বিনয় সম্বন্ধে কিছু লেখা হল না। কেননা, কিছুদিন আগে যুগল প্রথম যেদিন তাকে মুকুন্দপুর নিয়ে আসে সেদিনই হরনাথের খাতায় তার নাম উঠে গিয়েছিল।
লেখালেখি শেষ হলে বিনয়রা উঠে পড়ল। আর দেরি করা যাবে না। মুকুন্দপুরবাসীরা কলোনির সীমান্ত পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দিয়ে গেল। তবে যুগল আর পতিতপাবন সঙ্গ ছাড়ল না, আগরপাড়া স্টেশনে গিয়ে ওদের কলকাতার ট্রেনে তুলে দিল।
.
১৫.
কিছুক্ষণ হল সন্ধে নেমেছে।
শীতের কুয়াশা আর অন্ধকার ভেদ করে ট্রেন কলকাতার দিকে ছুটছে উধ্বশ্বাসে।
বিনয়দের কামরাটার দরজা-জানালা সব বন্ধ। কেননা বাইরে প্রবল প্রতাপে উত্তরে বাতাস বয়ে চলেছে। একটু ফাঁকফোকর পেলেই ভেতরে হানা দিয়ে হাড়মজ্জা কাঁপিয়ে দেবে।
সন্ধের দিকে ডাউন ট্রেনগুলোতে ভিড় থাকে না বললেই হয়। বিনয়দের কামরাটা প্রায় ফাঁকাই। দশ বারোটি প্যাসেঞ্জার এধারে ওধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে।
একটা বন্ধ জানালার পাশে মুখোমুখি বসে ছিল বিনয় আর আশু দত্ত। ট্রেনে ওঠার পর থেকেই বিনয় লক্ষ করেছে, আশু দত্ত কেমন যেন চুপচাপ। গভীর কোনও চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছেন।
দুতিনটে স্টেশন পেরিয়ে যাবার পর আশু দত্ত বললেন, বুঝলি বিনু, একটা কথা তখন থেকে ভাবছি।
বিনয় উৎসুক চোখে তার প্রাক্তন মাস্টারমশায়টির দিকে তাকায়। কোনও প্রশ্ন করে না।
আশু দত্ত বলতে থাকেন, যুগলরা আমার মাথায় এত বড় গুরু দায়িত্ব চাপিয়ে দিল। নাও বলতে পারলাম না। কিন্তু আমি কি পারব?
এই মানুষটিই একদিন বিপুল উৎসাহে হেমনাথ আর মোতাহার হোসেন চৌধুরির সঙ্গে যৌথভাবে রাজদিয়া হাই স্কুল গড়ে তুলেছিলেন। শুধু তাই না, সেটা পূর্ব বাংলার একটা সেরা শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কত ভাল ভাল ছেলে যে তার হাত দিয়ে বেরিয়ে সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে, দিকে দিকে রাজদিয়া হাই স্কুলের নাম তারা উজ্জ্বল করেছে, তার লেখাজোখা নেই। দিবারাত্রি কী প্রচণ্ড পরিশ্রমই না তিনি করতেন! আজ দুপুরে ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে গিয়ে যুগল যখন তাঁকে মুকুন্দপুরে স্কুল বসাবার কথা বলল তখনও তার কী উদ্দীপনা! খানিক আগে কলোনির বাসিন্দারা স্কুলের জন্য যখন কাকুতি মিনতি করছিল তখনও আপত্তি করেননি। কিন্তু স্কুলের জায়গা দেখা হয়ে গেছে, তাঁর ঘরবাড়ির ব্যবস্থা হয়েছে। নিজের চোখে সব দেখে আসার পরও হঠাৎ এখন তাকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে। এবং কিছুটা দ্বিধান্বিত।
বিনয় বেশ জোর দিয়ে বলল, নিশ্চয়ই পারবেন স্যার। রাজদিয়া হাই স্কুলের মতো অত বড় স্কুল করতে পেরেছেন। কলোনির ছোট একটা প্রাইমারি স্কুল বসানো কি আপনার পক্ষে কঠিন ব্যাপার?
