দুপুরবেলার মহাযুদ্ধের বিবরণ দেবার পর দক্ষিণ দিকে আঙুল বাড়িয়ে দেয় হরনাথ, উই দ্যাহেন, হালার পুতেরা আমাগো একেবারে ছাড়ে নাই। অনেকখানি ক্ষতি কইরা দিয়া গ্যাছে।
মুকুন্দপুর কলোনির ইতিহাস ভূগোল সবই বিনয়ের জানা। কোথায় কে ঘর তুলেছে, আগের দিনই দেখে গিয়েছিল। সমস্ত মনে আছে। চোখে পড়ল, বিলের এধারে যুগলের খুড়শ্বশুর কানাই দাস আর পিসশ্বশুর নবীন দাসের আধপোড়া বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
হরনাথ বলতে লাগল, শুয়োরের ছাওরা উই দুই ঘরে আগুন ধরাইয়া দিছিল। আমরা হগলে মিলা নিভাইছি।
একটু চুপচাপ।
তারপর যুগল হেসে আশু দত্তকে বলল, ছুটোবাবু আমাগো কথা বেবাক জানে। আপনেও। হোনলেন (শুনলেন)। দ্যাশ থিকা আইয়া এইভাবে যুধু কইরা বাইচা আছি মাস্টর মশয়–
আশু দত্ত অপার বিস্ময়ে সব শুনে যাচ্ছিলেন। দেশে থাকতেই তিনি খবর পেয়েছিলেন, সাতপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়ে এপারে এসে উদ্বাস্তুদের প্রায় সবাই রাস্তায়, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কিংবা ত্রাণশিবিরে ধুকে ধুকে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাদের সংকটের, তাদের কষ্টের অবধি নেই। এটাকেই তারা ললাটলিপি ধরে নিয়েছে। কিন্তু তারই স্বদেশবাসী এই মানুষগুলো–এই যুগল, এই পতিতপাবন, এই পাখিদের দলটা হার মানেনি। পলকের জন্য এটাকে ভাগ্যের মার ভেবে হাত পা গুটিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবার জন্য বসে থাকেনি। পশ্চিম বাংলার সুদূর এই ভূখণ্ডে বিপুল পরিশ্রমে, প্রচণ্ড বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে, পূর্ব বাংলার আদলে একটা জনপদ গড়ে তুলছে।
পাকিস্তান থেকে ইন্ডিয়ায় পা দিয়ে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন আশু দত্ত। হতাশ। ভবিষ্যতের চিন্তায় বিপর্যস্ত। কিন্তু ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে যুগলের সঙ্গে কথা বলে মুষড়ে পড়া ভাব অনেকটাই কেটে গিয়েছিল। যুগল তার মধ্যে বিলীয়মান উদ্দীপনাকে উসকে দিয়েছে। মুকুন্দপুরে এসে তিনি আপ্লুত। এখানকার মানুষজন তার একান্ত পরিচিত। চোখের সামনে অগুনতি চেনা মুখের সারি। এইসব নিরক্ষর, যুদ্ধরত, জেদি নারীপুরুষেরা তার কাছে যেন হাজারটা উজ্জ্বল আলো জ্বেলে। দিয়েছে।
এদিকে যুগল ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ম্যালা (অনেক) কথা হইছে। তুমরা কেও মাস্টর মশয় আর ছুটোবাবুর লেইগা হাত-পাও ধোওনের জল আইনা দাও। পাখিকে বলল, নয়া যে দুইখান গামছা কিনা আনছিলাম, দিয়া যা। তেনারা মুখটুখ মুছব। হের পর চা বানাইয়া লইয়া আয়। মনে কইরা বিস্কুট আর মিঠাইও আনিস।
