বিনয় উত্তর দিল না। কী বলবে সে? নিত্য দাসকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে কত বোঝানো হয়েছে হেমনাথকে। কিন্তু কোনও কথা শুনবেন না তিনি। সৎ পরামর্শ দিলে উড়িয়ে দেবেন। পুরোপুরি অবুঝ। একগুঁয়ে। অপরিণামদর্শী।
একসময় খুব ভারী গলায় দ্বারিক দত্ত বললেন, পাটনা থেকে এসে একটা খুব খারাপ খবর শুনলাম বিনু
সচকিত বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী খবর দাদু? দ্বারিক দত্ত হিরণের ঠাকুরদা। সেই সুবাদে তারও দাদু।
দ্বারিক দত্ত বললেন, ঝিনুক নাকি নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। তোর বাবা, সুনীতির শাশুড়ি, সবাই ওর সঙ্গে জঘন্য ব্যবহার করেছে। কিন্তু কী অপরাধ মেয়েটার?
সরস্বতী ধরা ধরা, ভাঙা গলায় বললেন, সারা জীবন দুঃখই পেল ঝিনুক। আমরা কলকাতায় থাকলে ওকে কোথাও যেতে দিতাম না। নিজেদের কাছে রেখে দিতাম।
স্তব্ধ হয়ে দুটি বৃদ্ধ মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকে বিনয়। বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। গলার কাছটা থির থির কাঁপছে। বাষ্পে ভরে যাচ্ছে দুচোখ।
এই মানুষ দুটি সম্পর্কে কত সংশয় ছিল বিনয়ের। কী নিদারুণ উৎকণ্ঠা! ভেবেছিল, ঝিনুককে দেখামাত্র দূর করে দেবেন ওঁরা। তীব্র ঘৃণায়। অপরিসীম বিতৃষ্ণায়।
বিনয় ভাবল, মাত্র কটা দিন আগে যদি দ্বারিক দত্তদের সঙ্গে দেখা হতো!
দ্বারিক দত্ত বললেন, যেমন করে পারিস মেয়েটাকে খুঁজে বার করে আমাদের কাছে নিয়ে আয়।
দুহাতে মুখ ঢেকে জোরে জোরে মাথা নাড়তে থাকে বিনয়, অনেক খুঁজেছি। ওকে পাওয়া। যাবে না।
আমার মন বলছে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। ভাল করে চেষ্টা কর–
সুধা আর হিরণ তো প্রথম থেকেই তার পাশে রয়েছে। আজ আরও দুজনকে পাওয়া গেল। সমস্ত নৈরাশ্য দুহাতে ঠেলে সরিয়ে নতুন উদ্যমে ঝিনুকের খোঁজে আবার তাকে বেরিয়ে পড়তে হবে। যদি সে বেঁচে থাকে, পৃথিবীর যে প্রান্তেই গিয়ে থাক, তাকে নিয়ে আসবে। আসবেই।
.
১৭.
খান মঞ্জিল-এর সঙ্গে রাজদিয়ার বিষয়সম্পত্তি এক্সচেঞ্জ করার যে ব্যবস্থা হিরণ করে ফেলেছে তাতে প্রথমেই রাজি হয়ে গিয়েছিলেন দ্বারিক দত্ত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অযাচিতভাবে যে সুযোগটা পাওয়া গেছে সেটা হাতছাড়া করলে বাকি জীবন আপশোশ করে কাটাতে হবে। পাকিস্তানে ফিরে যাবার আর সম্ভাবনা নেই। সেখানকার ফেলে-আসা বাড়িঘর জমিজমা পুরোপুরি বেহাত হয়ে যেত। রাজাকার বা ইন্ডিয়া থেকে চলে-যাওয়া বিহারী মুসলমানরা একবার সে-সব দখল করে বসলে কে তাদের কবল থেকে তা উদ্ধার করবে? কলকাতায় থেকে ওদের চুলের ডগাও ছোঁওয়া যাবে না। কেউ যদি দখল করে নাও নেয়, অন্যদিক থেকে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা রয়েছে। হাওয়ায় হাওয়ায় এখন একটাই গুজব ভেসে বেড়াচ্ছে। পাকিস্তান গভর্নমেন্ট খুব তাড়াতাড়িই হিন্দুদের ফাঁকা বাড়ি-টাড়ি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করবে। তাহলে সব আশায় জলাঞ্জলি। এই অবস্থায় পাকিস্তানের বাড়িঘরের বদলে যদি কলকাতায় একখানা বাড়ি পাওয়া যায়, এর চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে?
