নীরবে কাগজটা টেবলে রেখে, কলম ধরে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন শওকত। তার হাত ভীষণ কাঁপছিল, বার বার ঢোক গিলছিলেন। কণ্ঠমণিটা ক্রমাগত ওঠা-নামা করছে। দুচোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝরতে লাগল তার।
সমস্ত ঘরটা লহমায় নিঝুম হয়ে গেল। তীব্র একটা কষ্ট ভেতরে ভেতরে শওকত আলি খানকে যে ভেঙেচুরে ফেলছে তা বুঝতে পারছিল বিনয়রা। এই যাতনার কারণটাও খুব স্পষ্ট।
অনেকটা সময় কেটে গেল।
উকিল বা ডাক্তারদের পেশাটাই এমন যে সহজে তারা অস্থির হয়ে পড়েন না। তবে নৃসিংহ রাহা সামান্য বিচলিত হয়েছিলেন। ঘরের নৈঃশব্দ্য ভেঙে একসময় নরম গলায় বললেন, সইটা করে ফেলুন শওকত সাহেব ।
শওকত আলি খান যেন শুনতেই পাচ্ছেন না। এই জগতেই বুঝি বা তিনি নেই। বহু দূরে, অন্য কোনও গ্রহে চলে গেছেন।
শওকতের পিঠে একখানা হাত রেখে নৃসিংহ বলতে লাগলেন, পাকিস্তানে চলে যাওয়াই যখন মনস্থ করে ফেলেছেন তখন শেষ মুহূর্তে এপারের বিষয় সম্পত্তির জন্যে মায়া করে কী লাভ? তাতে শুধু দুঃখ বাড়বে।
শওকত যেন ফের এই ঘরে ফিরে এলেন। হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে ধরা ধরা গলায় বললেন, ঠিকই বলেছেন রাহা সাহেব। পিছুটান রেখে লাভ নেই। বলে দানপত্রের নিচে সই করে দিলেন। তারপর বললেন, কত সাল আমরা ইন্ডিয়ায় আছি। আমার বাপজান, দাদা, পরদাদা, তাঁদের বাপ দাদা, পরদাদারা। জেনারেশনের পর জেনারেশন। এখন থেকে আমরা আর এ-দেশের কেউ না। পুরোপুরি বিদেশি হয়ে গেলাম– তাঁর স্নায়ুমণ্ডলী ভেদ করে অফুরান আক্ষেপ বেরিয়ে এল। সর্বস্ব হারানোর বেদনা।
নৃসিংহ রাহা পেশাদার কাজের লোক। মক্কেলের দুঃখে বেশিক্ষণ কাতর হয়ে থাকলে তার চলে না। এবার তিনি যান্ত্রিক নিয়মে সাক্ষীদের দিয়ে সইগুলো করিয়ে নিলেন। সইয়ের সঙ্গে তাদের ঠিকানা এবং তারিখ লিখিয়ে নেওয়া হল। মোট চারজন সাক্ষী।
শওকতের দুই বন্ধু তো বটেই, সেই সঙ্গে হিরণ আর বিনয়।
নৃসিংহ বললেন, আজকাল যেভাবে এক্সচেঞ্জ চলছে তাতে স্ট্যাম্প কাগজে সই-ই যথেষ্ট। তবে যদি মনে করেন, কোর্টে গিয়ে রেজিস্ট্রি করিয়ে নিতে পারেন।
শওকত বললেন, আপনি যেটা ভাল মনে করেন তাই করবেন।
হিরণ আগাগোড়া শওকত আলি খানকে লক্ষ করছিল। কথা বলছেন ঠিকই, কিন্তু কেমন যেন স্রিয়মাণ। সারা মুখে বিষাদ মাখানো। জন্মভূমির সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক ছিঁড়ে চিরকালের জন্য চলে যাওয়া কি সোজা কথা! কতকাল ধরে লোকটার বুকের ভেতর গোপনে রক্তক্ষরণ হতে থাকবে, কে জানে।
হিরণ ডাকল, শওকত সাহেব ।
শওকত মুখ ফিরিয়ে তাকালেন।
হিরণ বলতে লাগল, আপনার কষ্টটা বুঝতে পারি। কেন না আমরাও ভুক্তভোগী। দেশ ছেড়ে আমাদেরও চলে আসতে হয়েছে। সারা জীবনে এ দুঃখ ঘুচবে না।
এ-সব আবেগের কথা একবার শুরু হলে থামতে চায় না। সুরঞ্জন লাহিড়ির চলে যাবার তাড়া ছিল। তিনি কাজের কথায় চলে এলেন। নৃসিংহ রাহার কাছে দ্বারিক দত্ত এবং শওকত আলি খান, দুজনেরই টাইপ-করা দানপত্র ছিল। তিনি নৃসিংহকে বললেন, এবার দ্বারিক দত্ত মশায়ের দানপত্রটা পড়ে শোনান।
হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। ব্যাগ থেকে টাইপ-করা পাকিস্তানের স্ট্যাম্প পেপার বার করলেন নৃসিংহ।
হিরণ হতবাক। কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থাকার পর বলল, পাকিস্তানি স্ট্যাম্প পেপার কোথায় পেলেন?
