হিরণ সুধা আর দ্বারিক দত্তকে জিজ্ঞেস করল, আগে বাড়ির ভেতরে যাবে, নাকি চারপাশ দেখে নেবে?
সুধারা জানায়, চারদিক দেখার পর মূল বাড়িতে ঢুকবে।
চল–
বাড়িটার দুধারে এবং সামনে পেছনে এক চক্কর ঘোরা হল। দুপাশে লাইন দিয়ে দেবদারু গাছ। সেগুলোও মলিন। ম্রিয়মাণ। বাড়ির সামনের অংশের মতো পেছনেও বেশ বড় বাগান। সেখানকার গাছগুলোর একই হাল। একধারে একটা গ্যারাজ আর ঘোড়ার আস্তাবল রয়েছে। এসব এ-বাড়ির সুখের দিনের স্মৃতিচিহ্ন। শওকত আলির বাবা রহমত আলি ছিলেন বাঘা উকিল। বিপুল পশার ছিল তার। সেই সময় একটা অস্টিন গাড়ি, ফিটন আর ঘোড়া কিনেছিলেন। এখন গাড়ি ঘোড়া কিছুই নেই। গ্যারাজ, আস্তাবল ফাঁকা পড়ে আছে।
চারপাশ দেখানোর পর তালা খুলে মূল বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল হিরণরা। বিনয় সেদিন বাইরে থেকে দেখে গিয়েছিল। বাইরেটা সাদামাঠা, সাবেক ধাঁচের হলেও ভেতরটা চমৎকার। একতলা থেকে তিনতলা, সমস্ত ঘরের মেঝে, বারান্দা, সিঁড়ি, সবেতেই শ্বেত পাথর বসানো। সিলিংয়ে পঙ্খের সুন্দর সুন্দর নকশা। চওড়া চওড়া দেওয়াল। প্রতিটি জানালায় দুটো করে পাল্লা। একটা রঙিন কাঁচের। অন্যটা কাঠের খড়খড়ি। সেগুন কাঠের পুরু দরজাগুলোতে কত রকমের কারুকাজ। ওঠানামার সিঁড়ির ধারে কাঠের রেলিংয়ের ওপর পেতলের পাত বসান। প্রতিটি ঘর বার্মা টিকের ভারী ভারী আসবাবে বোঝাই। খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবল, চেয়ার, কুশন ইত্যাদি রকমারি জিনিস।
ছাদটাও ঘুরে ঘুরে দেখা হল। কার্নিস কোথাও কোথাও ভেঙে গেছে। রেন-ওয়াটার পাইপের মুখে ফাটল। সমস্ত দেখা হয়ে গেলে প্রতিটি ঘরে তালা লাগিয়ে নিচে নামতে নামতে হিরণ সবাইকে জিজ্ঞেস করল, কেমন দেখলে বাড়িটা?
দ্বারিক দত্ত তারিফের সুরে বললেন, খাসা। আমাদের রাজদিয়ার বাড়িঘর আর জমিজমার সঙ্গে এক্সচেঞ্জ করে কলকাতায় এমন একটা বিল্ডিং পাওয়া যাবে, ভাবতেই পারিনি। এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থা করে খুব বুদ্ধিমানের কাজ করেছিস হিরণ। খান মঞ্জিল হাতছাড়া হলে পস্তাতে হতো। দক্ষিণ আর পুব দিকটা পুরো খোলা। আলো হাওয়ার কোনওদিন অভাব হবে না। তা ছাড়া
কী?
দেখে টেখে মনে হল, বাড়িটা ভীষণ মজবুত। যেটুকু মেরামতি দরকার, তাতে খুব একটা খরচ হবে না। তবে রান্নাঘর টর ভেঙে নতুন করে বানাতে হবে।
ইঙ্গিতটা ধরে ফেলেছিল হিরণ। বলল, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
সুধা বলল, পুরো বাড়িটার ভেতরে বাইরে রং করাতে হবে। নইলে জেঠিমাকে এখানে আনা যাবে না।
হিরণ বলল, রংও করাব। বিল্ডিংটার ভোল এমন পালটে দেব যে চিনতেই পারবে না। মনে হবে একেবারে নতুন।
হঠাৎ কী মনে পড়ে যাওয়ায় চিন্তাগ্রস্তের মতো সুধা বলে উঠল, কিন্তু
আবার কী?