আশু দত্ত বললেন, তখন আমার কত আর বয়েস! তরতাজা ইয়াং ম্যান। এখন আমি বৃদ্ধ।
কিন্তু আপনি তো স্যার, কদিন ধরে কাজের জন্যে স্কুলে স্কুলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর
বিনয় কী বলতে চায়, আঁচ করতে পারছিলেন আশু দত্ত। তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, কয়েক ঘণ্টার জন্যে কোথাও গিয়ে পড়িয়ে আসা, আর একটা স্কুল বসানো, সেটা যত ছোটই হোক, কি এক কথা হল? একটু চুপ করে থেকে আবার বললেন, আমার সেই বয়েসের এনার্জি, কর্মশক্তি কি আর আছে? তাছাড়া, রাজদিয়ায় আমার সঙ্গে কারা ছিলেন? হেমনাথদাদা, মোতাহার হোসেন সাহেব। তেমন মানুষ এখানে কোথায় পাব? যা করার নিজেকে একাই করতে হবে।
আশু দত্তর দ্বিধাটা অকারণে নয়। বিনয় কী জবাব দেবে, ভেবে পায় না।
আশু দত্ত বলতে লাগলেন, পার্টিশান হল। ভাইটা ঢাকায় খুন হয়ে গেল। ভিটেমাটি ফেলে, সর্বস্ব হারিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে এলাম। মনের জোরও অনেকখানি নষ্ট হয়ে গেছে বিনু। মানসিক শক্তি না থাকলে ধুকে ধুকে কোনওরকমে বেঁচে থাকা হয়তো যায় কিন্তু বড় কিছু গড়ে তোলা কি সম্ভব?
বিনয় বলল, যুগলরা বড় আশা করে আছে স্যার। একটু সাহস করে শুরু করে দিন। একবার কাজে ডুবে গেলে দেখবেন, পুরানো কষ্ট ভুলে গেছেন। কাজটাই আপনার এনার্জি ফিরিয়ে আনবে।
একটু চুপ।
তারপর বিনয় ফের বলে, কলকাতার স্কুলে চাকরি পাবেন কি না, ঠিক নেই। টিউশন করে টাকা নেওয়াটা আপনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন। আপনি নিজেই বলেছেন, সন্তোষবাবুদের অবস্থা এমন নয় যে চিরকাল ওঁদের কাছে থাকতে পারবেন। তাহলে?
ধীরে ধীরে মাথা নাড়েন আশু দত্ত, হ্যাঁ। এ-সব খুবই চিন্তার ব্যাপার।
সামনের দিকে ঝুঁকে গভীর আগ্রহে বিনয় বলে, মুকুন্দপুরের লোকজন সকলেই আপনার চেনাজানা। সে বোঝাতে থাকে, ওখানে গিয়ে থাকলে দেশের পরিবেশটাই পুরোপুরি পেয়ে যাবেন আশু দত্ত। যুগলরা তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করে। তাঁর সমাদরের অভাব হবে না।
আশু দত্ত বললেন, তা আমি জানি। যুগলও এই কথাই বলেছে।
ব্যাকুলভাবে বিনয় বলে, স্যার, দ্বিধা করবেন না। স্কুলটা গড়ে তুলুন। সে আরও বলে, ইউনিভার্সিটি থেকে বেরুবার পর রাজদিয়া হাই স্কুল বসানো দিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন আশু দত্ত। পরমায়ু যখন শেষ হয়ে আসছে, সেই সময় সর্বহারা ছিন্নমূল মানুষগুলির সন্তানদের দায়িত্ব তিনি তুলে নিন। তাঁর জীবনের বৃত্ত এতে সম্পূর্ণ হবে। যৌবনের শুরু থেকে তিনি যা করতে চেয়েছেন, যা নিয়ে মগ্ন থেকেছেন, মুকুন্দপুরের উপনিবেশে তা সার্থক হয়ে উঠবে।
