পরিচিত মানুষজনের কাছে না যাক, সারাক্ষণ বাড়িতে বসে না থেকে একা একা রাস্তায় কি লেকে খানিকটা ঘুরে আসা যেত না? যেত। কিন্তু বিনয়ের মন সায় দেয়নি। তার কারণ ঝিনুক।
সেদিন খান মঞ্জিল দেখে মধুসূদন ভট্টাচার্যের বাড়ি গিয়েছিল বিনয়রা। মধুসূদনের মেয়ে দীপালির কথা শুনতে শুনতে আতঙ্কে সিটিয়ে গেছে সে। আর বার বার ঝিনুকের মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। প্রায় একই কাহিনি। করুণ। নিদারুণ কষ্টদায়ক।
ঝিনুককে আর কোনওদিনই পাওয়া যাবে না। তার কথা নতুন করে ভেবে ভেবে এই দুটো দিন আচ্ছন্নের মতো কাটিয়ে দিয়েছে বিনয়।
.
আজ সকাল থেকে জাফর শা রোডের ছোট দোতলা বাড়িটা জুড়ে তুমুল ব্যস্ততা শুরু হয়েছে।
নটা নাগাদ শওকত আলি তার দুই বন্ধু এবং লইয়ারকে সঙ্গে নিয়ে আসবেন। হিরণ কাল আনন্দদের বাড়ি গিয়ে তাকে আর সুনীতিকে বিশেষ করে বলে এসেছে। ওরা দুজনে তো আসবেই। হিরণ আগেই একজন উকিল ঠিক করে রেখেছিল। তিনিও ওই সময়েই চলে আসবেন। আজই হিরণদের রাজদিয়ার জমিজমা এবং বাড়ির সঙ্গে শওকত আলিদের খান মঞ্জিল এক্সচেঞ্জের পাকা ব্যবস্থা করা হবে। প্রায় মাস দুয়েক ধরে ব্যাপারটা কথাবার্তার স্তরে ছিল। সুধা আর সরস্বতী যেভাবে বেঁকে বসেছিলেন তাতে কী হতো, বলা মুশকিল। এবার সব অনিশ্চয়তার অবসান। হিরণরা খান মঞ্জিল-এর পুরোপুরি মালিকানা পেয়ে যাবে।
শওকত আলির সঙ্গে তার যে দুই বন্ধুর আসার কথা তারা এক্সচেঞ্জের সাক্ষী হবেন। উকিলরা বিনিময়ের যে বয়ান ঠিক করে স্ট্যাম্প কাগজে টাহপ করিয়ে নিয়েছেন তাতে ওই দুজনের সই থাকবে। আর হিরণদের তরফে সাক্ষী হবে বিনয় আর আনন্দ। আনন্দ আসবে আর সুনীতি আসবে না, তাই কখনও হয়? কলকাতায় আত্মীয় পরিজন বলতে তো একমাত্র ওরাই। এমন একটা শুভ কাজে আনন্দ সুনীতিরা না থাকলে চলে?