দ্বারিক দত্তর যুক্তি হল, তার তত তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। কদিন আর বাঁচবেন? কিন্তু হিরণ আর সুধার সামনে অনন্ত ভবিষ্যৎ। হিরণ ভাল চাকরি করে ঠিকই কিন্তু তার পক্ষে সংসার চালিয়ে কলকাতায় একটা বাড়ি করা কি মুখের কথা। তাঁর মতে খান মঞ্জিল নেওয়াটা খুবই বুদ্ধিমানের কাজ।
কিন্তু মুসলমানের সম্পত্তি বলে ভীষণ আপত্তি ছিল সুধা এবং হিরণের জেঠিমা সরস্বতীর। সুধাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করানো গেলেও, সরস্বতী ঘাড় বাঁকিয়ে ছিলেন। পাটনা থেকে ফিরে আসার পর দ্বারিক দত্ত, হিরণ আর বিনয় পুরো দেড় দিনের অবিরল চেষ্টায় তার মস্তিষ্কে শেষ পর্যন্ত এটা প্রবেশ করিয়ে দিতে পেরেছে যে এমন সুযোগ হেলায় হারানো ঠিক হবে না। মুসলমানের সম্পত্তি বলে দোষটা কোথায়? সম্পত্তি সম্পত্তিই। তাছাড়া শওকত আলিরা তো তাঁদের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকছেন না। অবশেষে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি মত দিয়েছেন।
কিন্তু হিরণ ছাড়া বাড়ির অন্য কেউ খান মঞ্জিল দেখেনি। অবশ্য বিনয় রাজদিয়া থেকে চলে আসার পর একদিন হিরণ তাকে বাইরে থেকে বাড়িটা দেখিয়ে এনেছিল। দ্বারিক দত্তরা দেখেননি, তার কারণ শওকত আলির সঙ্গে যখন এক্সচেঞ্জের কথা হচ্ছে সেইসময় দ্বারিক দত্ত আর সরস্বতী পাটনা চলে গেলেন। ওঁদের বাদ দিয়ে সুধা বাড়িটা দেখতে যেতে চায়নি। যা দেখার হিরণই দেখে এসেছে।
সরস্বতীকে রাজি করানোর পর দ্বারিক দত্ত বলেছিলেন, এক্সচেঞ্জ করে কেমন বাড়ি পাওয়া যাবে, সেটা একবার দেখাবি না হিরণ?
হিরণ বলেছে, নিশ্চয়ই। সে শওকত আলিকে খবর পাঠিয়েছিল, দ্বারিক দত্তরা পাটনা থেকে ফিরে এসেছেন। যেদিন তিনি এক্সচেঞ্জ করতে চাইবেন সেদিনই তা করা হবে। তবে দাদুরা একবার খান মঞ্জিল দেখতে চান। শওকত আলি যদি দেখাবার ব্যবস্থা করেন সে কৃতজ্ঞ থাকবে।
শওকত আলি তাঁর একটি লোককে দিয়ে খান মঞ্জিল-এর চাবি এবং একটা চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। চিঠিতে লেখা ছিল, চারদিন পর বিনিময়ের যাবতীয় ব্যবস্থা করে ফেলা হবে। তিনি একজন অ্যাডভোকেটকে নিয়ে হিরণদের বাড়ি আসবেন। হিরণও যেন তার উকিলকে সেই সময় থাকতে বলে। এক্সচেঞ্জের প্রক্রিয়া নিখুঁত হল কিনা দুই আইনজ্ঞ সেটা খুঁটিয়ে দেখবেন।