যুগল ঠিকই করে রেখেছিল, যেভাবেই হোক আশু দত্ত এবং বিনয়কে আজ এখানে নিয়ে আসবে। প্রবল আত্মবিশ্বাস তার। সে জানে, তার মুখের ওপর ওঁরা না বলতে পারবেন না। আগে থেকে তাই আপ্যায়নের বন্দোবস্ত করে রেখেছে। নিজেদের ব্যবহার করা জিনিস তো আশু দত্তদের মতো মানুষদের দেওয়া যায় না। তাই আগরপাড়ার বাজার থেকে কাল নতুন একজোড়া গামছা, সন্দেশ, দানাদার আর ভাল বিস্কুট কিনে এনে রেখেছিল।
আগে বিনয় যখন মুকুন্দপুরে আসে, কাছের বিল থেকে বালতি করে হাতমুখ ধোবার জল এনে দিতে চেয়েছিল যুগল। বিনয় রাজি হয়নি। ভীষণ অস্বস্তি বোধ করেছিল। আজও প্রবল আপত্তি জানায় সে। আশু দত্তও জোরে জোরে মাথা নেড়ে জল আনতে বারণ করলেন। কেউ জল টেনে এনে দেবে আর তিনি হাত-পা ধোবেন, এটা হয় না। তাছাড়া, তিনি এমন অথর্ব হয়ে পড়েননি যে আড়াই শ হাত দূরের বিল পর্যন্ত যেতে অসুবিধা হবে।
হঠাৎ বিনয়ের খেয়াল হল, হানাদারদের সঙ্গে লড়তে গিয়ে যাদের চোট লেগেছে তাদের ডাক্তার দেখানো দরকার। সে বলল, চাটা পরে হবে। যাদের জখমটা বেশি তাদের এক্ষুনি আগরপাড়ার ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়া দরকার।
ব্যাপারটা প্রায় তুড়ি মেরেই উড়িয়ে দিল যুগল, এইখানে কারও শরীল ননী-মাখম দিয়া বানাইনা (বানানো) না। ইটু আধটু চোট লাগছে, দুই চাইর ফোঁটা রক্ত পড়ছে, হেইর লেইগা ডাক্তরের বাড়িত লৌড়াইতে (দৌড়তে) হইলে তো গ্যাছি, দুব্বা ঘাস ছেইচা রস লাগাইয়া দিলে রক্ত বন্দ হইয়া যাইব। ঘাও হইব না। লাঠির বাড়ি খাইয়া যাগো ড্যানা (হাত), কপাল কি পাও ফুইল্যা গ্যাছে, চুনা-হলদি গরম কইরা লাগাইয়া দিলে তাগো টাটানি আর ফুলা এক রাইতেই কইমা যাইব।
তড়িৎগতিতে ছুটে গিয়ে গামছা নিয়ে এল পাখি। যুগল বলে, আপনেরা তো জল আনতে দিবেন না। লন বিলে যাই
বিলের নারকেল গুঁড়ির ঘাটলায় এসে, অনেকখানি ঝুঁকে টলটলে ঠাণ্ডা জল সারা মুখে ছিটোতে লাগলেন বিনয় আর আশু দত্ত। কুলকুচো করলেন। পায়ের চেটো থেকে হাঁটু পর্যন্ত ভাল করে ডলে ডলে ধুয়ে নিলেন। যুগল জোড়া গামছা নিয়ে কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে দুটো চেয়ে নিয়ে হাতমুখ মুছে জুতো পায়ে দিয়ে দুজনে ফের চত্বরে এসে বসলেন।
ভিড়টা এখনও জমাট বেঁধে আছে। বিনয় আর আশু দত্তকে পেয়ে কেউ নড়তে চায় না।
যেভাবে পাখি গামছা দিয়ে গিয়েছিল সেই গতিতেই চা এবং মিষ্টি টিষ্টি নিয়ে এল। তার গায়েও লাঠির বাড়ি কি সড়কির খোঁচা-টোচা লেগেছে। কিন্তু সে-সব গ্রাহ্যই করছে না মেয়েটা। তার হাতে পায়ে যেন বিজলি খেলে যাচ্ছে। সম্মানিত অতিথিদের আপ্যায়নে এতটুকু ত্রুটি হতে দেবে না সে।
এত মানুষের সামনে বসে খেতে ঠিক স্বস্তি বোধ করছিলেন না আশু দত্ত আর বিনয়। শুধু চা আর একটা করে বিস্কুট তুলে নিলেন তারা। সন্দেশ আর দানাদার নেবার জন্য কাকুতি মিনতি করতে লাগল যুগল। যদিও সে মান্য অতিথিদের মিষ্টিমুখের আয়োজন করেছে, মুকুন্দপুরবাসীরা সবাই হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের একই সনির্বন্ধ অনুরোধ।