নৃসিংহর চোখ দুটো আধাআধি বুজে গেল। গোলাকার মুখে মিটি মিটি, চতুর হাসি ফুটে উঠেছে। লোকটা যে অতীব ধুরন্ধর সেটা ওই হাসিই বুঝিয়ে দেয়। বললেন, কোথায় পেলাম, কীভাবে পেলাম, সে-সব অবান্তর। রিফিউজি ছাড়াও রেগুলারলি কিছু লোক এপার থেকে বর্ডারের ওপারে যাচ্ছে। ওপার থেকে এপারে আসছে। তাদের কারও সঙ্গে দুচারটে পাকিস্তানি স্ট্যাম্প পেপার চলে আসা কি অসম্ভব ব্যাপার? না কী বলেন লাহিড়ি সাহেব? সুরঞ্জন লাহিড়ির দিকে একবার চকিত দৃষ্টিক্ষেপ করে, মুখ ফিরিয়ে টাইপ-কৰা লেখা পড়তে শুরু করলেন।
দ্বারিক দত্তর দানপত্রের বয়ান অবিকল শওকত আলি খানের বয়ানের মতোই। শুধু নামধামগুলো আলাদা। এখানে দ্বারিক দত্তর বাবা ও ঠাকুরদার নাম এবং রাজদিয়ায় তাদের বসত-বাড়ি এবং চাষের জমির অনুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে। পড়া শেষ হলে সেটা দ্বারিক দত্তর দিকে এগিয়ে দিয়ে সই করতে বললেন নৃসিংহ রাহা।
শওকতের মতো ততটা ভেঙে পড়েননি দ্বারিক দত্ত। দানপত্রে সই করে বিমর্ষ সুরে বললেন, দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও চিরকালের মতো চুকেবুকে গেল। শওকতের দিকে ফিরে বললেন, আমাদের রাজদিয়ার বাড়ির তালাগুলোর দুগোছা করে চাবি আছে। এক গোছা হিরণ আপনাকে আগেই দিয়েছিল। অন্যটা আজই দিয়ে দেব। স্ত্রী ছেলেমেয়েদের নিয়ে আপনারা গিয়ে সেখানে সুখে শান্তিতে থাকুন। বলতে বলতে তার বুকের অতল স্তর ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
ঘরের আবহাওয়া আগেই ভারী হয়ে উঠেছিল। চারপাশে বিষাদ আরও ঘন হতে লাগল।
হাতজোড় করে শওকত আলি খান বললেন, আপনি, আপনার বাপদাদা, পরদাদা, ছেলে নাতি– কতকাল ধরে সবাই রাজদিয়ায় বাস করে এসেছেন। আমরা গিয়ে থাকব ঠিকই। কিন্তু ও-বাড়ি আপনাদেরই। পাকিস্তানে গেলে ওখানেই উঠবেন। আপনাদের জন্যে সবসময় একখানা ঘর তালাবন্ধ থাকবে। যখন যা, ওটা খুলে দেওয়া হবে।
ধন্যবাদ জানিয়ে দ্বারিক দত্ত বললেন, আমার যা বয়েস তাতে কি আর কোনওদিন পাকিস্তানে যেতে পারব! তাছাড়া ওখানকার যা হাল! সেই বাকিটা আর শেষ করলেন না।
