আশু দত্ত এবং বিনয় হেসে হেসে জানান, অবেলায় খাওয়ার অভ্যাস তাঁদের নেই। কিছুক্ষণ আগে দুপুরের খাওয়া সেরে এসেছেন। পেটের ভাত হজম হয়নি। এখন খেলে শরীর খারাপ হবে। কেউ যেন কিছু মনে না করে।
এর ওপর কোনও কথা নেই। সকলে চুপ করে থাকে। পাখি আর যুগলের মুখ ম্লান হয়ে যায়। সবচেয়ে মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে তারা।
একসময় ভিড়ের ভেতর থেকে আশু দত্তকে লক্ষ করে একের পর এক প্রশ্ন ভেসে আসতে থাকে। দেশের, বিশেষ করে রাজদিয়া এবং তার চারপাশের লোকালয়গুলোর এখনকার খবর তারা জানতে চায়। মুকুন্দপুরবাসীরা অনেকদিন আগেই পাকিস্তান ছেড়ে চলে এসেছে। এখন সেখানে কী চলছে, অবস্থা কতখানি আতঙ্কজনক, এর মধ্যে কারা কারা ভিটেমাটি ফেলে চলে গেছে, কারা কারা এখনও পড়ে আছে, ইত্যাদি নানা ব্যাপারে তাদের অনন্ত কৌতূহল। পৃথিবীর সেই ভূখণ্ডে আর কোনওদিনই যাদের ফেরা হবে না, তবু তাদের ছত্রিশ নাড়িতে এখনও তা জড়িয়ে রয়েছে।
যুগল অসহিষ্ণু সুরে বলে, যে-ই কুলোনিতে আহে দ্যাশের কথা হোননের (শোনার) লেইগা হেরে ছাইকা (হেঁকে) ধরে। পাকিস্থানের গতিক যদিন ভালাই হইব, মাস্টর মশয় কি চইলা আইতেন? দ্যাশ ট্যাশ ভুইলা যাও। অহন কামের কথা হোনো (শোন)। ক্যান আইজ কইলকাতায় গিয়া হাতে পায়ে ধইরা ছুটোবাবুর লগে মাস্টর মশয়রে কুলোনিতে লইয়া আইছি, হেয়া (তা) তো তুমরা জানো।
সবাই মাথা ঝাঁকায়–জানে।
মাস্টর মশয়রে হেই কথাহান কইছি।
তেনি কী কইছেন?
কলোনির বাচ্চাকাচ্চা কিশোরকিশোরীরা ভিড়ের ভেতর ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে ছিল। জনতার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে যুগল আশু দত্তকে বলল, এই পোলামাইয়াগুলানের ভার আপনেরে নিতেই হইব মাস্টর মশয়। লিখাপড়ি না শেখলে ইন্ডিয়ায় অগো জনম বেবাক আন্ধার। হঠাৎ মুখটা কাঁচুমাচু করে বলতে থাকে, তয় একখান কথা। পথের ভিখারি হইয়া ইন্ডিয়ায় আইছি। কুনোরকমে বাইচা আছি। আমাগো ক্ষ্যামতা আরা কতটুক? ট্যাহাপহা (টাকা পয়সা) বেশি দিতে পারুম না। আপনের আর আপনের মায়ের খাওন-পরনের কষ্ট না হয়, হেইটা আমরা দেখুম
অদ্ভুত এক ঢল-নামানো আবেগে বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল আশু দত্তর। কোনও অদৃশ্য ডানায় ভর করে তিনি ফিরে যেতে লাগলেন পঁয়তাল্লিশ বছর আগের দিনগুলোতে। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে আসার পর মোতাহার হোসেন আর হেমনাথের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গড়ে তুলেছিলেন রাজদিয়া হাইস্কুল। স্বপ্ন দেখতেন দেশের মুক্তি বেশি দূরে নয়। ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারতের জন্য জাতি গঠনের কাজে বিভোর হয়ে থাকতেন। সে-সব দিনে কী বিপুল উন্মাদনা তার। ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে যুগল তাঁর যুবা বয়সের সেই উদ্দীপনার কিছুটা ফিরিয়ে দিয়েছিল; এই মুহূর্তে পুরোটাই।
যুগল বলছিল, একখান কথা ভাইবা রাখছি মাস্টর মশয়। অহনও কেওরে কই নাই। কইলকাতা থিকা অ্যাদূরে রোজ আহন-যাওনে শরীল নষ্ট, সোময় নষ্ট। আপনেরে আমাগো এইখানেই থাকতে হইব।
আশু দত্ত অবাক। এখানে কোথায় থাকব?