এতগুলো মানুষ আসবে। তাদের আপ্যায়নে যাতে বিন্দুমাত্র খুঁত না থাকে সেজন্য ভোরে ঘুম ভাঙার পর থেকেই তোড়জোড় চালাচ্ছে সুধা। হিরণের রুণ জেঠিমা তার দুর্বল, অথর্ব শরীর টেনে টেনে সুধাদের সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন। না বললে শুনছেন না। কারও নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই এখন।
কালই বেশ খানিকটা কাজ এগিয়ে রেখেছে সুধারা। বাড়িটা ধুয়েমুছে তকতকে করে তোলা হয়েছে। বাইরের ঘরের সোফার গদির ওয়াড় আর পদাগুলো পালটে ফেলেছে তারা। মেঝেতে পেতে দিয়েছে রঙিন জুটের কার্পেট।
হিরণ অফিস থেকে তিনদিনের ছুটি নিয়েছিল। আজ আর সময় পাওয়া যাবে না। তাই কালই বাজার করে রেখেছে। বাড়ির লোকজন তো বটেই, তবে বিশেষ করে অতিথিদের, অর্থাৎ শওকত আলি, তার দুই বন্ধু এবং দুপক্ষের উকিলদের জন্য হবে লুচি, বেগুনভাজা, আলুভাজা, আলুকপির তরকারি, ছোলার ডাল। তাছাড়া দ্বারিক ঘোষের দোকান থেকে প্রচুর মিষ্টি আর চিনিপাতা দইও এনে রাখা হয়েছে।
সম্পত্তি বিনিময়ের কাজ সারতে বড় জোর ঘণ্টাখানেক কি ঘণ্টাদেড়েক। তারপর শওকতরা লুচি মিষ্টি খেয়ে চলে যাবেন। কিন্তু আনন্দ আর সুনীতিদের ছাড়া হবে না। সারাদিন এখানে কাটিয়ে সন্ধের পর তারা বাড়ি ফিরবে। তাদের জন্য রান্নার আয়োজনও কম হয়নি। তিন রকমের মাছ হবে। পাঁঠার মাংসের কোর্মা হবে। তাছাড়া নিরামিষ পদ আর দুইমিষ্টি তো আছেই।
নটা বাজতে না বাজতেই সবাই আসতে শুরু করল। প্রথমে সবান্ধবে উকিলসমেত এলেন শওকত আলি। ওঁরা এসেছেন ঘোড়ার গাড়িতে। হিরণরা প্রস্তুত হয়েই ছিল। বিনয়কে সঙ্গে করে সে খুব খাতির করে দোতলার বসবার ঘরে শওকতদের নিয়ে এল। দ্বারিক দত্ত সেখানেই ছিলেন। বুড়ো মানুষ। তার পক্ষে সিঁড়ি ভেঙে ওঠা-নামা করা কষ্টকর।
শওকতদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন দ্বারিক দত্ত। হাতজোড় করে বললেন, বসুন, বসুন। আমার বয়েস সত্তর। শরীরও কাহিল হয়ে পড়েছে। তাই আপনাদের নিচে গিয়ে নিয়ে আসতে পারিনি।
আদাব জানিয়ে শওকত আলি বিব্রতভাবে বললেন, নানা, আপনি গেলে আমাদের খুব খারাপ লাগত। আদি বাড়ি বিহারে হলেও তিন পুরুষ কলকাতায় আছেন। পরিষ্কার বাংলা বলেন। বিন্দুমাত্র জড়তা নেই।
দ্বারিক দত্ত আগে শওকত আলিকে দেখেননি। তবে আন্দাজ করে নিয়েছিলেন। সকলে বসার পর হিরণ তাঁর সঙ্গে শওকতের পরিচয় করিয়ে দিলেন।
শওকত আলির বয়স চুয়ান্ন পঞ্চান্ন। দাড়িগোঁফ কামানো, লম্বাটে মুখ। মাথায় কাঁচাপাকা চুল ছোট করে ছাঁটা। চোখের তলায় কালির ছোপ। পরনে ঢোলা ফুল প্যান্ট আর লম্বা ঝুলের শার্টের ওপর মোটা উলের পুল-ওভার। পায়ে ফিতে-বাঁধা কাবলি চপ্পল। সমস্ত চেহারায় কেমন যেন বিষাদ মাখানো।
শওকত তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে দ্বারিক দত্তদের আলাপ করিয়ে দিলেন। তার বন্ধুদের একজন বেশ সুপুরুষ। টকটকে রং। মেদহীন শরীর। গালে অল্প অল্প দাড়ি। পরনে পাজামা এবং চিকনের কাজ করা ধবধবে পাঞ্জাবির ওপর শাল। শওকতেরই সমবয়সী হবেন। কলুটোলায় ওঁর আতর-সুর্মার কারবার। নাম সালমান সিদ্দিকি। ওঁরা উত্তরপ্রদেশের মুসলমান। তবে শওকতদের মত এই শহরের কয়েক পুরুষের বাসিন্দা।
শওকত আলির দ্বিতীয় বন্ধুটিও অবাঙালি। ওরা হায়দরাবাদের লোক। নাম শেখ মুনাব্বর। বেজায় ঢ্যাঙা এবং বোগা। চোখ কোটরে ঢোকানো। ভাঙা গালে ঘন দাড়ি। পরনে ঢোলা শেরওয়ানি কুর্তার ওপর লম্বা কোট। টেরিটি বাজারে তার বিরাট ফলের ব্যবসা।
