উন্মাদের মতো মধুসূদন ছুটেছিলেন এস ডি ওর কাছে। এই বিপদের দিনে শাহাবুদ্দিন সাহেব তার সঙ্গেই ছিলেন।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর নিকারি পাড়ায় স্ত্রী এবং মন্টুকে পাওয়া গিয়েছিল। গরিব নিকারিরা তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু দীপালির হদিস নেই। সারা শহরে তল্লাশি চালিয়েও তার সন্ধান মেলেনি।
শেষ পর্যন্ত মন্টু আর স্ত্রীর হাত ধরে সীমান্তের এপারে চলে এসেছেন মধুসূদন। কিছুদিন শিয়ালদা স্টেশন, কিছুদিন রিফিউজি ক্যাম্প ঘুরে, ইস্ট পাকিস্তানে তাদের সেই পোড়া বাড়িটার সঙ্গে টালিগঞ্জের এই বাড়িটা এক্সচেঞ্জ করেছেন। শাহাবুদ্দিন সাহেব কথা রেখেছিলেন, দেশের সেই বাড়িটা তিনি গ্রাস করেননি। বাড়ি বিনিময়ের কথা তাকে জানানো হয়েছিল। তিনি খুশি হয়েছেন।
মধুসূদন উদ্বাস্তু। বি এ পাস। বয়সটা বেশি হলেও একটা চাকরি জুটেছে। তাছাড়া সেই দেড় লাখ টাকা ব্যাঙ্কে রেখেছেন। পয়সাকড়ির দিক থেকে তিনি নিশ্চিন্ত।
কিন্তু তার জীবনের সব চেয়ে বড় সংকটের কারণ হলেন তার স্ত্রী। রাতের অন্ধকারে দীপালিকে চোখের সামনে জোর করে হননকারীর দল তুলে নিয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে তিনি প্রায় উন্মাদ হয়ে গেছেন। বছরখানেক হল, ইন্ডিয়ায় চলে এসেছেন তারা। দিন নেই, রাত নেই, যখন তখন, হঠাৎ হঠাৎ স্ত্রী বুক ফাটিয়ে কেঁদে ওঠেন। সহজে সেই কান্না থামতে চায় না।…
.
কথা শেষ করে অনেকক্ষণ বসে রইলেন মধুসূদন, নীরবে। বিধ্বস্ত, ভাঙাচোরা। তারপর রুদ্ধস্বরে বলতে লাগলেন, আপনারা আমাদের প্রতিবেশী হবেন। একদিন তো সবই জানতে পারবেন। আগেই তাই জানিয়ে দিলাম। একটু থেমে ফের শুরু করেন, মেয়েটাকে পাওয়া যায়নি। এ একরকম ভালই হয়েছে। পেলে কী করতাম? বিয়ে দেওয়া যেত না। কেউ আমাদের হাতের ছোঁয়া জল খেত না। ধর্ম গেছে। বংশের মান-সম্মান নাশ হয়েছে। সন্তানের মৃত্যুকামনা করতে নেই। কিন্তু দিবারাত্রি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, মেয়েটা যেন মরে যায়, মরে যায়, মরে যায়—
তার শেষ কথাগুলোর প্রতিধ্বনি হতে থাকে সমস্ত বাড়ি জুড়ে। বিনয় মধুসূদনের দিকে তাকিয়ে ছিল, একদৃষ্টে। বুকের ভেতর শ্বাস আটকে যাচ্ছে। দীপালি যেন আরেক ঝিনুক। যার সঙ্গেই দেখা হয়, কোনও না কোনওভাবে, অনিবার্য এক নিয়মে, লাঞ্ছিত অপমানিত ঝিনুক বার বার তার স্মৃতিকে তোলপাড় করে দিয়ে যায়।
কারও মুখে কথা নেই। সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। যে ভয়াবহ সর্বনাশ মধুসূদনের হয়ে গেছে, সামান্য দুচারটে সহানুভূতির কথায় তার কতটুকু ক্ষতিপূরণই বা করা যায়!
