মধূসূদন বুঝতে পারছিলেন, শাহাবুদ্দিন সাহেব শুভাকাঙ্ক্ষী ঠিকই, কিন্তু তার অসহায়তার সুযোগ নিচ্ছেন। কিন্তু এছাড়া উপায়ই বা কী? তবু টাকার অঙ্কটা বাড়ানোর শেষ একটা চেষ্টা করেছিলেন, আমাদের সত্তর কানি ধান-পাটের জমি, গ্রামের বাড়ি, বাগান, তিন-তিনটে দীঘি, এত কিছুর বদলে মাত্র দেড় লাখ টাকা!
ভাইবা দ্যাখেন, চাইর দিকের যা হাল হেতে আপনে একখান ঘষা পয়সাও পাইতেন না। খালি হাতে ভিটামাটি ছাইড়া যাইতে হইত। হেই জাগায় আমি দ্যাড় লাখ দিতে আছি। কম হইল?
বুঝতেই পারেন, সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে হবে। কী যে কষ্ট! আমাকে কটা দিন ভাবতে দিন।
দ্যাশের গতিক দিনকে দিন খারাপ হইয়া যাইতে আছে। যা ভাবনের তরাতরি ভাইবেন।
কয়েক দিনের মধ্যে শহরের অবস্থা আরও ঘোরালো হয়ে উঠল। বেশ কটা বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হল। খুন হয়ে গেল পাঁচ ছজন।
শহরে ভাঙন শুরু হল। সর্বস্ব ফেলে স্রোতের মতো শয়ে শয়ে মানুষ পালাতে লাগল সীমান্তের ওপারে–ত্রিপুরায়, আসামে, পশ্চিম বাংলায়। তাদের ছেড়ে-যাওয়া জমিজমা বাড়িঘর দখল করে নিতে লাগল রাজাকাররা, ইন্ডিয়া থেকে যাওয়া পশ্চিমারা। এমনকি স্থানীয় মুসলমানরাও।
এদিকে আরও একটা মারাত্মক ব্যাপার ঘটছিল। এতদিন সংখ্যালঘুদের বিষয় সম্পত্তির দিকে চোখ ছিল ইবলিশদের। এবার তাদের নজর এসে পড়ল যুবতী মেয়েদের ওপর। শহরের পুরানো বাসিন্দা আচার্যদের, গুহদের, বসাকদের এবং এমন আরও কয়েকটা বাড়ির সাত-আটটা মেয়েকে রাতের অন্ধকারে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হল। তাদের টার্গেট তখন থেকে শুধু প্রপাটিই নয়, যুবতী নারীও।
মন্টু ছাড়াও মধুসূদনের একটি মেয়ে ছিল। দীপালি। তার বয়স তখন আঠারো। কলেজে পড়ছে। একদিন উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে এল সে। মুখ ছাইবর্ণ। আতঙ্কে চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে।
বাড়িতে ঢুকেই ঘরের মেঝেতে আছড়ে পড়েছিল দীপালি। মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেছিল সে।
মধুসূদন সেদিন বাড়িতেই ছিলেন। শরীরটা ভাল ছিল না। জ্বর জ্বর ভাব। তাই ব্যাঙ্কে যাননি। তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনেই মেয়েকে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। গভীর উদ্বেগে অনেকবার জিজ্ঞেস করার পর জানা গেছে, স্থানীয় লিগের এক পাণ্ড নিয়ামত আলির ছেলে শোভান সেদিন কলেজ কমপাউণ্ডে তার হাত ধরে টানাটানি করেছে। সে মার্কামারা বদমাশ। বলেছে, তাকে শাদি করতে চায়। দীপালি কোনওরকমে হাত ছাড়িয়ে বাড়িতে পালিয়ে এসেছে। উন্মাদের মতো সে বলে যাচ্ছিল, আর কলেজে যাবে না। পাকিস্তানে এক মুহূর্ত থাকবে না। তক্ষুনি নিরাপদ কোনও জায়গায় তাকে নিয়ে যেতে হবে।
