু ভদ্রলোকটির সঙ্গে প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ করে নারায়ণগঞ্জে চলে গেছেন তিনি অনেক আগেই বাড়িঘর এক বিশ্বাসী মুসলমান বন্ধুর হেফাজতে রেখে কলকাতায় পালিয়ে এসেছিলেন। জাহাঙ্গিরের সঙ্গে এক্সচেঞ্জের কথাবার্তা তার কলকাতাতেই হয়েছিল। তিনি দ্বারিক দত্তর মতোই পাকিস্তানি স্ট্যাম্প পেপারে দানপত্র করে দিয়েছিলেন কিন্তু নিজে নারায়ণগঞ্জে আর যাননি। জাহাঙ্গির কীভাবে যেন আইনের দিক থেকে সেটা বৈধ করিয়ে নিয়েছে। শওকত আলি খানকে সে জানিয়ে দিয়েছে, সেরকম দরকার হলে সব ব্যবস্থা সে-ই করে দেবে। শওকত যত তাড়াতাড়ি পারেন দ্বারিক দত্তকে দিয়ে দানপত্র লিখিয়ে যেন পাকিস্তানে চলে যান।
তাহলে তো ভালই হয়।
একটু চুপচাপ।
তারপর দ্বারিক দত্ত ফের বলতে লাগলেন, পাকিস্তানে গেলে রাজদিয়ার বাড়িতে গিয়ে যে আমাদের থাকতে বলেছেন তাতে মন ভরে গেছে। একটা অনুরোধ করছি।
উৎসুক চোখে দ্বারিক দত্তর মুখের দিকে তাকান শওকত, কী অনুরোধ?
ইন্ডিয়ায় এলে আপনিও আপনাদের খান মঞ্জিল-এ এসে থাকবেন। যে ক দিন ইচ্ছে, থেকে যাবেন। কোনওরকম সংকোচ করবেন না।
বিনয় অবাক হয়ে শুনছিল। এই দ্বারিক দত্তই কিছুদিন আগে মুসলমানের প্রপার্টির সঙ্গে রাজদিয়ার বাড়িঘর এক্সচেঞ্জ করতে চাননি। অন্ধ সংস্কার তার রক্তে ডালপালা ছড়িয়ে রেখেছে কতকাল ধরে। তিনিই কিনা শওকতকে তাদের কাছে এসে থাকার আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।
শওকত বললেন, অনেক ধন্যবাদ চাচাজি। নতুন দেশে যাচ্ছি। সব গোছগাছ করে বসতে কতদিন লাগবে, কে জানে। ইন্ডিয়ায় কবে আসতে পারব তার ঠিক নেই। একটু চুপ করে থাকার পর হেসে ফের বললেন, তবে মরার আগে একবার আসবই। মানুষ যেখানে জন্মায়, যেখানে তার জীবনের বেশির ভাগটাই কেটে গেছে, সেই জায়গার ওপর নাড়ির টান থাকে, তাই না?
দ্বারিক দত্ত তো বটেই, ঘরের সবাই আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে।
শওকত আলি খান কী ভেবে একেবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যান, নতুন দেশে যাচ্ছি। সমস্ত কিছুই অজানা। আমার চেনা যারা কলকাতা থেকে পাকিস্তানে চলে গেছে তাদের বেশির ভাগই উঠেছে ঢাকায়, কেউ কেউ নারায়ণগঞ্জে। শুনেছি রাজদিয়া থেকে সে-সব টাউনে যেতে লঞ্চে পাঁচ সাত ঘণ্টা সময় লাগে। ওদের সঙ্গে চট করে দেখা করার উপায় নেই। এদিকে রাজদিয়ার কারওকে চিনি না। সেখানকার মানুষজন কীরকম হবে, আমাদের তারা পছন্দ করবে কি না, কে জানে। হয়তো নানা ঝাটে পড়তে হবে।
শওকত আলি খানকে বেশ ভাল লাগছিল বিনয়ের। মানুষটি ভদ্র। আবেগপ্রবণ। তিনি বুঝতে পারছিলেন, পিতৃভূমির সঙ্গে চিরকালের মতো সম্পর্ক চুকিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে তার যে কষ্ট হচ্ছে ঠিক তেমনটাই হচ্ছে দ্বারিক দত্তদেরও। এখনকার উত্তেজনা, অশান্তি কেটে সুদিন এলে পাকিস্তানে গিয়ে তাদের কাছে হিরণদের থেকে আসার জন্য বলেছেন শওকত আলি। সেটা শুধু মুখের কথা নয়। যথেষ্ট আন্তরিকও। কিন্তু তার শেষ কথাগুলো শুনে চমকে উঠেছে বিনয়।
আবহমান কালের ভারতবর্ষকে ছিন্ন করে মুসলমানেরা আলাদা একটা ভূখণ্ড চেয়েছিল। সম্পূর্ণ নিজস্ব এক দেশ। নতুন মুসলিম জাহান। সেজন্য কত যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন। কত দাঙ্গা। কত হত্যা। কলকাতা-নোয়াখালি-বিহার-পাঞ্জাব, সমস্ত ভারত জুড়ে কত যে রক্তের স্রোত বয়ে গেছে! শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান কায়েম হল। আর সেখানেই ছেলেমেয়ে স্ত্রী, সবাইকে নিয়ে সপরিবারে চলে যাচ্ছেন শওকত। সদ্যোজাত মুসলিম দেশটিতে যাবেন, সেজন্য তার উল্লসিত হবার কথা। খুশিতে আত্মহারা। কিন্তু অপরিচিত পরিবেশে স্থানীয় লোকজন দুহাত বাড়িয়ে তাঁদের বুকে টেনে নেবে কি না, সে সম্বন্ধে শওকতের যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
বিনয় কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই শওকত জিজ্ঞেস করেন, আপনারা রাজদিয়ায় জেনারেশনের পর জেনারেশন কাটিয়ে এসেছেন। ওখানকার মানুষগুলো কেমন? এখন থেকে তাদের সঙ্গেই তো আমাদের থাকতে হবে। বুঝতেই তো পারছেন, পড়োশি মনের মতো না হলে সুখশান্তি সব খতম। সারাক্ষণ ঝামেলা, অশান্তি নিয়ে থাকতে কি ভাল লাগে?
বিনয় ইতস্তত করতে থাকে। রাজদিয়া একসময় ছিল শান্ত। নির্ঞ্ঝাট। খাল-বিল-নদী আর অবারিত ধানের খেত দিয়ে ঘেরা প্রকৃতির সেই চোখজুড়ানো ভূমণ্ডলে কোথাও কোনও উত্তেজনা ছিল না। জীবন ধীর চালে বয়ে যেত। তিরতিরে, স্রোতের মতো। বাসিন্দারা ছিল সাদাসিধে। অকপট। তাদের চোখেমুখে সারল্য মাখানো থাকত। কিন্তু গেল কবছরে সব আমূল বদলে গেছে। এখন সর্বক্ষণ ভয়। আতঙ্ক। পারস্পরিক অবিশ্বাস। এসব বলতে গিয়ে থেমে গেল বিনয়।
