জুট কোম্পানিতে কয়েক বছর কাজ করার পর যুদ্ধ লেগে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যাঙ্ক গজাতে লাগল সারা দেশে। পূর্ব বাংলায় তাদের সেই শহরটিও বাদ পড়ল না। তেমনই একটা ব্যাঙ্কে অনেক বেশি মাইনেতে কাজ পেয়ে গেলেন মধুসূদন। প্রথমে ডেপুটি ম্যানেজার, পরে ম্যানেজার।
যুদ্ধ থামার পর শতকরা নব্বই ভাগ ব্যাঙ্কই মানুষের টাকাপয়সা মেরে দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দিল। কিন্তু মধুসূদনদের ব্যাঙ্কের মালিকরা লোকজনকে সর্বস্বান্ত করে, পথের ভিখিরি বানিয়ে, নিজেরা রাতারাতি লক্ষপতি, কোটিপতি হতে চাননি। তেমন কু-মতলব তাদের ছিল না। তাঁরা সৎভাবে ব্যবসা করতে এসেছিলেন। অন্যগুলো লাল বাতি জ্বাললেও মধুসূদনদের ব্যাঙ্ক রমরম করে চলতে লাগল।
মহাযুদ্ধের অবসান হল ঠিকই, কিন্তু ভারতবর্ষের ওপর চরম দুর্যোগ ঘনিয়ে এল। নিমেষে কত কী-ই যে ঘটে গেল। ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশনের এ দেশে আসা, আই এন এর সেনাপতিদের বিচার। রশিদ আলি ডে। স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তাল শহর বন্দর গ্রামগঞ্জ। নৌ-বিদ্রোহ। পাকিস্তানের দাবিতে অনড় জিন্নার ডাইরেক্ট অ্যাকশনের ডাক। রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। কলকাতা বিহার নোয়াখালি বোম্বাই পাঞ্জাব-সারা দেশ জুড়ে শুধুই হত্যা। লুটপাট। ধর্ষণ। আগুন।
মধুসূদনদের শহরে উত্তেজনার আঁচ যে ছড়িয়ে পড়েনি তা নয়। কিন্তু খুন বা আগুনের মতো কোনও ঘটনাই তখনও সেখানে ঘটেনি। শহরটা মোটামুটি শান্তই ছিল।
ডাইরেক্ট অ্যাকশনের এক বছরের মধ্যে দেশভাগ হয়ে গেল। অখণ্ড ভারতবর্ষকে দুটুকরো করে তৈরি হল আলাদা একটি দেশ-পাকিস্তান। বাকি অংশটা সাবেক নামই ধরে রাখল–ভারত।
পার্টিশানের পর কিছুদিন নির্বিঘ্নেই কেটেছে। কিন্তু তারপর শুরু হল মুসলিম লিগ আর রাজাকারদের উৎপাত। তাছাড়া, ইন্ডিয়া থেকে যে পশ্চিমা মুসলমানরা ইস্ট বেঙ্গলে চলে গেছে তাদের অনেকেই মধুসূদনদের শহরে গিয়ে আস্তানা গেড়েছিল। এরা হাত মিলিয়েছিল রাজাকারদের সঙ্গে। স্থানীয় বহু মুসলমানও এদের সঙ্গে জুটে গিয়েছিল। ওদের সবার লক্ষ্য হিন্দুদের প্রপার্টি। শহরের আবহাওয়া দ্রুত পালটে যেতে লাগল। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক।
প্রথম প্রথম ওরা বেনামা চিঠি দিত। যত তাড়াতাড়ি পার, হিন্দুস্থানে চলে যাও।
খানিকটা ঘাবড়ে গেলেও দেশ ছাড়ার কথা ভাবেননি মধুসূদন। কয়েক পুরুষ ধরে পাশাপাশি বাস করে আসছেন, এমন মাতব্বর জাতীয় কয়েকজনকে গিয়ে চিঠিগুলো দেখিয়েছেন তিনি। তারা ভরসা দিয়েছেন, ইন্ডিয়ায় যাবার কোনও প্রায়োজন নেই। যেমন আছেন তেমনি থাকুন। তিনি পাকিস্তানের নাগরিক। অন্য সবার মতো জন্মভূমিতে থাকার হক তার আছে।
