গুপীবল্লভের মুখের হাসিটা আরও ছড়িয়ে পড়ল। বলল, হ দত্তমশয়, আমি গুইপা আচায্যিই। গুপীবল্লভের ডাক নাম গুপী। পূর্ব বাংলায় বলে গুইপা।
দ্বারিক দত্ত বললেন, বোস বোস্। দেশের মানুষ দেখলে কী ভাল যে লাগে!
সবাই বসে পড়ে।
দ্বারিক আপেক্ষের সুরে এবার বলেন, দেশভাগের পর রাজদিয়া রসুনিয়া ডাকাইতা পাড়া গিরিগঞ্জ তালতলি মালখানগর, এমনি নানা গ্রামগঞ্জের মানুষ যে কত দিকে ছিটকে পড়েছে। তাদের অনেকের সঙ্গে এ-জীবনে আর দেখা হবে না। একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন, পাকিস্তান থেকে কবে এলি?
গুপীবল্লভ বলল, তা হইব মাস ছয়েক
কোথায় উঠেছিস?
আমার এক ভাইগনা গইরার (গড়িয়া) উই দিকে জবরদখল কুলোনিতে ঘর তুলছে। আমি হের কাছেই থাকি।
তারিণী কবিরাজের খবর কী? তিনি কি তালতলিতেই পড়ে আছেন?
তেনি মারা গ্যাছেন। কবিরাজখানাও উইঠা গ্যাল। আমি দ্যাশে থাইকা কী করুম? চইলা আইলাম–
তারিণী সেনের স্ত্রী? ছেলেমেয়ে?
স্যান কত্তার স্ত্রী তো আগের বচ্ছরই স্বগৃগে গ্যাছেন। আর ওনাগো (ওঁদের) পোলামাইয়া নাই।
একটু চুপচাপ।
তারপর দ্বারিক দত্ত বললেন, তা আমাদের এ-বাড়ির খোঁজ পেলি কী করে?
গুপীবল্লভ বলল, কয়দিন আগে আতখা (হঠাৎ) আপনেগো রাইজদার তৈলোক্য-ত্রৈলোক্য) স্যানের বড় পোলা পরিতোষ স্যানের লগে দেখা। তৈলোক্য স্যান, যেনি যৈবনকালে মগের মুল্লুকে (বর্মায়) চইলা গ্যাছিলেন, যুদ্ধ বাধলে দ্যাশে ফিরা আইলেন–
লোকটা একটু বেশি মাত্রাতেই বকবক করে। এক কথা বলতে গিয়ে ডালপালা ছড়িয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। বাধা দিয়ে দ্বারিক দত্ত বলে উঠলেন, পরিতোষ কী করল তাই বল–
গুপীবল্লভ একটু অপ্রস্তুত হল। হ-হ, এক কথা কইতে গিয়া আর-এক কথা আইয়া পড়ছে। তা পরিতোষ স্যান আমারে তেনাগো ঢাকুইরার (ঢাকুরিয়া) বাড়ি লইয়া গ্যালেন। পুরা দিনটা আছিলাম হেইখানে। ওনাগো কাছেই আপনেগো ঠিকানা পাইছি। গইরা থিকা টালিগঞ্জ আর কদ্দূর? আপনেগো দ্যাখনের লেইগা কয়দিন ধইরা পরানটা উথালপাতাল হইতে আচ্ছিল। আইজ সকালে উইঠা চইলা আইলাম।
বিনয় লক্ষ করছিল, গুপীবল্লভ দ্বারিক দত্তর সঙ্গে কথা বলতে বলতে বার বার উৎসুক দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। একটু অস্বস্তি বোধ করল সে। ত্রৈলোক্য সেনদের বাড়িতে যখন গেছে, ঝিনুকের খবর কি আর সে পায়নি? সে-সম্বন্ধে ফস করে কি কিছু বলে বসবে নোকটা?
উমা সবার জন্য চা আর গুপীবল্লভের জন্য আলাদা করে মিষ্টি-টিষ্টি দিয়ে গেল। সুধা পাঠিয়ে দিয়েছে। দেশের মানুষ বাড়িতে এসেছে। তাকে আপ্যায়ন করা যে দরকার, শত ব্যস্ততার মধ্যেও সেদিকে খেয়াল আছে তার।
যেতে যেতে দেশের কথা হতে লাগল। কোন স্বর্গসুখে দিন কাটিয়েছে, আর পার্টিশানের পর সীমান্তের এপারে এসে পচে মরতে হচ্ছে, এজন্য আক্ষেপের অবধি নেই গুপীবল্লভের। দ্বারিক দত্তও মাথা নেড়ে সায় দিতে লাগলেন।
গুপীবল্লভ অনেক খবর রাখে। সে জানায়, দেশভাগের পর রাজদিয়া এবং তার আশেপাশের নানা অঞ্চলের কারা কারা আসামে ত্রিপুরায় বিহারে বা উত্তর বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের অনেকের ঠিকানা পর্যন্ত জোগাড় করে ফেলেছে। বাকিদেরও খুঁজে বেড়াচ্ছে।
বিনয় অবাক হয়ে শুনছিল। অনেকটা যুগলের মতোই দেশ থেকে উৎখাত হয়ে আসা মানুষ সম্পর্কে লোটার বিপুল আগ্রহ। কী চায় গুপীবল্লভ? যুগলের মতোই কি দেশের পরিচিত মানুষজন জড়ো করে সীমান্তের এপারে পূর্ববঙ্গের সেই ভুখণ্ডটিকে নতুন করে নির্মাণ করতে?
