ও।
আগেই রাস্তার ধারের বাড়িগুলোর জানালায় জানালায় সারি সারি উৎসুক মুখ দেখা গিয়েছিল। এখনও তারা অপার কৌতূহলে তাকিয়ে আছে। কী উদ্দেশ্যে বিনয়রা এ-পাড়ায় এসেছে, সেটা আঁচ করে নিতে চাইছে।
বাঁ পাশের তিন চারটে উঁচু বাড়ি পেরিয়ে যাবার পর একটা দোতলার সামনে আসতে দেখা গেল, গেটের কাছে একজন প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে ধুতি আর পাঞ্জাবির ওপর গরম পশমি চাদর জড়ানো। পায়ে চটি।
টকটকে রং ভদ্রলোকের। ধারালো নাক। বড় বড় চোখ। চওড়া কপাল। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও বেশির ভাগ চুলই কুচকুচে কালো। অল্পই পেকেছে। সব মিলিয়ে বেশ সুপুরুষ। কিন্তু চোখের তলায় গাঢ় কালির ছোপ। সমস্ত চেহারায় অনন্ত বিষাদ মাখানো। তার দিকে তাকানোমাত্র টের পাওয়া যায়, সারাক্ষণ বুঝি বা কী এক যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছেন।
ভদ্রলোক যেচে আলাপ করলেন। হাতজোড় করে বললেন, নমস্কার। আমার নাম মধুসূদন ভট্টাচার্য। আমাদের দেশ ইস্ট পাকিস্তানে। কুমিল্লায়। সম্প্রতি ইন্ডিয়ায় এসেছি। তাঁর কথায় পূর্ব বাংলার টান।
বিনয়রা দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সবাই প্রতি-নমস্কার জানালো। দ্বারিক দত্ত নিজেদের পরিচয় দিয়ে বললেন, আমাদের দেশ ছিল ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের রাজদিয়ায়। আরও জানালেন সুধা, হিরণ আর তিনি বেশ কবছর হল কলকাতায় এসেছেন। বিনয় এসেছে দেশভাগের অনেক পর, এই সেদিন।
মধুসূদন বললেন, আপনাদের খান মঞ্জিল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। আজকাল ইস্ট পাকিস্তানের অনেকে এখানকার মুসলিমদের বাঘিরের সঙ্গে তাদের দেশের প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ করে চলে আসছে। আপনাদেরও কি সেইরকম ইচ্ছা?
ঠিকই ধরেছেন। দ্বারিক দত্ত জানান, খান মঞ্জিল-এর সঙ্গে তারা রাজদিয়ার বিষয়আশয় এক্সচেঞ্জ করবেন। কথা পাকা হয়ে গেছে।
গভীর আগ্রহে মধুসূদন বললেন, যত তাড়াতাড়ি পারেন চলে আসুন। বাইরে থেকে যতটুকু দেখেছি তাতে মনে হয় খান মঞ্জিল বিল্ডিংটা বেশ মজবুত। চারপাশে জায়গাও অনেকখানি। একটু থেমে নিজের বাড়িটা দেখিয়ে বললেন, এক দালাল মারফত এক্সচেঞ্জ করে আমিও এটা পেয়েছি। ঈশ্বরের করুণাই বলতে পারেন। পাকিস্তানের যা হল, আর দেরি হলে সেখানকার প্রপাটি বেহাত হয়ে যেত। আমাদের শিয়ালদা স্টেশনে কিংবা রিফিউজি ক্যাম্পে পচে মরতে হতো।
বিনয়রা এবার খুঁটিয়ে মধুসূদন ভট্টাচার্যের বাড়িটা লক্ষ করল। সদ্য কলি ফেরানো হয়েছে। দরজা জানালা থেকে টাটকা পেন্টের গন্ধ ভেসে আসছে।
হিরণ বলল, আপনিও বেশ ভাল বাড়ি পেয়েছেন।
মধুসূদন সামান্য হাসলেন।
খান মঞ্জিল-এর একতলা থেকে তেতলার ছাদ পর্যন্ত ওঠানামা করে, ঘুরে ঘুরে বাড়িটা দেখে, তারপর রাস্তায় বেরিয়ে খানিকটা হাঁটাহাঁটি করে, ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন দ্বারিক দত্ত। হাজার হোক, বয়স তো কম হয়নি। তার ওপর তেষ্টাও পেয়েছে। বললেন, ভট্টাচাজ্জি মশায়, আমাকে এক গেলাস জল খাওয়াতে পারেন?