একসময় বিদায় নিয়ে দ্বারিক দত্তরা উঠে পড়লেন। তাঁদের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। চোখমুখ বেদনাকাতর।
মধুসূদন সঙ্গ ছাড়েননি গেট অবধি বিনয়দের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এলেন। ধরা ধরা, ভাঙা গলায় বললেন, খান মঞ্জিল-এ এসে তো থাকবেনই। মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসবেন।
দ্বারিক দত্ত মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
মধুসূদন এবার সুধার দিকে তাকান, মা, তুমি এসে তোমার মাসিমাকে একটু বুঝিও, যা ভাগ্যে ছিল তাই ঘটেছে। এর ওপর তো মানুষের হাত নেই।
সুধার আবেগটা বড় বেশি প্রবল। কারও দুঃখের কথা শুনলে ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়ে। তীব্র ক্লেশে তার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। ঝাপসা গলায় বলল, আমার যতদূর সাধ্য, বোঝাতে চেষ্টা করব।
সুধাকে মধুসূদন যে আলাদা করে বেছে নিয়েছেন, তার কারণ সে মেয়ে। দ্বারিক দত্তদের অর্থাৎ পুরুষদের তুলনায় একটি মেয়ের কাছে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন তার স্ত্রী। সুধার সাহায্য চাইলেও মধুসূদনের অবশ্য সংশয় রয়েছে। খানিকটা আপন মনেই বললেন, ওর যা মনের অবস্থা তাতে কতটা কাজ হবে, কে জানে।
সুধা উত্তর দিল না।
সামনের রাস্তায় তিনটে সাইকেল রিকশা দেখা গেল। কোথাও সওয়ারি নামিয়ে সেগুলো ওধারের গাছতলার স্ট্যান্ডে ফিরে যাচ্ছে। হিরণ হাত তুলে দুটো রিকশাকে থামালো। তখনকার মতোই একটায় বিনয়কে নিয়ে সে উঠে পড়ল। অন্যটায় সুধা আর দ্বারিক দত্ত।
আগে আগে অলিগলির ভেতর দিয়ে, গরিব মুসলিমদের বস্তিগুলোর গা ঘেঁষে ঘেঁষে পথ দেখিয়ে, নিয়ে চলেছে হিরণ। পেছনে সুধারা।
মধুসূদন ভট্টাচার্যের মেয়ে দীপালির কথা শোনার পর থেকে সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলী ছিঁড়ে পড়ছে বিনয়ের। যতটা দীপালির জন্য, তার বহুগুণ ঝিনুকের কারণে। সময় শোক এবং দুঃখের তীব্রতা ধীরে ধীরে জুড়িয়ে দেয়। প্রলেপ লাগিয়ে দেয় অদৃশ্য ক্ষতমুখে। ঝিনুক নিরুদ্দেশ হবার পর প্রথম দিকে যতটা উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল, অসহনীয় কষ্টে যতটা ছটফট করত, পরে সেটা মোটামুটি সামলে উঠেছিল সে। মানুষের সহ্যশক্তির বুঝি সীমাপরিসীমা নেই। কিন্তু দীপালির ঘটনাটা যখন মধুসূদ বলছিলেন, তার হৃৎপিণ্ডে একটা অদৃশ্য শেল আমূল বিধে যাচ্ছিল।
রিকশায় ওঠার পর থেকে একটি কথাও বলেনি বিনয়। আচ্ছন্নের মতো বসে আছে। দুধারে নানা দৃশ্যাবলী–পুরোনো আমলের বাড়িঘর, খাপরা কি টিনের চালের চাপ-বাঁধা মুসলমানদের বস্তি ফাঁকা মাঠ, ঝোপঝাড়, পানাপুকুর–কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। এলাকাটা যত নিরিবিলিই হোব কিছু শব্দ তো হচ্ছেই। মানুষের কথাবার্তার, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সাইকেল রিকশা কি কচি দুএকটা মোটরের। কিছুই শুনতে পাচ্ছে না বিনয়। শুধু টের পাওয়া যাচ্ছে, বুকের ভেতরে কোথা যেন রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অবিরল।
