হঠাৎ দূর থেকে কলরোল ভেসে আসে। অনেক মানুষ একসঙ্গে হইচই করলে যেমন শোনায়, অবিকল সেইরকম আওয়াজ।
দাঁড়িয়ে পড়ল যুগল। কুকুরের মতো কান খাড়া করে শব্দটা শুনল। তারপর উদ্বিগ্ন মুখে বলল, মনে লয় (হয়), আমাগো মুকুন্দপুরে কুনো হাঙ্গম বাধছে। আমি লৌড়াই (দৌড়ই)। আপনেরা আস্তে আস্তে আহেন। জমির আলের ওপর দিয়ে উধ্বশ্বাসে সে ছুটতে লাগল।
বিনয়রা হতচকিত। আশু দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, কী হতে পারে?
বিনয় বলল, কী জানি, বুঝতে পারছি না
তাড়াতাড়ি চল—
বিনয়রা জোরে জোরে পা চালাতে থাকে।
সামনের দিকে, বেশ খানিকটা দূরে, ধানখেতের ভেতর দশ বারোটা তালগাছের জটলা। অনেক উঁচুতে মাথা তুলে আকাশে পরমাশ্চর্য নকশা এঁকে দাঁড়িয়ে আছে। হিমঋতুর পড়ন্ত বেলার নরম রোদ এসে পড়েছে সেগুলোর ওপর।
চোখের পলকে গাছগুলোর ওধারে উধাও হয়ে গেল যুগল।
আশু দত্ত বেশ চিন্তিত। বিনয়কে বললেন, ও তো আমাদের ফেলে চলে গেল। তুই চিনে যেতে পারবি?
এই কদিন আগে মুকুন্দপুরে ঘুরে গেছে বিনয়। আগরপাড়া স্টেশন থেকে যুগলের সঙ্গে হেঁটে এসেছিল। ফিরেও গিয়েছিল হেঁটেই। এদিকের রাস্তাঘাটে কোনও ঘোরপ্যাঁচ নেই। মাঠের মাঝখান দিয়ে সোজাসুজি হাঁটলেই যুগলদের কলোনি। সব পরিষ্কার মনে আছে তার। বলল, পারব স্যার
মুকুন্দপুরে পৌঁছে দেখা গেল প্রচণ্ড হট্টগোল চলছে। সমস্ত আবহাওয়ায় তুমুল উত্তেজনা।
কেউ আর ঘরে নেই। কলোনির মাঝখানের বিশাল খোলা চত্বরে যুগলকে ঘিরে ধরে নানা বয়সের বউ-ঝিরা চিৎকার করে কী সব বলছে। সবাই একসঙ্গে চেঁচানোয় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
মেয়েরা সবাই সশস্ত্র। কারও হাতে ধারাল ছ্যান দা, কারও হাতে সড়কি, কারও হাতে বঁটি, কারও হাতে কুড়োল। সেদিন এসে বিনয় যাদের দেখে গিয়েছিল তাদের এখন আর চেনা যাচ্ছে না। সবাই ক্রুদ্ধ। হিংস্র। মনে হয়, কিছুক্ষণ আগে তাদের সঙ্গে কোনও শত্রুপক্ষের খণ্ডযুদ্ধ হয়ে গেছে। তার জের এখনও কাটেনি।
এই ক্ষিপ্ত নারীবাহিনীর মধ্যে সব চেয়ে বেশি করে যাকে চোখে পড়ছে সে পাখি। তার মাথায় ঘোমটা নেই। আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছে। সিঁদুর লেপটে কপালে মাখামাখি। শাড়ি এবং ব্লাউজের অনেকখানি ছিঁড়ে গেছে। দুচোখ থেকে আগুন ঠিকরোচ্ছে। একেবারে রণরঙ্গিণী মূর্তি।
চকিতে কবছর আগের, তখনও দেশভাগ হয়নি, একটা ছবি চোখের সামনে ফুটে ওঠে। রাজদিয়া থেকে সুজনগঞ্জের হাটে যাবার পথে যুগলের সঙ্গে নৌকোয় করে তার পিসতুতো বোন টুনিদের বাড়ি গিয়েছিল বিনু। সেদিনের বিনু আজকের বিনয়। টুনিদের বাড়িটা অদ্ভুত। দশ পনেরো হাত উঁচু মোটা মোটা খুঁটির মাথায় মহাশূন্যে দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। সেটা আশ্বিন মাস। বর্ষায় ধানখেত, মাঠঘাট, খালবিল, বিশাল বিশাল চক ভেসে গিয়েছিল। সেই জল তখনও নামেনি। চারদিকে অগাধ জলরাশি। বর্ষার সময়কার মাতামাতি অবশ্য ছিল না। যতদূর চোখ যায়, শান্ত নিস্তরঙ্গ এক সমুদ্র।