বিনয়দের নজরে পড়ল, কেমন যেন বিব্রত হয়ে পড়েছেন মধুসূদন। চোখেমুখে অস্বাচ্ছন্দ্য ফুটে বেরিয়েছে। ভদ্রতার খাতিরে দ্বারিক দত্তদের অনেক আগেই বাড়িতে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু মধুসূদনের মধ্যে এ-ব্যাপারে কোথায় যেন একটা বাধা আছে। এদিকে তৃষ্ণার্ত মানুষটিকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে জল এনে দেওয়া যায় না। দ্বিধাভরে তিনি বললেন, ভেতরে আসুন
গেটের পর সুরকির পথ পেরিয়ে মূল বাড়ির সদর দরজা। সেটা ভোলাই ছিল। মধুসূদন সবাইকে একতলার বসার ঘরে নিয়ে এলেন। গদি-বসানো খানকয়েক বেতের সোফা, কাঁচ-লাগানো গোলাকার নিচু সেন্টার টেবল দিয়ে ঘরটা সাজানো। অবশ্য এক ধারে ধবধবে চাদর পাতা একটা তক্তপোশ আর গোটা দুই বইয়ের আলমারিও রয়েছে।
মধুসূদন বললেন, বসুন। আমি জল নিয়ে আসছি—
বিনয়রা সবে বসেছে, আচমকা বাড়ির ভেতর থেকে তীব্র কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। কোনও মহিলার বুকফাটা বিলাপ। করুণ, একটানা।
ত্রস্ত, সচকিত মধুসূদন দৌড়ে ডানদিকের একটা দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। অতিথিদের দিকে একবার ফিরেও তাকালেন না।
আর বিমূঢ়ের মতো বিনয়রা পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল।
.
১৮.
যে কাঁদছে তার কত বয়স, কে জানে। তবে কিশোরী বা যুবতী নয়। হয়তো বয়স্ক কোনও মহিলা। কান্নাটা তার শিরায়ু ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। কী যে তীব্র আকুলতা আর ক্লেশ এর সঙ্গে জড়ানো, ঠিক বোঝানো যায় না। এটুকু আন্দাজ করা যাচ্ছে, দেশের ভিটেমাটি সোনাদানার চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান কিছু না খোয়ালে কেউ এভাবে কাঁদতে পারে না।
মধুসূদন ভট্টাচার্যের পরিবারে এমন কিছু ঘটেছে যা শোকাবহ, নিদারুণ। তার তলকূল অবশ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বিনয়রা ভীষণ অস্বস্তি বোধ করতে লাগল।
হিরণ চাপা গলায় বলল, আমাদের এখানে আর থাকা ঠিক হবে না। চল—
বিনয় বলল, মধুসূদনবাবুর মুখচোখ দেখে তখন মনে হচ্ছিল, বাড়ির ভেতর আমাদের নিয়ে আসার ইচ্ছা ওঁর ছিল না। দাদু জল খেতে চাইলেন, তাই ভদ্রতার খাতিরে ডেকে এনেছেন। একটু থেমে বলল, এদের বাড়িতে মারাত্মক কিছু ঘটেছে। হিরণদা ঠিকই বলেছে, আমাদের চলে যাওয়াই উচিত; উঠে পড়–
বিনয়, সুধা আর হিরণ উঠতে যাচ্ছিল, হাত নেড়ে তাদের থামিয়ে দিলেন দ্বারিক দত্ত, লোকটা আমাদের বাড়িতে এনে বসিয়েছে। তাকে না বলে চলে যাব? এটা কোন দেশি শিষ্টাচার? তাছাড়া
