বিনয়রা এতক্ষণে বুঝতে পারল, এই বয়সে গুপীবল্লভের এত ঘোরাঘুরির কারণটা কী। পেটের জন্য মানুষ কত কী-ই না করছে!
শুপীবল্লভ বলে যাচ্ছিল, আপনেরা দ্যাশের মানুষ। আপনজন। আপনেগো কাছে লুকাছাপা নাই। টাণ্ঠা মাণ্ঠা কইরা বাইচা তো থাকতে হইব। হুদা (শুধু কবিরাজি লইয়া থাকলে না খাইয়া মরতাম। অ্যাতিষ আর ঘটকালি কইরা ভালাই আছি।
দ্বারিক দত্ত গুপীবল্লভকে দেখার পর থেকেই তার পোশাক আশাক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করছিলেন। নানা ব্যাপারে কথা বলতে বলতে প্রসঙ্গটা তোলার সুযোগ হয়নি। এবার জিজ্ঞেস করলেন, যতদূর মনে পড়ে, দেশে থাকতে সাদা ধুতি সাদা জামা পরতিস। এখানে এসে গেরুয়া ধরেছিস কেন?
গুপীবল্লভ বলল, ভ্যাক না ধরলে কি ভিখ মিলে দত্তমশয়? গেরুয়া দ্যাখলে মাইনুষে ভাবে সাধু-সন্ন্যাসী। তাগো মনে ভক্তিভাব জাগে। আমার উপর বিশ্বাস বাইড়া যায়। দ্যাশভাগের পর আগের দিন কি আর আছে? ফন্দিবাজি কইরা না চললে টিকা থাকন মুশকিল।
দ্বারিক দত্ত একটু হাসলেন।
গুপীবল্লভ জানালার বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। মেলা বেইল (অনেক বেলা) হইছে। আপনেরা ছান (স্নান) খাওয়া করেন। আইজ চলি–
দ্বারিক দত্ত ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন, না-না, এই দুপুর বেলা না খেয়ে যাবি কী! এটা একটা কথা হল?
হাতজোড় করে গুপীবল্লভ বলল, আইজ হাতে সোময় নাই। বাগবাজারে একজনের লগে সাড়ে বারোটার ভিতরে দেখা করতে হইব। হের কাছে কিছু টাকা পামু। দেরি করলে দেখা পামু না।
তাহলে আর আটকাব না। মাঝে মাঝে আসিস কিন্তু।
আইতে তো হইবই। বিনয়ের দিকে আঙুল বাড়িয়ে গুপীবল্লভ বলল, উই ছুটোবাবুর লেইগা কতবার আইতে লাগব, ক্যাঠা জানে–
বিনয় প্রথমটা হতবাক। তারপর বলে, আমার জন্যে?
হ মাথা দোলাতে দোলাতে উঠে দাঁড়ায় গুপীবল্লভ।
কী ব্যাপার বলুন তো?
পরথম দিন আইলাম। আতথা কওনটা (আচমকা বলাটা) ঠিক হইব না। পরে ধীরেসুস্থে কমু। গুপীবল্লভের চোখেমুখে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে।
দ্বারিক দত্ত এবং হিরণেরও কৌতূহল হচ্ছিল। কথাটা শোনার জন্য তারা প্রায় জোরই করতে থাকে। গুপীবল্লভ কিন্তু কিছুতেই মুখ খুলল না। তার পেল্লায় বাক্সটা তুলে নিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল।
ভীষণ অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল বিনয়। কী বলবে নোকটা? ঝিনুকের কথা কি? দেশের মানুষজন যার সঙ্গেই দেখা হোক, শুরুতেই ঝিনুক সম্পর্কে জানতে চায়। কেউ সহানুভূতি জানায়, আহা উঁহু করে, কেউ আভাসে বুঝিয়ে দেয় অমন একটা মেয়ে নিজের থেকে চলে গিয়ে বিনয়কে বাঁচিয়ে দিয়েছে। নইলে সারাটা জীবন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেত।
ঝিনুকের কথা নিশ্চয়ই গুপীবল্লভের জানতে বাকি নেই, কিন্তু তার সম্বন্ধে টু শব্দটিও করেনি সে।
হঠাৎ বিনয়ের মনে হল, ঝিনুক বা হিরণদের সম্পর্কে গুপীবল্লভের খুব একটা আগ্রহ নেই। জাফর শা রোডের এই বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে শুধু তারই জন্য এখানে হানা দিয়েছে, লোকটা। জানিয়ে গেছে, আবারও আসবে। আসবে বার বার।
যে-লোক সীমান্তের এপারে এসে রাতারাতি সাধুর ভেক ধরেছে সে যে খুবই চতুর এবং ধুরন্ধর তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। গুপীবল্লভ তাকে নিয়ে কী মতলব এঁটেছে তার তলকূল পাচ্ছে না বিনয়। তীব্র অস্বস্তি তার মাথায় কাঁটার মতো বিধতে থাকে।
.
