আজ রবিবার। ঠিক হল, বেলা খানিকটা চড়লে, দিনের তাপাঙ্ক বাড়লে খান মঞ্জিল দেখতে যাওয়া হবে। সবাই যেতে রাজি হলেও, সরস্বতী পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, যাবেন না। বাড়িটা সারিয়ে সুরিয়ে, ভোল পালটে যেদিন পুজোটুজো দিয়ে শুদ্ধিকরণ করা হবে, সেদিন যাবেন। তার আগে নয়। রক্তের মধ্যে বদ্ধমূল সংস্কার কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না তিনি। এ-জীবনে বুঝিবা তা আর সম্ভব হবে না।
অগত্যা দুটো রিকশা ডেকে দ্বারিক দত্ত, হিরণ, সুধা আর বিনয় বেরিয়ে পড়ল। বিনয় এবং হিরণ বসেছে একটা রিকশায়। অন্যটায় দ্বারিক দত্ত আর সুধা।
হিমঋতুর বাতাস বয়ে যাচ্ছে ধীর লয়ে। কুয়াশা কেটে গেছে। রোদের তেজ কিছুটা বাড়ায় ঠাণ্ডাটা সেভাবে গায়ে বিধছে না। শীতের দিন হলেও ঝলমলে আলোয় ভরে আছে চারদিক।
জাফর শা রোড থেকে বেরিয়ে নানা অলিগলির ভেতর দিয়ে ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে দুই রিকশা। একটার পেছনে আর-একটা।
সপ্তাহ কয়েক আগে এই এলাকায় হিরণের সঙ্গে বাজার ফেরত একবার এসেছিল বিনয়। দুধারের গরিব মুসলমানদের বস্তিগুলোতে সেই পরিচিত দৃশ্য। অগুনতি বাচ্চা কাচ্চা ছুটোছুটি করছে। তুমুল হইচই। তাদের সঙ্গে রয়েছে একপাল মুরগি আর রাস্তার নেড়ি কুকুর। খাঁটিয়া পেতে বয়স্ক কিছু পুরুষ ময়লা কাথা বা ধুসো কম্বল গায়ে জড়িয়ে রোদ থেকে উত্তাপ শুষে নিচ্ছে। এখানে পর্দার কড়াকড়ি নেই। সেদিনের মতো আজও দেখা গেল, দূর থেকে নানা বয়সের অনেকগুলো মেয়েমানুষ তাদের লক্ষ করছে। এখানকার বাসিন্দাদের চোখেমুখে যতটা কৌতূহল, তার চেয়ে উদ্বেগ এবং অস্বস্তি অনেক বেশি। হিরণের কাছে বিনয় শুনেছিল, ছেচল্লিশের ডাইরেক্ট অ্যাকশনের দিন এই-সব বস্তি থেকে লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান স্লোগান দিতে দিতে লম্বা মিছিল গড়ের মাঠের দিকে গিয়েছিল। যে নেতারা একদিন এদের উসকে দিয়েছিল, ইন্ডিয়াকে দুটুকরো করে মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য গরম গরম বুলিতে রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে লটবহর গুছিয়ে সীমান্তের ওপারে তারা উধাও হয়েছে। পড়ে আছে এইসব হা-ভাতে গরিব মানুষের দঙ্গল। এই সেদিন গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ঘটে গেছে। কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল নিদারুণ এক বধ্যভূমি। চারদিকে শুধু হত্যা। আগুন। অবিরল রক্তপাত। রাস্তায় রাস্তায় মৃতদেহের পাহাড়। সেদিনের ভয়াবহ দাঙ্গা কারও স্মৃতি থেকে এখনও বিলীন হয়ে যায়নি। বরং দগদগে ক্ষতের মতো টাটকা। এইসব বস্তির বাসিন্দারা হয়তো ভাবে, চারপাশের মানুষ সারাক্ষণ অস্ত্রে শান দিচ্ছে। তাই ভয়। তাই শঙ্কা। তাই উৎকণ্ঠা।