মধুসূদন দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। প্রাণ গেলেও নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বংশের মেয়ের এ-জাতীয় বিয়ে হতে দেবেন না। কিন্তু শোভান বেপরোয়া, মারাত্মক। পাকিস্তান কায়েম হবার পর তার মতো শয়তানের পালের দাপট শতগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
জন্মভূমি ছেড়ে চলে যাবার ব্যাপারে মধুসূদনের সামান্য দ্বিধা ছিল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ইন্ডিয়ায় চলে যাবেন। তবে সব গোছগাছ করে নিতে দুচারদিন লাগবে। সেই সময়টুকুর জন্য নিরাপত্তা দরকার। তিনি থানায় চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু শোভানের বিরুদ্ধে কোনওরকম অভিযোগ শুনতে তারা রাজি নয়। নিরুপায় হয়ে এবার গিয়েছিলেন এস ডি ওর কাছে। তরুণ অফিসার। ভদ্র এবং সহৃদয়। নাম রফিকুল ইসলাম। আশ্বাস দিয়েছিলেন, সুরক্ষার ব্যাপারটা তিনি দেখবেন। লিগের পাণ্ডার ছেলেকে রফিকুল কতটা দমিয়ে রাখতে পারবেন, সে-সম্বন্ধে সংশয় ছিল। তবু খানিকটা স্বস্তি বোধ করেছিলেন মধুসূদন।
এস ডি ওর সঙ্গে কথা বলে তিনি গিয়েছিলেন শাহাবুদ্দিন সাহেবের কাছে। দেড় লাখ টাকায় গ্রামের যাবতীয় সম্পত্তি তার হাতে তুলে দিতে তিনি প্রস্তুত। এই হননপুরীতে আর এক লহমাও থাকা ঠিক নয়। বিশেষ করে দীপালিকে বাঁচাতে হলে দেশ ছাড়তেই হবে।
মধুসূদন জিজ্ঞেস করেছিলেন, টাকা নিয়ে কীভাবে ওপারে যাব? টের পেলে পথে ডাকাতরা কেড়ে নেবে। না দিলে খুন করে ফেলবে। যদিও বা তাদের নজর এড়াতে পারি, বর্ডারের অফিসাররা ছাড়বে না। পাকিস্তানের টাকা পাকিস্তানেই রেখে যেতে হবে।
শাহাবুদ্দিন সাহেব কিছুটা স্বার্থপর হলেও বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ লোক। বহু খবর রাখেন। বলেছেন, ঢাকায় মারোয়াড়িরা আছে। হেগো কাছে টাকা জমা দিয়া হুণ্ডি করন লাগব। কইলকাতায় হেগো আসল গদি। হেইখানে গিয়া হুণ্ডির কাগজ দ্যাখাইলে ট্যাকাটা পাইয়া যাইবেন।
ঠিক হল পরদিন স্ট্যাম্প কাগজে বিষয়সম্পত্তি লিখে সই করে দেবার পরই মধুসূদনকে নিয়ে ঢাকায় যাবেন শাহবুদ্দিন। সেইমতো যাওয়াও হল।
হুণ্ডি করে একটা রাত ঢাকায় কাটিয়ে যখন নিজেদের শহরে ফিরে এলেন, মধুসূদনের চোখের সামনে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড শতখান হয়ে ভেঙে পড়েছে। যে রাতটা তারা ছিলেন না, সেই সময়টুকুর মধ্যে বেশ কয়েকটা বাড়িতে আগুন ধরানো হয়েছিল। তাদের বাড়িটাও বাদ যায়নি। তবে সেটা খুব বেশি পোড়েনি। কিন্তু যেটা সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার তা হল, বাড়িতে কেউ নেই। না স্ত্রী, না মন্টু, না দীপালি। চারদিক খাঁ খাঁ করছে।