২০.
খান মঞ্জিল দেখে আসার পর দুটো দিন কেটে গেছে। অলস। মন্থর। ঢিলেঢালা। বিনয়ের অফিসে জয়েন করতে এখনও কদিন বাকি। কাজকর্মের মধ্যে থাকলে একঘেয়ে লাগে না। কিন্তু আপাতত উপায় কী?
এর ভেতর বাড়ি থেকে বেরোয়নি বিনয়। এই বিশাল শহরে তার চেনাজানা মানুষ খুব কম। একরকম হাতে গোনা। আনন্দদের বাড়ি সে কখনও যাবে না। বিমল গাঙ্গুলিদের বাড়ি যাওয়া যেত। কিন্তু ছায়া মায়ার জন্য এখনও কোনও চাকরি বাকরির ব্যবস্থা করা যায় নি। মদন বড়াল লেনে গেলে ওরা যখন বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে তার মুখের দিকে তাকাবে কী বলবে বিনয়? না, আপাতত সেখানে যাওয়া যাবে না।
ঝুমাদের বাড়ির দরজা তার জন্য সারাক্ষণ খোলা। কিন্তু পাকিস্তান থেকে রামকেশব চলে এসেছেন। কিন্তু সেদিন তিনি ঝিনুক সম্বন্ধে যা সব বলেছেন, জঘন্য এবং কুৎসিত, তারপর আর সেখানে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। বিনয় যায়নি।
ঝুমা তাদের কলেজে গিয়ে বার বার দেখা করতে বলেছে। সেখানে অবশ্য যাওয়া যায়। কিন্তু মেয়েটার মধ্যে রয়েছে কী যে প্রচণ্ড আকর্ষণ! কাছে গেলে বিনয়ের মনে হয়, বিচিত্র সম্মোহনে ঝুমা শিরাস্নায়ু অবশ করে দিচ্ছে। মনে হয়, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে! হাতের মুঠি থেকে আলগা হয়ে যাচ্ছে বন্ধু। নিশির ডাকের মতো ঝুমা মাঝে মাঝেই তাকে টানতে থাকে। কিন্তু নিজের অজান্তে যদি তার দিকে পা বাড়াবার কথা বিনয় ভাবেও, ঝিনুকের হাজার স্মৃতি পথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়ে। তাই ঝুমার কলেজে যাওয়া হয়নি।
আশু দত্তর কাছে বা মুকুন্দপুরে গিয়েও খানিকটা সময় কাটিয়ে আসা যেত। কিন্তু এই তত ক দিন আগে আশু দত্তকে নিয়ে যুগলদের কলোনিতে ঘুরে এল। এত তাড়াতাড়ি তাদের কাছে ফের যাওয়ার মানে হয় না।
অনেকদিন থানায় গিয়ে ঝিনুকের খোঁজ নেওয়া হয়নি। বিনয় যে ভবানীপুর থেকে জাফর শা রোডে সুধাদের বাড়ি চলে এসেছে, এই ঠিকানা বদলের খবরটা ওসি দিবাকর পালিতকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মানুষটি সহানুভূতিশীল। বলেছিলেন, রোজ রোজ কষ্ট করে থানায় যাওয়ার দরকার নেই। ঝিনুকের সন্ধান পাওয়া মাত্র তিনি বিনয়ের কাছে লোক পাঠিয়ে দেবেন। কাজেই থানায় যাওয়ার কথা ভাবলেও শেষপর্যন্ত যায়নি।