টুনিদের বাড়ির পাছদুয়ার থেকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাপলা শালুক আর জলপদ্মের বনের ভেতর দিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে পাখি এসে উঠেছিল যুগলের নৌকোয়। অলৌকিক জলপরীর মতো
মনে হয়েছিল তাকে। কিশোর বিনয়ের সামনে যুগলের সঙ্গে কথা বলতে তার কী লজ্জা! কী ভাল যে লেগেছিল পাখিকে। নম্র। কোমল। টুনিদের নজর এড়িয়ে যুগলের দেখা করতে সঙ্গে এসেছে। পাছে ধরা পড়ে যায় সেজন্য সদাস্ত।
সেদিনও মুকুন্দপুরে এসে পাখিকে দেখেছে বিনয়। তার হাতের রান্না খেয়েছে। টুনিদের বাড়িতে যেমনটি দেখেছিল, হুবহু একই রকম। তেমনই লাজুক, স্নিগ্ধ, মায়াময়। কে বলবে সে দুছেলের মা।
কিন্তু আশ্চর্য এক ভোজবাজিতে কদিনের মধ্যে আগাগোড়া বদলে গেছে পাখি। এতকালের চেনা লজ্জানত, জড়সড় মেয়েটির ভেতর এমন আগুন লুকিয়ে ছিল, কে ভাবতে পেরেছে! একটু খুঁটিয়ে লক্ষ করতে চোখে পড়ল, পাখির মাথার সামনের দিকের ডান পাশটা অনেকখানি ফুলে আছে। বাঁ হাতের কনুইতে জমাট-বাঁধা রক্ত। অর্থাৎ শত্রুপক্ষ যারাই হোক, তারা সহজে ছেড়ে দেয়নি; লাঠিসোঁটা বর্শা টর্শা চালিয়েছে।
এবার অন্য মেয়েদের ওপরও নজর এসে পড়ল বিনয়ের। তাদের অনেকেরই হাল পাখির মতো। ছেঁড়াফাড়া শাড়ি জামা। কারও কাঁধে, কারও কপালে, কারও বা পায়ে চোটের চিহ্ন।
শুধু মেয়েরাই না, ভিড়ের ভেতর পতিতপাবন, হরিন্দ, হরনাথ কুণ্ডু, হাচাই পাল–নানা বয়সের জনাকয়েক পুরুষকেও দেখা গেল। তারাও কেউ অক্ষত নেই। সবার শরীরেই অল্পবিস্তর চোট আঘাত লেগেছে।
হঠাৎ কে যেন বিনয় আর আশু দত্তকে দেখে চেঁচিয়ে ওঠে, আরে চিল্লানি থামা। ছুটোবাবু আর রাইজদার মাস্টরমশয় আইছে। লোকটা খুব সম্ভব রাজদিয়া বা তার কাছাকাছি কোনও গ্রামের বাসিন্দা ছিল। আশু দত্তকে সে চেনে।
লহমায় শোরগোল থেমে যায়। প্রবল উত্তেজক পরিস্থিতির মধ্যে এসে যুগলের খুব সম্ভব বিনয়দের কথা মনে ছিল না। সে দৌড়ে আসে। সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে, তরাতরি দুইখান চ্যার (চেয়ার) লইয়া আয়।
তৎক্ষণাৎ দুটো হাতলভাঙা, নড়বড়ে চেয়ার চলে আসে। বিনয় আর আশু দত্তকে বসিয়ে যুগল কাঁচুমাচু মুখে বলে, কুলোনিতে হাইন্দাই (ঢুকেই) তাফালে পইড়া গ্যালাম। দুফারে হুমুন্দির পুতেরা এইখানে আইয়া ম্যালা (অনেক) ঝঞট কইরা গ্যাছে। হেই হগল হুনতে হুনতে আপনেগো কং খ্যাল (খেয়াল) আছিল না।
