বিনয় জিজ্ঞেস করল, তাছাড়া কী?
ওরা আমাদের ইস্ট বেঙ্গলের লোক। উদ্বাস্তু। নিশ্চয়ই কোনও বড় রকমের দুঃখের কারণ ঘটেছে। সমস্ত জেনে নিয়ে, পারলে ওদের সাহায্য করা উচিত। দেশের মানুষের পাশে না দাঁড়ালে চলে?
অগত্যা কারওই আর ওঠা হয় না। যে যার চেয়ারে বসে থাকে।
বাড়ির ভেতরে কী হচ্ছে, বাইরের ঘর থেকে তার কিছুই আঁচ করা যাচ্ছে না। শুধু কান্না আর করুণ, কাতর বিলাপ ছাড়া অন্য কোনও শব্দ নেই।
অনেকক্ষণ পর কান্নার তীব্রতা কমতে কমতে থেমে যায়। বাড়িটা একেবারে নিঝুম হয়ে গেছে।
একসময় মধুসূদন বাইরের ঘরে ফিরে এলেন। তার হাতে ঝকঝকে কাঁসার থালায় চার গেলাস জল। সঙ্গে এসেছে একটি চোদ্দ-পনেরো বছরের কিশোর। রোগা, ফর্সা, মুখখানা ভারী মলিন। চুল উষ্কখুষ্ক। পরনে হাফ প্যান্ট আর হাফ শার্টের ওপর সোয়েটার। তার হাতেও একটা কাঁসার থালা। সেটায় সাজানো রয়েছে অনেকগুলো নারকেলের নাড় আর কাঁচাগোল্লা। অতিথিদের শুধু জল তো দেওয়া যায় না।
বিনয় লক্ষ করল, মধুসূদনকে আগের থেকে অনেক বেশি বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। সারা মুখে অসহ্য কষ্টের ছাপ। কেমন যেন উভ্রান্ত লাগছে।
টেবলে কাঁসার থালাসুদ্ধ জলের গেলাসগুলো নামিয়ে রাখলেন মধুসূদন। কিশোরটিও তার হাতের থালাটা সেটার পাশে রাখল।
দ্বারিক দত্ত বললেন, খালি জল চেয়েছিলাম। আবার মিষ্টি কেন?
মধুসূদন বললেন, এই সামান্য একটু
দাঁড়িয়ে কেন? বসুন–
মধুসূদন একটা চেয়ারে নিঃশব্দে বসে পড়লেন। দ্বারিক দত্ত কিশোরটিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ কে? ছেলে?
আস্তে মাথা নাড়লেন মধুসূদন, হ্যাঁ।
দ্বারিক দত্ত ছেলেটিকে ডেকে তার পাশে বসিয়ে বললেন, কী নাম তোমার দাদাভাই?
ছেলেটি সবে কলকাতায় এসেছে। এখনও জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আড়ষ্টভাবে বলল, মন্টু। ভাল নাম কৃষ্ণকিশোর ভট্টাচার্য।
কোন ক্লাসে পড়?
