বিনয় এবং আশু দত্ত, দুজনেই উৎকণ্ঠিত। কী হতে পারে, মোটামুটি আঁচ করে নিয়েছিল বিনয়। তবু জিজ্ঞেস করে, কারা এসেছিল? কীসের ঝঞ্ঝাট?
যুগল বলে, হগল হুইনেন। অতখানি পথ হাইটা আইসা হয়রান হইয়া পড়ছেন। হাত-পাও ধুইয়া চা-মিঠাই খাইয়া আগে জিরাইয়া লন (নিন)। হের পর হুনামু।
বিনয় জোরে জোরে মাথা নাড়ে, না, আগে বল।
আশু দত্তও সায় দেন। তিনি রীতিমতো হকচকিয়ে গেছেন। হয়তো একটু ভয়ও পেয়েছেন। সব না শোনা পর্যন্ত তার উদ্বেগ কাটছে না।
হট্টগোল আগেই থেমে গিয়েছিল। কলোনির বউ-ঝিদের সেই অগ্নিমূর্তি আর নেই। কুমারী মেয়েরা ছাড়া সধবা বিধবা সবাই কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টেনে দিয়েছে। বউগুলো ফের আগের মতোই গৃহলক্ষ্মী। ক্ষণিকের রণং দেহি ভাবটা নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
বিনয় তবু আগে এসেছে। কিন্তু রাজদিয়ার শ্রদ্ধেয়, দাপুটে মাস্টার মশাইটি যে এতদূরে তাদের কলোনিতে চলে আসবেন, মুকুন্দপুরবাসীদের কাছে এ ছিল স্বপ্নেরও অতীত। যুগল শুরু করার আগে তার পায়ে মাথা ঠেকাবার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। পা দুটো গুটিয়ে হাতজোড় করে আশু দত্ত বলেন, সবার প্রণাম আমি নিলাম। পায়ে হাত দিতে হবে না। যুগলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার তুই বল
কী ভেবে যুগল বলল, দুফারে আমি তো কুলোনিতে আছিলাম না। আপনেগো জানতে কইলকাতায় গ্যাছিলাম। হরনাথ দাদায় আইজ আপিসে যায় নাই। জ্বর হইছে। কুলোনিতেই আছিল। আমার থিকা তেনিই ভালা কইতে পারব। ভিড়ের একধারে দাঁড়িয়ে ছিল হরনাথ কুণ্ডু। তাকে বলল, আপনে কন।
হরনাথ সবিস্তার বিবরণ দিয়ে গেল। যেখানে কলোনি বসানো হয়েছে সেখানে আগে ছিল। আলিসান জঙ্গল। সাপটাপ মেরে সেই জঙ্গল সাফ করে জনপদ গড়ে তোলা হল।
জায়গাটা জমিদার পালচৌধুরিদের। ব্যাপারটা তারা সুনজরে দেখেননি। সর্বস্ব খুইয়ে সীমান্তের ওপার থেকে চিরতরে এসে যে দুঃখী দিশেহারা মানুষগুলো পরিত্যক্ত, অকেজো জঙ্গল নির্মূল করে মাথা গোঁজার মতো কাঁচা বাঁশের বেড়া আর টিন কি টালি দিয়ে চালাঘর বানিয়ে নিয়েছে, তা মেনে নেবার মতো মহানুভবতা তাদের অন্তত নেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এমন কি কেউ আছে যে বিঘত পরিমাণ ভূখণ্ডের স্বত্ব ছাড়তে চায়? কলোনি যখন পত্তন হচ্ছে তখন থেকেই হানাদার বাহিনী পাঠিয়ে মুকুন্দপুরের বাসিন্দাদের উৎখাত করার চেষ্টা করে চলেছেন পালচৌধুরিরা। উদ্বাস্তুরাও জবর দখল ছাড়বে না। এই নিয়ে কবছর ধরে সমানে লড়াই চলছে। জমিদারের সশস্ত্র বাহিনী মাঝে মাঝেই মধ্যরাতে এসে হানা দেয়। তাদের হয়তো ধারণা, সবাই যখন ঘুমে বেহুঁশ থাকে সেইসময় ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে সমস্ত ছারখার করে দেবে। কিন্তু মুকুন্দপুরবাসীরা ভীষণ সতর্ক। পালা করে রাত জাগে। তাদের চোখ কান নাক–সমস্ত ইন্দ্রিয় খুবই সজাগ। অনেকটা বুনো জন্তুর মতো তারা সর্বক্ষণ বলবান প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাবার জন্য প্রস্তুত। দূর থেকে শত্রুর গন্ধ পেলে তারা আকাশ বাতাস ফেড়ে ধ্বনি দিতে থাকে, কালী মাঈকি জয়