হিরণ বলেছিল, পার্টিশানের পর এই এলাকা থেকে অনেকেই চলে গেছে। এখনও যাচ্ছে। কেউ পূর্ব পাকিস্তানে। কেউ পশ্চিম পাকিস্তানে। কিন্তু বস্তির এই মানুষগুলো ঘাড় গুঁজে এখানেই পড়ে আছে।
নতুন দেশে গিয়ে কোথায় আশ্রয় পাবে, কী করবে, কী খাবে, কিছুই জানা নেই। হয়তো সেখানে গেলে আরও বড় কোনও সংকটের মধ্যে পড়তে হবে। কিন্তু এই টালিগঞ্জ তাদের পরিচিত জায়গা। কয়েক পুরুষ ধরে তারা এখানে বাস করে আসছে। দেশভাগের পর ভয়ে ভয়ে তাদের দিন কাটছে। রয়েছে প্রবল দুর্ভাবনা। তবু এই এলাকা ছেড়ে তারা চলে যেতে পারেনি।
চাপ-বাঁধা বস্তিগুলোর পর আরও কটা অলিগলি পেরিয়ে একটা বেশ চওড়া রাস্তায় এসে পড়ল বিনয়রা। ডান পাশে মিনিট খানেক যেতেই খান মঞ্জিল। হিরণ রিকশাওলাকে বলল, এখানে থামো–
রিকশা দাঁড়িয়ে পড়ল। সুধারা পেছন পেছন আসছিল। তাদের রিকশাও থেমে গেল।
হিরণ বলল, আমরা এসে গেছি। সবাই নেমে পড়।
বিনয় লক্ষ করল, সেদিনের মতো আশেপাশের কটা বাড়ির জানালায় আজও বেশ কিছু কৌতূহলী মুখ। পুরুষ কম। মেয়েরাই বেশি। কিশোরী থেকে মধ্যবয়সিনী। উৎসুক দৃষ্টিতে তারা বিনয়দের দেখছে।
দ্বারিক দত্তকে ধরে ধরে নামিয়ে এনেছিল সুধা। ভাড়া মিটিয়ে বিনয় সবাইকে নিয়ে খান মঞ্জিল এর গেটের সামনে চলে এল।
মস্ত লোহার ফটকের পাশে বাউন্ডারি ওয়ালের গায়ে শ্বেত পাথরের ফলকে বাড়িটার নাম এবং প্রতিষ্ঠার বছর বড় বড় কালো হরফে লেখা রয়েছে। দ্বারিক দত্তর চোখ ফলকটায় আটকে গেল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেটা পড়ে হিরণকে জিজ্ঞেস করলেন, এক্সচেঞ্জ করার পর বাড়ির নাম খান মঞ্জিলই থাকবে না কি?
হিরণ শশব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে, না না, বাড়িটা তখন আমাদের হয়ে যাবে। পছন্দমতো একটা নাম দেব। কদিন আগে বিনুকে বাড়িটা দেখাতে এনে সেই কথাই বলেছি।
কী নাম দিতে চাস?
সেটা তোমাদের সবার সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করব।
দ্বারিক দত্ত খুশি হলেন, হ্যাঁ, ভেবে চিন্তে একটা সুন্দর নাম দিতে হবে।
গেটের দুটো পাল্লা শেকল দিয়ে আটকে তালা লাগানো ছিল। তালা খুলে সকলকে সঙ্গে করে ভেতরে ঢুকে পড়ল হিরণ।
সেকেলে ধাঁচের তেতলা বাড়িটা মাঝখানে। সেটাকে ঘিরে চারপাশে অনেকটা করে ফাঁকা জায়গা। এককালে সামনের দিকে বাগান ছিল। এখন মানুষজন থাকে না। যত্ন নেই। পরিচর্যা নেই। ফুলের গাছগুলো শুকিয়ে কাঠিসার। নানা ধরনের বাহারি লতা ছিল। সব দড়ি পাকিয়ে গেছে। পাতাবাহার গাছ, ঝাউ গাছ, কোনওটাই সতেজ নেই। সেগুলোরও মরণদশা।