হেই চিন্তা আমাগো। ছুটোবাবু এইখানে জমিন লইতে রাজি হইছে। আপনেরে হুদা (শুধু) জমিনই না, ঘরও বানাইয়া দিমু।
কিন্তু
আশু দত্তকে শেষ করতে দিল না যুগল। প্রবল বেগে মাথা ঝাঁকিয়ে বলতে লাগল, আপনের কুনো আপত্ত হুনুম (শুনম) না, হুনুম না, হুনুম না। আমাগো পোলামাইয়াগুলানরে মানুষ কইরা দিতেই হইব
বাকি সবাই তুমুল হইচই বাধিয়ে সায় দেয়, মাস্টার মশাইয়ের কোনও আপত্তিই গ্রাহ্য করা হবে না। মুকুন্দপুরবাসীরা রাজদিয়া এবং তার চারপাশের অঞ্চল থেকে এসেছে। আশু দত্তর চিরপরিচিত। একান্ত আপনজন। মাস্টার মশায়কে তারা অসীম শ্রদ্ধায়, নিবিড় মমতায় ঘিরে রাখবে।
হাত তুলে সবাইকে থামাতে থামাতে আশু দত্ত বললেন, আগে আমার কথাটা বলতে দে।
কী ভেবে যুগলরা বলল, ঠিক আছে। কন—
আমি সন্তোষের কাছে উঠেছি। সে আমার আশ্রয়দাতা। তার মতামত না নিয়ে আসি কী করে?
যুগল বলে, যত ইচ্ছা তেনির লগে কথা কন, তেনির মতামত লন (নিন)। কিন্তুক মুকুন্দপুরে আপনেরে আইতেই হইব। ছাড়ন ছাড়ন নাই।
যুগলের মধ্যে সরল অবুঝ একগুঁয়ে একটি বালক রয়েছে। তার কাঁধে জেদ চাপলে সেটি না করা পর্যন্ত যেন শান্তি নেই। আশু দত্ত হেসে ফেললেন।
যুগল আকাশের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বেইল (বেলা) পইড়া গ্যাছে। ইট্ট পরেই সন্ধ্যা নামব। দুটোবাবু, মাস্টর মশয়, লন আপনেগো জমিন দ্যাহাইয়া আনি। হের লগে কুনহানে ইস্কুল বহাইবেন হেই জাগাখানও। দ্যাহেন আপনেগো পছন্দ হয় কি না—
শীতের বিকেল দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। রোদ এখন আরও নিস্তেজ। বাতাস আরও কনকনে। দেখতে দেখতে আঁধার নেমে যাবে। জমি দেখে তিন সাড়ে-তিন মাইল হেঁটে আগরপাড়া স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরতে হবে। আর দেরি করা ঠিক নয়। আশু দত্ত এবং বিনয় চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল।
আগে একদিন যুগলের সঙ্গে মুকুন্দপুরে এসে কলোনির সীমানা অবধি বিনয় দেখে গিয়েছিল, তারপর থেকে ছিল চাপ-বাঁধা ঘন জঙ্গল। ঝোপঝাড়, ডালপালা ছড়ানো বিশাল বিশাল সব প্রাচীন বনস্পতি আর কত ধরনের যে বুনো লতা। সেই জঙ্গলের অনেকটাই এর ভেতর সাফ করে ফেলা হয়েছে। একধারে পাহাড়ের মতো উঁই হয়ে পড়ে আছে গাছের মোটা মোটা গুঁড়ি, শাখাপ্রশাখা আর কাঁটাঝোপ এবং লতাপাতা।