দেশে থাকতে নাইনে পড়তাম। এখানে এসে এখনও স্কুলে ভর্তি হতে পারিনি।
মধুসূদন জানালেন, কাছাকাছি দুতিনটে স্কুলে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। আশা করা যায়, এই সপ্তাহেই কোথাও ভর্তি করে দিতে পারবেন।
জলের গেলাস তুলে নিলেন দ্বারিক দত্ত। বিনয়রাও একটা করে তুলল। ঘোরাঘুরি করে তাদেরও তেষ্টা পেয়েছে।
মধুসূদন বললেন, প্রথম দিন এলেন। একটু মিষ্টিমুখ না করলে কি হয়? একটা নাড় কি কাঁচাগোল্লা অন্তত নিন।
দ্বারিক দত্ত বয়সের দোহাই দিয়ে জানালেন, বৃদ্ধ হয়েছেন। কিছুক্ষণ আগে জলখাবার খেয়ে বেরিয়েছেন। তার ওপর খেলে কষ্ট হবে। বিনয়রা অবশ্য রেহাই পেল না। তাদের নাড়-টাড় নিতেই হল।
জল খাওয়া হলে দ্বারিক দত্ত বললেন, যদি অন্যায় না হয়, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
মধুসূদন কয়েক মুহূর্ত দ্বারিক দত্তর দিকে তাকিয়ে রইলেন। পলকহীন। তারপর জোরে শ্বাস টেনে বললেন, আপনি কী জানতে চাইছেন তা আন্দাজ করতে পারছি।
দ্বারিক দত্ত উত্তর দিলেন না।
মধুসূদন মন্টুকে বললেন, তুই ভেতরে যা। ছেলে চলে যাবার পর এভাবে শুরু করলেন, মন্টুর সামনে কথাটা বলতে চাই না, তাই পাঠিয়ে দিলাম। অবশ্য ও বড় হয়েছে। সবই বোঝে। তবু– শেষ না করে থেমে গেলেন তিনি।
দ্বারিক দত্ত এবারও চুপ।
মধুসূদন বলতে লাগলেন, যার কান্না শুনে আপনাদের বসিয়ে রেখে বাড়ির ভেতর দৌড়ে গিয়েছিলাম সে আমার স্ত্রী কমলা। দিন নেই, রাত নেই, যে-কোনও সময় ও এইভাবে কেঁদে ওঠে। যতদিন বেঁচে আছে, কেঁদেই যাবে। ওর কান্নার শেষ নেই।
ঘরের ভেতর স্তব্ধতা নেমে আসে।
কিছুক্ষণ পর নৈঃশব্দ্য ভেঙে মধুসূদন এলোমেলোভাবে যা বললেন, গুছিয়ে নিলে এইরকম দাঁড়ায়।
তিনি নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বংশের সন্তান। কয়েক পুরুষ ধরে তারা গুরুগিরি করে এসেছেন। গোটা ইস্ট বেঙ্গল জুড়ে তাদের কত যে শিষ্য-সেবক ছিল তার লেখাজোখা নেই।
মধুসূদনদের শহরে এবং গ্রামে দুজায়গাতেই বিশাল বাড়ি। তারা অবশ্য বেশির ভাগ সময় শহরে থাকতেন। মাঝে মাঝে গ্রামে। বাড়ি ছাড়াও গ্রামে ছিল চকের পর চক জুড়ে জমিজমা। ফলের বাগান। তিন চারটে দীঘি। ফলে প্রচুর ধান, প্রচুর পাট, অজস্র ফল, অঢেল মাছ। সে-সব তদারকি করতে তাঁদের গ্রামে যাওয়া।
ব্রাহ্মণত্বের যাবতীয় গোঁড়ামি এবং সংস্কার ছিল মধুসূদনদের হাড়ে-মজ্জায়। এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্ম উত্তরাধিকার হিসেবে সেগুলো পেয়ে আসছিল। ঠাকুরদা পর্যন্ত তাঁদের বংশের সবাই টোলে গিয়ে সংস্কৃত টংস্কৃত পড়ে এসেছেন। গুরুগিরিটা চলছিল মসৃণ নিয়মে। কিন্তু সময় বদলে যাচ্ছিল ত্বরিত গতিতে। মধুসূদনের বাবা শশিশেখর টোলে আদ্য মধ্য ইত্যাদি পড়তে যাননি। বংশধারা বিরোধী কাজই করেছিলেন তিনি। ইংরেজি শেখার জন্য কেঁদেকেটে শহরের অন্য সব বাড়ির ছেলেদের মতো প্রথমে এম ই স্কুলে পড়ে হাইস্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। গুরুগিরি-টিরি তার ধাতে ছিল না। ম্যাট্রিকটা পাশ করার পর ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিলেন। তখন ব্রিটিশ আমল। ডি. এম খাঁটি ইংরেজ। ম্লেচ্ছর দপ্তরে গোলামি করার জন্য বাড়িতে অশান্তি কম হয়নি।
সেই যে পরম্পরা ভেঙে গিয়েছিল, সেটা আর ঠেকানো যায়নি। শশিশেখরের ছেলে মধুসূদনও গুরুগিরি বা সংস্কৃত টংস্কৃত নিয়ে আদৌ মাথা ঘামাননি। বি এ পাস করার পর জুট কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছিলেন। তাদের শহরে কোম্পানিটার ব্রাঞ্চ অফিস ছিল। চারপাশের চাষীদের কাছ থেকে পাট জোগাড় করে তাঁরা নারায়ণগঞ্জের জুট মিলে পাঠাতেন।