আশ্বাস পাওয়া সত্ত্বেও কিন্তু দুর্ভাবনা কাটল না। আগে যারা বেনামা চিঠি পাঠাত এবার তাদের চেহারাগুলো দেখা যেতে লাগল। রাস্তায় বেরুলেই সামনে এসে তারা দাঁড়াত।
পাকিস্থান অহন আমাগো দ্যাশ। এইখানে পইড়া আছেন ক্যান? ইন্ডিয়ায় ম্যালা সুযুগ সুবিধা পাইবেন। যান গিয়া।
শহরের মান্যগণ্য মানুষগুলোর কাছে আবার ছুটলেন মধুসূদন। ফের আশ্বাস জুটল।
এইভাবে চলল মাস দেড় দুই। তারপর সরাসরি হুমকি শুরু হল।
ভাল কথায় কতবার কইছি, কিন্তুক আপনে কানে তুললেন না। ভসচাষ (ভট্টাচার্য) মশয়, এইবার কিম জবর তাফালে (বিপদে পড়বেন।
তাদের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী বলে যাঁকে জানতেন, সেই শাহাবুদ্দিন সাহেব, শহরের মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান, তার কাছে দৌড়লেন মধুসূদন। খাতির যত্ন করে তাঁকে বসালেন শাহাবুদ্দিন। মন দিয়ে তার দুর্ভাবনার কথা শুনলেন।
আগে বহুবার শাহাবুদ্দিনের কাছে এসেছেন। কিন্তু এবার কোনওরকম ভরসা দিলেন না। চিন্তাগ্রস্তের মতো গম্ভীর মুখে বললেন, টাউন জবর গরম হইয়া উঠছে। আপনার লাখান অনেকেরই দ্যাশ ছাড়নের লেইগ্যা পশ্চিমারা আর রাজাকাররা শাসাইতে আছে। অবোস্থা দিন দিন আমার কনট্রোলের বাইরে চইলা যাইতে আছে। একটু থেমে সদয় সুরে বলেছিলেন, আমার একখান কথা হোনবেন?
কিসের একটা সংকেত পেয়ে গিয়েছিলেন মধুসূদন। বলেছিলেন, কী?
চির কাল তো দেইখা আইছেন, আমি আপনেগো হিত চাই। ইন্ডিয়ায় চইলাই যান।
আপনিও চলে যেতে বলছেন?
আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে শাহাবুদ্দিন সাহেব বলেছিলেন, হ। নাইলে শয়তানের ছাওরা কহন যে কী কুকম্ম কইরা ফালাইব ক্যাঠা জানে।
শেষ ভরসাটুকুও মুহূর্তে ধূলিসাৎ। মধুসূদন দিশেহারার মতো বলেছিলেন, কিন্তু আমাদের বাড়িঘর, জমিজমা-এ-সবের কী হবে? ইন্ডিয়ায় গিয়ে কী করব? কী খাব? তার গলার স্বর বুজে এসেছিল।
হেই হগলের কথাও আমি ভাইবা রাখছি। দ্যাশ ছাইড়া চইলা গ্যালে আপনেগো বিষয়আশয় বেদখল হইয়া যাইতে পারে। উই রাজাকাররা কি পশ্চিমারা যদিন একবার গাইড়া বসে, সব্বনাশ। এই জম্মে আর হেইগুলা ফিরত পাওনের আশা নাই। আমি আপনেগো শহরের বাড়িখান দেখুম, কেও.যাতে বইয়া পড়তে না পারে। ইন্ডিয়া থিকা চিঠিপত্তরে যুগাযুগ রাইখেন। যদিন সুদিন ফিরে, দ্যাশে চইলা আইয়েন। কিন্তুক
কিন্তু কী?
টাউনে বইসা আপনেগো গেরামের জমিজেরাত সামলান তো সম্ভব না। তাই কই কি, হেই হগলের লেইগা আমি দ্যাড় লাখ টাকা দিমু। গেরামের উই সোম্পত্তি আমারে লেইখা দিবেন।
