হঠাৎ তারপাশার স্টিমারঘাটে সেই ভাঙাচোরা, করুণ চেহারার আধবুড়ো লোকটার মুখ চোখে সামনে ভেসে ওঠে। নয়া চিকন্দি গ্রামের হরিদাস সাহা। তার যুবতী মেয়েকে জোর করে তুলে নিন যাওয়া হয়েছে। হরিদাসের স্ত্রী ঘোমটায় মুখ ঢেকে একটানা কেঁদে যাচ্ছিল। শুধু কি সে-ই, যুগলদে মুকুন্দপুর কলোনিতে গিয়েও বেশ কটি মেয়েমানুষের এমন কান্না শুনে এসেছে বিনয়। সেই সব নিরবচ্ছিন্ন বিলাপ। সে যে কী বুক-নিঙড়ানো কাতরতা! ওদের মেয়েদেরও কেড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে
মধুসূদন, হরিদাস সাহা আর মুকুন্দপুরের সেই শোকাকুল মায়েদের মতো দেশভাগের পর আর কত যে মা-বাপের যুবতী মেয়ে খোয়া গেছে তার লেখাজোখা নেই। এদের সবার অফুরান কান্না সঙ্গে ঝিনুকের জন্য বিনয়ের অন্তহীন কষ্টটা একাকার হয়ে যেতে লাগল।
হিরণ বিনয়কে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছিল। আস্তে ডাকল, বিনু
বিনয় চমকে ওঠে, কিছু বলবেন?
কী ভাবছিলে? ঝিনুকের কথা? হিরণ আর সুধা এই কয়েক দিনের মধ্যেই বিনয়কে অনেকখা বুঝে ফেলেছে। ওরা জানে, পূর্ব পাকিস্তানের কোনও ধর্ষিত, লাঞ্ছিত কিংবা জোর করে ছিনি নিয়ে যাওয়া মেয়ের কথা শুনলেই সে ভীষণ ভেঙে পড়ে। ঝিনুকের চিন্তাটাই তখন পাষাণভারে মতো তার ওপর নতুন করে চেপে বসে।
বিনয় মুখে কিছু বলল না। আস্তে মাথা নাড়ল শুধু।
হিরণ বলতে লাগল, ঝিনুককে তবু ঢাকা থেকে উদ্ধার করে আনা গিয়েছিল। কিন্তু মধুসূদ ভট্টাচার্যের মেয়েকে আর কোনওদিনই পাওয়া যাবে না। বলেই হঠাৎ সচকিত হয়ে ওঠে, ঝিনুককে অবশ্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। সেও ফিরে আসবে কি না, কে জানে।
বিনয় উত্তর দিল না। তার দুচোখ বাষ্পে ভরে যেতে থাকে।
.
১৯.
বাড়ির সামনে সাইকেল রিকশা থেকে সবাই নেমে পড়ল। ভাড়া মিটিয়ে হিরণ সদরে কড়া নাড়তে উমা এসে দরজা খুলে দিল। বলল, একজন অনেকক্ষণ বসে আছে। আপনাদের সঙ্গে দেখা করে যাবে না।
হিরণ জিজ্ঞেস করল, কে লোকটা?
চিনি না। আগে কখনও দেখিনি।
হিরণ বিরক্ত হল, আমরা যখন থাকব না, অচেনা কারওকে বাড়িতে ঢোকাতে বারণ করেনি না?
উমা ভয় পেয়ে গেল। বলল, আপনাদের দেশের মানুষ। সেই সঙ্গে আরও খানিকটা জুড়ে দিল। লোকটি বেশ বয়স্ক। সাধু সাধু চেহারা। কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে, খুবই সরল। সাদাসিধে। কোনওরকম দুরভিসন্ধি তার মধ্যে নেই। তবু বার বার আপত্তি করেছে উমা, তাকে পরে আসতে বলেছে। কিন্তু লোকটা নাছোড়বান্দা। এমন ধরেছিল যে শেষ পর্যন্ত বাড়িতে না নিয়ে গিয়ে পারা যায়নি।
কী নাম তার?
উমা অনেকখানি গুটিয়ে গেল, জিজ্ঞেস করিনি।
গাধা মেয়ে। দেশের লোক বলে একেবারে শোবার ঘরে নিয়ে বসাসনি তো?
