অন্য দিকে বিলের পাড় ঘেঁষে যে উদ্দাম কচুবন ছিল সেটার গায়ে হাত পড়েনি। কত ধরনের যে কচু তার লেখাজোখা নেই। পানিকচু, মানকচু, শোলাকচু, লতিকচু, খারকন। সমস্ত অটুট রয়েছে। মুকুন্দপুরবাসীদের কাছে এইসব কচু বিরাট বলভরসা, মস্ত খাদ্যভাণ্ডার। অন্য তরিতরকারি না জুটুক, ভাতের সঙ্গে কচুর একটা পদ পেলে দিনের পর দিন কেটে যাবে।
জঙ্গল নির্মূল করে প্রায় আধ মাইলের মতো জমি বার করা হয়েছে। আশু দত্ত আর বিনয়কে সঙ্গে করে যুগলরা সেখানে চলে এল। বউ-ঝিরা কেউ আসেনি। তবে কলোনির অল্পবয়সী ছেলের পাল ফেউয়ের মতো পেছনে লেগে রয়েছে।
যুগল বলল, বুঝলেন নি মাস্টর মশয়, বুঝলেন নি ছুটোবাবু, সুমখের দিকে আমাগো কুলোনির বাঘির যেইখানে তুলছি হেইখানকার জঙ্গল সাফ করতে তেমুন কষ্ট হয় নাই। কিন্তু এই দিকের বন কাটাতে জবর তাফালে (বিপদে) পড়ছিলাম।
বিনয় জিজ্ঞেস করে, কেন?
যুগল জানায়, সারা বনভূমিতেই সাপ রয়েছে, কিন্তু এই জায়গাটাতেই ছিল সব চাইতে হিংস্র, সব চাইতে বিষধর সাপেদের আসল আস্তানা। কত যে গর্ত, তার হিসেব নেই।
যুগল বলতে লাগল, জঙ্গলে সাইন্দা (ঢুকে) গাছে যেই কোপ মারি, এক এক গাদ (গর্ত) থিকা দশখান কইরা সাপ বাইর হইয়া ল্যাজে ভর দিয়া খাড়য়। কী লোখ হালার পুতেগো! সাপ না তো সাক্ষাইত যম। পতিতপাবন দাদায় একদিন তো ছোবল খাইতে খাইতে বাচছে। কম কইরা দ্যাড় দুই শ জাতি সাপ নিপাত করছি।
আশু দত্ত অবাক। বললেন, বলিস কী রে, এত সাপ!
পাশের বিপুল জলাশয়টা দেখিয়ে যুগল বলল, বিলান (বিল অঞ্চলের) জাগা, বচ্ছরের পর বচ্ছর পইড়া আছিল। সাপের বসত হইব না? আর হুদা কি সাপ, বাঘডাসা আর ভামই তো মারছি বিশ তিরিশটা। আর মারছি শ্যাজা (শজারু)। হেও পনরা ষোলটা। শ্যাজার মাংসের বড় সোয়াদ। আমরা কুলোনির মানুষ হেই মাংস ভাগ কইরা লইয়া খাইছি। শিয়ালও আছিল ম্যালা। নতুন করে যে জঙ্গল কাটা হয়েছে, তারপরেও রয়েছে বিপুল বনভূমি। সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে যুগল বলল, শিয়ালগুলানরে মারণ যায় নাই। হালারা জবর চালাক। উই দিকের জঙ্গলে পলাইয়া গ্যাছে।
একটু চুপচাপ।
তারপর যুগল ফের বলে, গাছগাছালি না কাটলে, জন্তু-জাওনার (জানোয়ার) সাপখোপ মাইরা শ্যাষ না করলে মানুষ থাকব কই? বডারের উই পার থিকা যত মানুষ আইব, এই পারের বনজঙ্গল, পশুপক্ষী তত নিব্বংশ হইব।
ধীরে ধীরে মাথা নাড়েন আশু দত্ত, হ্যাঁ, মানুষ বড় স্বার্থপর জীব।
হরনাথ বলল, উই হগল কথা থাউক। মাস্টর মশয়, বিনয়বাবু, আপনেরা নিজেগো জমিন পছন্দ কইরা লন। যেই জাগা দেহাইবেন, হেই জাগাই আপনেগো দিমু।
যুগল এবং অন্য সবাই যারা সঙ্গে এসেছিল, সমস্বরে হরনাথের কথায় সায় দেয়।
বিনয় বুঝতে পারছিল, যুগলরা কোনও রকম আপত্তি কানে তুলবে না। মুকুন্দপুরের জমি নিতেই হবে। বলল, আমি আর কী পছন্দ করব? যা দেওয়া হবে তাই নেব।