এখানকার প্রতিটি ঘরই দুর্গ। প্রতিটি ঘরই অস্ত্রভান্ডার। শত্রুর সঙ্গে যুঝবার জন্য মজুদ করা রয়েছে ছ্যান দা, রামদা, বল্লম, সড়কি, বয়রা বাঁশের মজবুত লাঠি, শাবল ইত্যাদি। পরিচিত সেকেলে সব মারণাস্ত্র।
কালী মাঈকি জয় শোনার সঙ্গে সঙ্গেই পলকে জেগে ওঠে কলোনির পুরুষেরা। তারপর লাঠি দা সড়কি নিয়ে রে রে করে বেরিয়ে আসে। এইভাবে বহুবার মুকুন্দপুরে নৈশযুদ্ধ হয়ে গেছে। দুপক্ষে জখমও হয়েছে কম নয়। কিন্তু পালচৌধুরিরা তাদের এক ইঞ্চি জমিও উদ্বাস্তুদের দখল থেকে উদ্ধার করতে পারেননি।
এতদিন আক্রমণটা হচ্ছিল রাতের দিকে। এবার কৌশলটা পালটে ফেলেছেন পালচৌধুরিরা। দিনের বেলা পুরুষেরা কলোনিতে থাকে না। যে যার কাজে বেরিয়ে যায়। রোজগারপাতি না করলে
পেটের ভাত জুটবে কোত্থেকে? তাদের ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যায়। কারও কারও বা সন্ধে। দিনের বেলায় কলোনিতে থাকে শুধু বাচ্চাকাচ্চা, বুড়োবুড়ি আর মেয়েরা। উদ্বাস্তুদের উপনিবেশ এই সময়টা প্রায় অরক্ষিতই। সুযোগটা কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন পালচৌধুরিরা। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর বউ-ঝিরা বেশির ভাগই বিছানায় শরীর ঢেলে জিরিয়ে নিচ্ছিল। কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়েছিল। অনেকে বাইরের চত্বরে পিঠময় চুল ছড়িয়ে শীতের রোদ পোহাচ্ছিল।
তখনই হানাদার বাহিনী তুমুল শোরগোল তুলে কলোনিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মেয়েরা প্রথমটা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। প্রাথমিক ভীতিটা কাটিয়ে পাখি চিৎকার করে ওঠে, লাঠি রাম দাও কুড়াল বল্লম লইয়া আসো
চত্বরে যারা ছিল তারা তো বটেই, হইচইতে যারা ঘরে শুয়ে ছিল তারাও দা কুড়াল টুড়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পতিতপাবন, হরিন্দ আর হরনাথ কুণ্ডু আজ বেরোয়নি; কলোনিতেই ছিল। তারাও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দৌড়ে আসে, তবে আজকের লড়াইয়ে কলোনির যোদ্ধাদের আসল সেনাপতি পাখি।
হানাদারেরা ছিল সবসুদ্ধ সাত আটজন। হয়তো ভেবেছিল, কলোনির মেয়েরা কী আর করতে পারবে? তাদের দেখে আতঙ্কে সিটিয়ে যাবে। সেই ফাঁকে তারা লণ্ডভণ্ড কাণ্ড বাধিয়ে দেবে।
কিন্তু হিংস্র নারীবাহিনী সংখ্যায় অনেক। খানিকক্ষণ লাঠিসোটা চালিয়ে, অকথ্য খিস্তি করে শেষ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিয়ে হানাদাররা পালিয়ে যায়। যাবার আগে কয়েকজনকে অল্প বিস্তর জখম করেছে। তারাও পালটা মার খেয়েছে কম নয়। বুঝে গেছে দিনদুপুরে কি রাত দুপুরে, যখনই আসুক, হাতছাড়া জমি ফেরত পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
