ওঁদের উকিলটি হলেন নৃসিংহ রাহা। গোলাকার মাংসল চেহারা। গোল মুখ। গোল গোল চোখে গোল বাই-ফোকাল চশমা। পরনে ঢলঢলে সাদা প্যান্ট আর সাদা শার্টের ওপর কালো কোট।
শওকতরা আসার মিনিট পনেরো পর আনন্দ আর সুনীতি এল। ওরা এসেছে ট্যাক্সি করে। আনন্দ ওপরে উঠে বাইরের ঘরে বসল। সুনীতি সোজা চলে গেল ভেতর দিকে। সুধাদের কাছে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এসে হাজির হলেন হিরণের লইয়ার সুরঞ্জন লাহিড়ি। বয়স ষাটের ধারে কাছে। অটুট স্বাস্থ্য তাঁর। এই বয়সেও দুচারটের বেশি চুল পাকেনি। দাঁতগুলো সবই আসল এবং সাদা ধবধবে। চওড়া কপাল। মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে শান্ত চোখ দুটিতে গভীর দৃষ্টি। যার দিকে তাকান, মনে হয় তার বুকের তল পর্যন্ত দেখতে পান। সমস্ত চেহারায় অদ্ভুত এক বুদ্ধির ঝলক। পরনে উকিলদের পোশাক। সাদা শার্ট এবং কালো কোট।
আনন্দ এবং সুরঞ্জনের সঙ্গে শওকতদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। অবশ্য সুরঞ্জন এবং নৃসিংহ রাহা পরস্পরকে চেনেন। পেশা এক। কাজের সূত্রে কোর্টে রোজই তাদের দেখা হয়। চেনাই তো স্বাভাবিক।
দ্বারিক দত্ত বয়সে সবার বড়। নিজেই আজকের অনুষ্ঠানের পরিচালকের দায়িত্ব তুলে নিলেন। কাজ শুরু করার আগে একটু চা খাওয়া যাক।
নৃসিংহ রাহা বললেন, শুধু চা কিন্তু
দ্বারিক দত্ত বললেন, আপাতত। কাজ হয়ে যাবার পর মিষ্টিমুখ না করিয়ে কিন্তু ছাড়ছি না।
সবাই হাসিমুখে চুপচাপ বসে থাকেন। যে কারণে আজ এখানে তারা জড়ো হয়েছেন সেটা সুচারুভাবে সমাধা হয়ে গেলে মিষ্টিমুখে কারও আপত্তি নেই।
হিরণকে বলতে হল না, ব্যস্তভাবে ভেতরে চলে গেল। দশ মিনিটের ভেতর সে আর উমা দুটো বড় ট্রেতে কয়েক কাপ চা আর প্লেট বোঝাই করে বিস্কুট এনে সেন্টার টেবলে রাখল।
চা খেতে খেতে দ্বারিক দত্ত শওকতকে বলেন, আপনাদের বাড়ি সেদিন দেখে এলাম। হিরণ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল।
শওকত জিজ্ঞেস করেন, কেমন লাগল আমাদের বাড়ি?
ভাল। বেশ মজবুত মনে হল।
আমার আব্বাজান প্রায় সত্তর বছর আগে খুব যত্ন করে সেরা মেটিরিয়াল দিয়ে বাড়িটা তৈরি করিয়েছিলেন। চারতলার ভিত। একটু সারিয়ে টারিয়ে নিলে আরও পঞ্চাশ ষাট বছর নিশ্চিন্তে থাকা যাবে।
হিরণ এইসময় বলে ওঠে, আপনাদের বাড়ি তো আমরা দেখেছি। কিন্তু আমাদের রাজদিয়ার বাড়ি, জমিজমা সম্বন্ধে খোঁজ নেবেন বলেছিলেন। নিতে পেরেছিলেন কি?