না-না– সবেগে মাথা ঝাঁকায় উমা, সেটুকু বুদ্ধি আমার আছে। বাইরের ঘরে বসিয়েছি।
জেঠিমাকে লোকটার কথা জানিয়েছিস?
আপনারা যাবার পর জেঠিমার শরীর খারাপ লাগছিল। শুয়ে পড়েছেন। তাই জানাইনি।
সবাই ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। হিরণ ত্বরিত গতিতে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে দোতলায় উঠে গেল। তার পেছন পেছন বিনয়ও। সকলের শেষে দ্বারিক দত্তকে ধরে ধরে ওপরে তুলতে লাগল সুধা।
হিরণ আর বিনয় বাইরের ঘরে চলে এসেছিল। চেয়ারে যে বসে আছে তার বয়স ষাটের কাছাকাছি। বুক পর্যন্ত কাঁচাপাকা দাড়ি। কাঁধ অবধি চুল। পরনে গেরুয়া রঙে ছোপানোমোটা সুতোর ধুতি আর পাঞ্জাবির ওপর ভারী খদ্দরের চাদর। সেটার রংও গেরুয়া। পায়ে কয়েক গণ্ডা তালি মারা পুরোনো লাল কেডস। চোখে নিকেলের গোল বাই-ফোকাল চশমা, যেটার উঁটিদুটো টেড়াবাঁকা, ঢেউ-খেলানো। তার পাশে পেট-মোটা, ধুসো ক্যাম্বিসের পুরানো, ঢাউস একটা বাক্স। সেটার গায়ে পেল্লায় তালা ঝুলছে।
উমা মিথ্যে বলেনি। সত্যিই মুনি-ঋষি মার্কা চেহারা। মুখটা চেনা চেনা লাগল বিনয়ের। রাজদিয়ার লোক নয়, তবে ওখানে এর যাওয়া-আসা ছিল। মনে পড়ল, হেমনাথের কাছেও দু-একবার এসেছে।
বিনয় এবং হিরণকে দেখে উঠে দাঁড়াল লোকটা। একমুখ হেসে বলল, আমারে চিনতে নি পারেন? আমি কিলাম আপনাগো দেইখাই চিনা ফালাইছি। আপনে হ্যামকার নাতি, আর আপনে হইলেন দ্বারিক দত্ত মশয়ের নাতি। কী, ঠিক কইছি তো?
এইসময় দ্বারিক দত্ত বাইরের ঘরে ঢুকলেন। সুধা একবার উঁকি দিয়ে ভেতর দিকে চলে গেল। দল বেঁধে সকালবেলায় খান মঞ্জিল দেখতে বেরিয়েছিল। রান্নাবান্না কিছুই হয়নি। উমাকে নিয়ে কোমর বেঁধে এখনই কাজে লাগতে হবে।
বিনয় আর হিরণ লোকটার কথার কী জবাব দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই দ্বারিক দত্ত থমকে দাঁড়িয়ে কয়েক পলক লোকটির দিকে তাকিয়ে থেকে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, তালতলির গুপীবল্লভ আচায্যি না?
তালতলি রাজদিয়ার থেকে মাইল দশেক দূরের মাঝারি একটা গঞ্জ। গুপীবল্লভ ছিল সেখানকার নামকরা কবিরাজ তারিণী সেন ভিষকরত্নের শাগরেদ। তারিণী কবিরাজের যথেষ্ট বয়স হয়েছিল। আশির কাছাকাছি। রোগভোগ নিয়ে যারা তার কবিরাজখানায় আসত, তাদেরই শুধু চিকিৎসা করতেন। বাইরের রোগী দেখতে যেতে পারতেন না। সেই কাজটা করত গুপীবল্লভ। বহু বছর তারিণীর সঙ্গে লেগে থেকে কবিরাজিটা মোটামুটি শিখে নিয়েছিল সে। বাইরের রোগী দেখা ছাড়াও সুজনগঞ্জ, ইনামগঞ্জ, দেলভোগ–এমনি সব হাটে হাটে ঘুরে তারিণী সেনের বিখ্যাত মকরধ্বজ, স্বর্ণসিন্দুর, মৃতসঞ্জীবনী ইত্যাদি নানা ওষুধ এবং সালসা টালসা বিক্রি করত। মাঝে মাঝে রাজদিয়ায় এলে হেমনাথের সঙ্গে দেখা করে যেত। তবে বিনয়ের সঙ্গে তখন সেভাবে আলাপ হয়নি।
