বিনয়ের কথা শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন আশু দত্ত। হঠাৎ উৎসাহের সুরে বলে উঠলেন, ঠিকই বলেছিস তুই। এ-সব যে আমি ভাবিনি তা নয়। একটু থেমে ফের বললেন, আমার একটা কথা রাখবি?
উৎসুক দৃষ্টিতে আশু দত্তর দিকে তাকায় বিনয়, কী কথা স্যার?
তুই আমার সঙ্গে থাকবি? তোকে পাশে পেলে অনেকখানি ভরসা পাব। আশু দত্ত বলতে লাগলেন, একদিন হেমদাদার হাত ধরে রাজদিয়া হাই স্কুল বসিয়েছিলাম। এবার তার নাতিকে নিয়ে নতুন করে মুকুন্দপুরে শেষ জীবনটা শুরু করা যাক।
বিনয় চমকে ওঠে, কিন্তু স্যার
কী হল?
আপনাকে তো বলেছি, কলকাতায় আমি একটা চাকরি পেয়েছি। কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে জয়েন করতে হবে। আমার পক্ষে মুকুন্দপুরে থেকে স্কুল বসানোর কাজে হেল্প করা তো সম্ভব নয়। তবে
তবে কী?
বিনয় বলল, উইকে একবার নিশ্চয়ই ওখানে যাব। তখন যা বলবেন তাই করে দেব।
আশু দত্ত বললেন, মুকুন্দপুরে শেষ পর্যন্ত হয়তো যেতেই হবে। তুই সপ্তাহে একদিন এলেও অনেকখানি সাহায্য হবে।
একসময় ট্রেন শিয়ালদায় এসে গেল। সেখান থেকে বার দুই বাস ট্রাম বদলে আশু দত্তকে ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে পৌঁছে দিয়ে টালিগঞ্জে এল বিনয়।
১৬-২০. হিমঋতুর কুয়াশা
১৬.
এখন আটটার মতো বাজে। গাঢ় হয়ে নামছে হিমঋতুর কুয়াশা। উত্তুরে হাওয়া সাঁই সাঁই চাবুক হাঁকাতে হাঁকাতে শহরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে। কর্পোরেশনের টিমটিমে বাতিগুলো বড় বেশি নিস্তেজ। কুয়াশা সেগুলোকে চারপাশ থেকে ঠেসে ধরেছে।
এর মধ্যেই এলাকার দোকানপাটে ঝাঁপ পড়ে গেছে। দুএকটা পানবিড়ি আর চায়ের দোকান এবং একটা খালসা হোটেল এখনও খোলা রয়েছে। শীত-গ্রীষ্ম বারোমাস ওগুলো মাঝরাত পর্যন্ত চালু থাকে। তবে তীব্র শীতল বাতাসকে রুখে দেবার জন্য দুধারের বাড়িগুলোর দরজা-জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাস্তায় লোকজন খুব কম। মাঝে মাঝে কঁকা ড্রাম কি পাবলিক বাস ঘন্টি বাজাতে বাজাতে চলে যাচ্ছে।
বিনয় বড় রাস্তা থেকে জাফর শা রোডে চলে আসে। সুধাদের বাড়ির সদর দরজায় কিছুক্ষণ কড়া নাড়তে ওপর থেকে উমা নেমে এসে সেটা খুলে দিল। সে ভেতরে ঢুকতেই দরজায় খিল লাগাতে লাগাতে উমা বলল, দাদাবাবু, ওপরে গিয়ে দেখ, কারা এসেছে
বিনয় জিজ্ঞেস করল, কারা রে?