এ-বাড়িতে যে খাট আলমারি টালমারি রয়েছে সেগুলোর কী হবে?
এদিকটা আগে ভেবে দেখেনি হিরণ। কী উত্তর দেবে, ঠিক করে উঠতে পারল না।
সুধা থামেনি, এ-সব ফার্নিচার আমরা কিছুতেই ব্যবহার করব না।
হিরণের মাথাতেও আসবাবগুলোর চিন্তা পাক খাচ্ছিল। চকিতে সমস্যার একটা সমাধানও সে পেয়ে গেল। বলল, শওকত সাহেবকে তার খাট টাট নিয়ে যেতে বলব।
সেই ভাল। নিজেদের জিনিস ওরা নিয়ে যাক।
.
বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেটে তালা লাগিয়ে রাস্তায় চলে এল বিনয়রা।
যে রিকশা দুটোয় চড়ে তারা এখানে এসেছিল, কোথাও তাদের দেখা পেল না। ভাড়া বুঝে নিয়ে ওরা চলে গেছে।
এখানকার কাজ শেষ। খান মঞ্জিল দেখে সুধা এবং দ্বারিক দত্ত দুজনেই খুশি। দ্বারিক দত্ত তো উচ্ছ্বসিতুই হয়ে উঠেছেন। বেশ ভালই লাগছে হিরণের।
এবার ফেরার পালা। সেই দুটো রিকশা না থাকলেও ডান পাশে খানিক দূরে একটা ডালপালাওলা ঝকড়া রেন-ট্রির তলায় রিকশা স্ট্যান্ড চোখে পড়ল হিরণের। পাঁচ ছটা গাড়ি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। সে হাত নেড়ে তাদের ডাকতে যাচ্ছিল, বাধা পড়ল।
দ্বারিক দত্ত বললেন, এখন বাড়ি যাব না। রিকশা ডাকিস না।
হিরণ অবাক হল, কী করবে এখানে থেকে?
বাড়ি তো ভালই জোগাড় করেছিস। তবে আশেপাশের লোকজন, পরিবেশ কেমন, সেটা একটু বুঝবার চেষ্টা করি। প্রতিবেশী ভাল না হলে বড় অশান্তি।
দ্বারিক দত্তর মনোভাবটা পরিষ্কার। হিরণ বলল, তুমি কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে এখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করে জিজ্ঞেস করবে, মশায় আপনারা মানুষ কেমন? কথায় কথায় কি ঝামেলা বাধান, না শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক?
দ্বারিক দত্ত হেসে ফেললেন, আরে বাবা, কারও বাড়িতেই আমি ঢুকব না। দুনিয়ায় কতকাল বেঁচে আছি! বয়েস আর এক্সপিরিয়েন্স তো কম হল না। মানুষের মুখ দেখলে তার চরিত্র কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারি। কোথাও গেলে, সেই জায়গাটা কেমন, ভাল না মন্দ, তার গন্ধ পাই।
হিরণ এ নিয়ে কথা বাড়াল না। বলল, কোন দিকে যাবে, বল–।
এধারে ওধারে তাকিয়ে দ্বারিক দত্ত বললেন, বাঁ দিকটায় চল ওই দিকটায় অনেকগুলো দোতলা তেতলা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার ওপারেও বেশ কিছু দালানকোঠা। দূরে একটা মাজার চোখে পড়ছে।
হাঁটতে হাঁটতে সব লক্ষ করছিলেন দ্বারিক দত্ত। বললেন, এখানে হিন্দুদের বাড়ি খুব কম– তাই না?
হিরণ বলল, আগে এই এরিয়ায় টেন পারসেন্টের মতো হিন্দু ছিল। এখন প্রায় সেভেন্টি পারসেন্ট। যত বাড়ি দেখছ তার বেশির ভাগই এখানকার মুসলিমরা, এক্সচেঞ্জ করে বা বেচে পাকিস্তানে চলে গেছে। বাকি যারা রয়েছে তারাও অনেকে যাবার জন্য পা বাড়িয়ে আছে।