আশু দত্তও একই কথা বললেন।
অগত্যা যুগলরাই অনেক দেখেটেখে দক্ষিণ দিকের সব চাইতে সেরা জমি বেছে দিল। জানালো, সবে জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন ধুধু ফাঁকা মাঠ। পরে পাশাপাশি সাত কাঠা করে জমি মেপে বাঁশের খুঁটি পুঁতে সীমানা ঠিক করে দেবে। দুজনের ঘরবাড়ির জন্য জমি বাছার পর স্কুলের জন্য অনেকখানি জায়গা দেখে রাখা হল।
জমি বাছাবাছি করতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছে। সূর্য পশ্চিম আকাশের গা বেয়ে এর ভেতর আরও অনেকখানি নেমে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ওটা দিগন্তের তলায় অদৃশ্য হয়ে যাবে। বাতাসে হিমকণা মিশতে শুরু করেছে আরও বেশি করে। গাছপালার মাথায় শীতের মরা মরা রোদ আবছাভাবে লেগে আছে।
আকাশের দিকে এক পলক তাকিয়ে বিনয় চঞ্চল হল, কাজ তো মিটে গেল। এবার আমরা কলকাতায় ফিরব।
কিন্তু হরনাথ তাদের এত সহজে ছাড়ল না। বলল, আর সামাইন্য এটু কাম আছে। দশ মিনিটও লাগব না। হের পর যাইয়েন গা–
কী কাজ?
আহেন আমার লগে।
হরনাথ বিনয় আর আশু দত্তকে মুকুন্দপুর বাস্তুহারা কল্যাণ সমিতির অফিসে নিয়ে এল। অফিস আর কি। কাঁচা বাঁশের বেড়া, মাটির মেঝে। মাথায় টালির চাল। একধারে পুরনো আধভাঙা আলমারি। মাঝখানে সস্তা টেবল, কটা নড়বড়ে চেয়ার। বেড়ার গায়ে বাংলা-ইংরেজি মেশানো ক্যালেন্ডার। তাছাড়া বরেণ্য দেশনেতাদের কটা ছবি ঝুলছে। দেশবন্ধু, নেতাজি, গান্ধিজি, রবীন্দ্রনাথ।
ভিড়টা সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল। যুগল, হরনাথ, আশু দত্ত আর বিনয় ছাড়া বাকি সবাই অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
বিনয় আর আশু দত্তকে চেয়ারে বসিয়ে আলমারি থেকে মোটা খাতা বার করে হরনাথ মুখোমুখি বসল। তারপর সেটা খুলে একটা পাতায় খোপকাটা ঘরে আশু দত্তর নাম, বাবার নাম, দেশের বাড়ির ঠিকানা, কোন তারিখে বর্ডার পেরিয়ে ইন্ডিয়ায় এসেছেন, ইত্যাদি টুকে নিয়ে তলায় লিখল : রাজদিয়া হাই স্কুলের প্রাক্তন অ্যাসিস্টান্ট হেড মাস্টার শ্রীযুক্ত আশুতোষ দত্ত মহাশয়কে মুকুন্দপুর উদ্বাস্তু কলোনিতে বসবাসের উপযোগী সাত কাঠা জমি দেওয়া হইবে। ইহা ছাড়া বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বাবদ স্বতন্ত্রভাবে এক বিঘা জমিও তাঁহাকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছে।
এ-সব লেখার পর আশু দত্তকে নিয়ে সই করিয়ে নেওয়া হল।
হরনাথ মানুষটা দূরদশী। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে মুকুন্দপুরের বাসিন্দাদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সুশৃঙ্খলভাবে লিখে রাখছে। তার ধারণা, পরে সরকারের কাছে এগুলো পেশ করে আবেদন জানালে নিশ্চয়ই অনেক সুযোগ সুবিধা পাওয়া যাবে। তার কাজে এতটুকু খুঁত নেই।