দ্বারিক দত্তও কম অবাক হননি। এত লোকের ঠিকানা কী করে পেলি?
গুপীবল্লভ বলল, একজনের কাছে গ্যালে আরেক জনের খবর পাই। এইভাবে ঘুইরা ঘুইরা অ্যাতগুলান ঠিকানা জুটাইছি।
দ্বারিক দত্তর শুধু নয়, হিরণ এবং বিনয়ের বিস্ময়ও ক্রমাগত বাড়ছিল। হিরণ জিজ্ঞেস করল, আপনি কি দেশের মানুষের ঠিকানার জন্যে এর ওর বাড়ি ঘুরে বেড়ান?
গুপীবল্লভ হেসে হেসে বলল, ঠিকই ধরছেন ছুটো নাতিন জামাইবাবু সুধা-সুনীতির বিয়েতে তালতলি থেকে নেমন্তন্ন খেতে রাজদিয়ায় এসেছিল সে। হেমনাথের সঙ্গে হিরণদের সম্পর্কটা সে জানে।
এইসব ঠিকানা দিয়ে কী হবে?
কামে লাগক। হুদাহুদি (শুধু শুধু) কেউ এ বস্যে (বয়সে) ছুটাছুটি করে?
হিরণ আর কোনও প্রশ্ন করে না।
দ্বারিক দত্ত বললেন, দেশের মানুষের বাড়ি তো ঘোরাঘুরি করে বেড়াস। কাজকর্ম কী করিস? তারিণী সেনের চেলাগিরি করে তো জীবন কাটিয়ে দিলি। তার কাছে কিছু কিছু শিখেছিসও। এপারে এসে কি কবিরাজি করছিস?
হতাশার সুরে গুপীবল্লভ বলল, স্যানকত্তার কাছে যা শিখছিলাম হেয়া গেরামে-গুঞ্জে চলত। কইলকাতার লাখান জবর শহরে কেও স্বন্ন সিন্দুর, সালসা মালসা পোছে না। কত বড় বড় ডাক্তর : আর হাসপাতাল এইখানে! রোগ ব্যারাম হইলে মাইষে হেগো কাছে লৌড়ায়।
তাহলে?
গুপীবল্লভ জানায়, দূর সম্পর্কের যে ভাগনের কাছে সে উঠেছে তারই সংসার চলতে চায় না। দিন আনি দিন খাই অবস্থা। কাজেই নিজের পেটের চিন্তা নিজেকেই করতে হয় তাকে। কলকাতায় তার কবিরাজি অচল। তাই রোজগারের জন্য ভেবেচিন্তে অন্য ফিকির বার করেছে। তারিণী সেন ভাল জ্যোতিষ জানতেন। কবিরাজির সঙ্গে এই বিদ্যেটাও তার কাছ থেকে মোটামুটি শিখে নিয়েছিল গুপীবল্লভ। জ্যোতিষের মার নেই। জীবনে সমস্যা নেই, এমন কোনও মানুষের দেখা আজকাল মেলে না। বিশেষ করে দেশভাগের পর। বেশির ভাগেরই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। যারা রিফিউজি ক্যাম্পে কি শিয়ালদা স্টেশনে পড়ে আছে তারা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। কিন্তু ওপার থেকে যারা কিছু টাকা পয়সা আনতে পেরেছে, এখানে মাথা গোঁজার মতো জায়গাও হয়তো জুটিয়ে নিয়েছে, তাদেরও দুর্ভাবনার শেষ নেই। ছেলের পড়াশোনা বা চাকরি, মেয়ের বিয়ে ইত্যাদি নানা সমস্যায় তারা জর্জরিত। হাতের টাকা ফুরিয়ে গেলে কী খাবে, কী করবে, রোজগারের কোনও উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে কি না– এ-সব জানার জন্য সবাই ব্যাকুল। সুতরাং গুপীবল্লভের দুপয়সা আয় হচ্ছে। জ্যোতিষের সঙ্গে সে আরও একটা কাজ করে। ঘটকালি। অবশ্য খাটতে হয় প্রচুর। লোকের বাড়ি বাড়ি যাওয়া তো আছেই। দূরে যারা থাকে, নিয়মিত চিঠিপত্রে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়।