হিরণের সঙ্গে শওকতের আগেই কথা হয়েছিল, টালিগঞ্জে তাঁদের তেতলা বাড়ির বিনিময়ে পাকিস্তানে তারা হিরণদের বিষয় সম্পত্তি কী পাবেন, সে ব্যাপারে যেন ভাল করে খবর নেন। দেশের যা অবস্থা, হিরণদের পক্ষে রাজদিয়ায় গিয়ে সে-সব দেখানো সম্ভব নয়। পরে যেন শওকতের মনে না হয়, তারা তাকে ঠকিয়েছে। শওকত জানিয়েছিলেন, এক আত্মীয় বেশ কিছুদিন আগে বাড়ি এক্সচেঞ্জ করে কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জে চলে গেছে। নাম জাহাঙ্গির চৌধুরি। শওকত তাকে খবর পাঠিয়েছিলেন, সে যেন রাজদিয়ায় গিয়ে হিরণদের বাড়িটাড়ি নিজের চোখে দেখে আসে।
শওকত বললেন, হ্যাঁ। জাহাঙ্গির লোক মারফত আমাকে জানিয়েছে, আপনাদের বাড়িও খুব ভাল। চাষের জমিগুলোতে তিনবার ফসল হয়। এই ধরনের প্রপার্টিই আমি চাইছিলাম।
দ্বারিক দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, আপনি খুশি তো?
হ্যাঁ, খুশি।
চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল।
উকিল সুরঞ্জন লাহিড়ি বললেন, বারোটা নাগাদ আমাকে অন্য এক জায়গায় পৌঁছতে হবে। এবার কাজটা সেরে ফেলা যাক।
সবাই তার কথায় সায় দিলেন।
ভারত এবং পাকিস্তান, এই দুই দেশে সম্পত্তি বিনিময়ের প্রক্রিয়াটা খুব একটা জটিল নয়। দ্বারিক দত্তর নামে রয়েছে রাজদিয়ার জমি-বাড়ি-বাগান-পুকুর ইত্যাদি। তিনি স্ট্যাম্প কাগজে সেগুলো দানপত্র করে দেবেন শওকত আলি খানকে। সাক্ষী থাকবে তার এবং শওকতের তরফে দুজন করে চারজন। একই পদ্ধতিতে শওকতও তার বাড়ি দ্বারিক দত্তকে লিখে দেবেন।
শওকতের দানপত্রের বয়ানটা আগেই তৈরি করেছিলেন তার উকিল নৃসিংহ রাহা। সেটা দ্বারিক দত্তদের উকিল সুরঞ্জন লহিড়ি খুঁটিয়ে দেখার পর সামান্য অদল বদল করে দুকপি টাইপ করা হয়েছে। একটা কপি আগেই সুরঞ্জনের কাছে পাঠানো হয়েছিল। অ্যাটাচি কেস থেকে সেট বার করে তিনি পড়তে লাগলেন।
আমি শওকত আলি খান, পিতা মরহুম রহমত আলি খান, পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত কলিকাতাস্থ টালিগঞ্জের ১৮/২ আমিনুল হক স্ট্রিটে অবস্থিত ত্রিতল বসত গৃহ খান মঞ্জিল, মোট জমির পরিমাণ ছয় কাঠা সাড়ে তিন ছটাক, নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে, সজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্ণে, বর্তমানে কলিকাতাস্থ টালিগঞ্জের ১৩-এ জাফর শা রোডের বাসিন্দা, শ্রীদ্বারিক দত্তকে, পিতা রাজারাম দত্ত, আদি নিবাস পূর্ববঙ্গের (বর্তমানে পাকিস্তান) ঢাকা জিলার রাজদিয়া শহর, বিনামূল্যে দানপত্র করিয়া দিলাম। উক্ত খান মঞ্জিল-এর উপর এই দানপত্রে স্বাক্ষর করার মুহূর্ত হইতে আমার বা আমার পুত্রকন্যা বা আমার পরিবারের কাহারও কোনও অধিকার রহিল না। শ্রীদ্বারিক দত্ত মহাশয় এবং তাহার উত্তরাধিকারীরা অদ্য হইতে পুরুষানুক্রমে উহা ভোগদখল করিবেন।
পড়া হয়ে গেলে টাইপ-করা কাগজটা এবং একটা কলম শওকত আলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সুরঞ্জন লাহিড়ি বললেন, নিচে সই করে দিন। তারপর সাক্ষীরা সই করবেন।