উমা নামটাম জানালো না। বলল, তর সইছে না বুঝি? ওপরে যাও। দেখতে পাবে।
দোতলায় আসতেই বাইরের ঘরে হিরণ এবং সুধা ছাড়া আরও দুজন চেনা মানুষের দেখা পাওয়া গেল। হিরণের ঠাকুরদা দ্বারিক দত্ত আর তার জেঠিমা সরস্বতী।
কদিন আগে হিরণ পাটনায় টেলিগ্রাম করেছিল। শওকত আলি তাঁদের টালিগঞ্জের বিষয় সম্পত্তি এক্সচেঞ্জ করে পাকিস্তানে হিরণদের বাড়িতে চলে যাবার জন্য ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছেন। হিরণরা যদি গড়িমসি করে কিংবা কোনও কারণে দেরি করে ফেলে, তিনি অন্য ব্যবস্থা করবেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে রোজ ঝুঁকে ঝাঁকে মানুষ এপারে চলে আসছে। প্রপার্টি বিনিময় করার জন্য তারা হন্যে হয়ে ঘুরছে। দালালরা রোজই এই ধরনের দুচারটে করে খদ্দেরের খবর শওকত আলির কাছে নিয়ে আসছে। তিনি দুসপ্তাহের বেশি অপেক্ষা করবেন না।
টেলিগ্রাম পেয়ে আজই যে দ্বারিক দত্তরা চলে আসবেন, ভাবতে পারেনি বিনয়। লক্ষ করল, বয়সের তুলনায় বৃদ্ধ মানুষটি অনেক বেশি শক্তপোক্ত আছেন। সরস্বতী কম করে তার চেয়ে বিশ বছরের ছোট। সবে পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। কিন্তু এর মধ্যেই অথর্ব, লুজবুজে হয়ে পড়েছেন।
সবাই মোটা পশমি চাদর জড়িয়ে বসে গল্প করছিলেন। দ্বারিক দত্তকে রাজদিয়ায় থাকতে কতবার দেখেছে বিনয়। মানুষটার এক সময় ছিল ভীষণ মজলিশি মেজাজ, হইহই করে দিন কাটাতে ভালবাসতেন। বয়স তার পুরানো স্বভাব পুরোপুরি হরণ করতে পারেনি। বিনয়কে দেখে খুব খুশি হলেন। গলার স্বর উঁচুতে তুলে বললেন, আয় আয়, আমার পাশে বো–
বিনয় দ্বারিক দত্ত আর সরস্বতীকে প্রণাম করে ওঁদের কাছাকাছি একটা চেয়ারে বসল। জিজ্ঞেস করল, কখন এসেছেন আপনারা?
দুপুরবেলায়। এসেই শুনলাম যুগলরা যেখানে কলোনি বসিয়েছে সেই মুকুন্দপুরে গেছিস। কতকাল পর যে তোকে দেখলাম–
সরস্বতীও দুর্বল স্বরে তার কথায় সায় দিয়ে বললেন, তোর আশায় পথের দিকে তাকিয়ে বসে আছি।
এই বৃদ্ধ মানুষ দুটির আন্তরিকতা বুকের ভেতরটা ছুঁয়ে গেল বিনয়ের। সে জিজ্ঞেস করল, কে আপনাদের নিয়ে এল?
দ্বারিক দত্ত জানালেন, পাটনায় যে ভাইপোর বাড়িতে গিয়েছিলেন সেই অজিত তাঁদের পৌঁছে দিয়ে সন্ধের ট্রেনে ফিরে গেছে। তার অফিসের প্রচণ্ড জরুরি কাজ। দুচারদিন যে কলকাতায় কাটিয়ে যাবে, তার উপায় নেই। বিনয়ের সঙ্গে এবার দেখা হল না বলে খুব আক্ষেপ করে গেছে অজিত। তার ইচ্ছা, বড়দিনে কলকাতায় আসবে। তখন অন্তত সপ্তাহখানেক থেকে যাবে।
এরপর মুকুন্দপুর নিয়ে কিছু কথাবার্তা হল। অনেকদিন আগে দ্বারিক দত্ত পাকিস্তান থেকে চলে এসেছেন কলকাতায়। যুগলের সব খবরই তার জানা। পূর্ব বাংলার নিরক্ষর, সামান্য এক কামলা ময়দানবের উদ্যম নিয়ে নির্জন বনভূমি সাফ করে জনপদ বানিয়েছে–এতে তিনি চমৎকৃত। আশু দত্ত কলোনিতে গিয়ে স্কুল বসাবেন, শুনে খুশি হলেন।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর জোরে শ্বাস ফেলে দ্বারিক দত্ত বললেন, ত্রৈলোক্য সেনরা, রামকেশবরা, আশু দত্তরা রাজদিয়া ফাঁকা করে সবাই চলে এল। শুধু হেমদাদা বাদ। জেনে শুনে মরণের ওষুধ কেউ কানে বাঁধে! পাকিস্তানে কেউ থাকতে পারবে না, এই বোধবুদ্ধিটুকু পর্যন্ত নেই!
