একটু পর মাকে সঙ্গে করে ফিরে এল সবিতা। আশু দত্ত বললেন, আমি বিনুদের সঙ্গে একটু বেরুব। ফিরতে ফিরতে মনে হয় রাত হয়ে যাবে। সন্তোষ অফিস থেকে এলে বোলো, আমার জন্যে যেন চিন্তা না করে। তোমার হাঁড়িতে কি আমাদের তিনজনের মতো ভাত হবে?
সন্তোষের স্ত্রী ঘোমটাটা কপালের আধাআধি টেনে দিয়েছেন। হাজার হোক আশু দত্ত তার ভাসুর। মৃদু গলায় বললেন, হবে।
মনে হচ্ছে তোমাকে মুশকিলে ফেললাম। আমার ভাত তো বেঁধেছই। বিনু আর যুগল খেলে তোমার আর সবিতার জন্যে আবার ভাত বসাতে হবে।
সন্তোষের স্ত্রী কী উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই হাঁ হাঁ করে ওঠে বিনয়, আমরা এইমাত্র খেয়ে এসেছি। আমাদের জন্যে ব্যস্ত হতে হবে না।
আশু দত্ত বিনয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক বলছিস তো?
স্যার, আপনার কাছে মিথ্যে বলতে পারি?
যুগলও বিনয়ের কথায় সায় দেয়, মাস্টর মশয়, ছুটোবাবু সাচাই (সত্যিই) কইছে। আমাগো প্যাট ঠাসা। এক গরাস ভাত খাওনের লাখান জাগা (জায়গা) নাই–
আগের মতোই নিচু গলায় সন্তোষের স্ত্রী বললেন, লজ্জার কোনও কারণ নেই। পরে দুটি চাল ফুটিয়ে নিতে তিলমাত্র অসুবিধা হবে না। দুপুরবেলা এসে বিনয়রা না খেয়ে চলে যাবে, এটা তার ভাল লাগছিল না। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাঁকে শান্ত করতে হল।
মিনিট কুড়ির মধ্যে চান-খাওয়া চুকিয়ে বিনয়দের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন আশু দত্ত।
.
১৪.
শিয়ালদা স্টেশনে যখনই যুগল আসে, শরণার্থীদের থিকথিকে ভিড়ে রাজদিয়া এলাকা কি ভাটির দেশের লোকজন খুঁজে বেড়ায়। আজ সেদিকে তার লক্ষ্য নেই।
দুনম্বর প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। ওটা আগরপাড়া হয়ে নৈহাটির দিকে যাবে।
প্ল্যাট ফর্মের দিকে পা চালাতে চালাতে যুগল ব্যস্তভাবে বলল, ছুটোবাবু, মাস্টর মশয়, আসেন আসেন। আমাগো টেরেন অহনই ছাইড়া দিব। নিয়মিত যাতায়াতের ফলে এই লাইনের ট্রেনের টাইমটেবল তার মুখস্থ।
আশু দত্ত বললেন, এটা কী হচ্ছে?
থমকে দাঁড়িয়ে যায় যুগল, কীয়ের (কীসের) কথা কন?
ট্রেনে উঠতে যাচ্ছিস। টিকেট কাটতে হবে না?
সারা মুখ জুড়ে হাসে যুগল। মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলে, আমাগো লাখান রিফুজগো টিকট লাগে না মাস্টর মশয়
আশু দত্ত স্তম্ভিত। বিমূঢ়ের মতো বলেন, বলিস কী রে!
কিছুদিন আগে বিনা টিকেটে ভ্রমণের পক্ষে বিনয়কে যা যা বলেছিল যুগল, এবারও নিপুণভাবে সেই যুক্তিজাল বিস্তার করে। ভিটেমাটি, দেশ, সর্বস্ব গেছে। স্বেচ্ছায় কেউ ইন্ডিয়ায় আসেনি। আসতে বাধ্য করা হয়েছে। গরু ছাগল পোকা মাকড়েরওঅধম হয়ে তারা কোনওরকমে টিকে আছে। সরকারের উচিত ছিল তাদের যাবতীয় দায়িত্ব নেওয়া। কিন্তু তারা উদ্বাস্তুদের সুখস্বাচ্ছন্দ্য দূরে থাক, পেট ভরে সম্মানের সঙ্গে খাওয়ারও বন্দোবস্ত করেছে কি? এই অবস্থায় কীসের রেলের টিকেট? যতদিন বেঁচে আছে বিনা পয়সায় তারা ট্রেনে চড়বে।
যুগলের ক্ষোভের কারণটা বুঝতে পারছিলেন আশু দত্ত। পকেট থেকে টাকা বার করে নরম গলায় বললেন, বে-আইনি কাজ আমি করতে পারব না। যা, তিনটে টিকেট নিয়ে আয়।
যুগল ঘাড় গোঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকে। বলে, পহা (পয়সা) খরচা কইরা এই হালার গরমেনরে লাই দিয়েন না মাস্টার মশয়–
সস্নেহে ধমক দিলেন আশু দত্ত, গেলি হারামজাদা
ঘোর অনিচ্ছায় টিকেট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায় যুগল।
.
আগরপাড়া স্টেশনে যখন ওরা এসে নামে, সুর্য পশ্চিম দিকে খানিকটা ঢলে পড়েছে। কলকাতার তুলনায় তাপাঙ্ক এখানে কয়েক ডিগ্রি কম। বিকেল হয়নি। কিন্তু এর মধ্যেই উত্তুরে হাওয়া কনকনে হতে শুরু করেছে। মিহি মখমলের মতো বহু দূরের গাছপালার মাথায় কুয়াশা নামছে।
ট্রেন লাইনের ওপারে গিয়ে বিনয় বলল, স্যার, মুকুন্দপুর এখান থেকে তিন সাড়ে তিন মাইল। যুগল অবশ্য বলে দুমাইল। রিকশা নেব?
এধারে প্রচুর দোকানপাট। অনেক লোকজনও চোখে পড়ছে। ডালপালাওলা একটা বটগাছের তলায় সাইকেল রিকশার স্ট্যান্ড। রিকশাওলারা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সওয়ারি ডাকছিল।
আশু দত্ত বিনয়কে বললেন, তিন সাড়ে তিন মাইল কতটুকু পথ! দেশে থাকতে লাটসাহেবদের মতো কি গাড়িঘোড়া চড়তাম? পায়ে হেঁটেই চকের পর চক পার হয়ে গেছি। চল, হাঁটতে হাঁটতেই যাই। জায়গাটাও ভাল করে দেখা হবে।
ঠিক আছে–
আগরপাড়া আধা গ্রাম, আধা শহর। ছাড়া ছাড়া সব বাড়িঘর। বেশির ভাগই টালি কি টিনের চালের। মাঝেমধ্যে কিছু কিছু দালান কোঠাও চোখে পড়ে।
মিনিট দশেকের ভেতর লোকালয়ের চৌহদ্দি ফুরিয়ে গেল। পাকা রাস্তাও শেষ। এরপর দুধারে ধানের খেত, আঁকাবাঁকা খাল, সাঁকো, মাছরাঙা। আকাশ জুড়ে কত যে রংবেরঙের পাখি। উঁচু উঁচু তালগাছ। ক্কচিৎ দু-একটি মানুষ। দূরে দূরে চাষীদের ছন্নছাড়া গ্রাম। প্রায় সব জমি থেকেই ফসল কাটা হয়ে গেছে। বাকি খেতগুলো সোনালি ধানের লাবণ্যে ভরপুর। বাতাসের ঝাঁপটা লেগে ধানের শিষগুলো নুয়ে নুয়ে পড়ছে। শব্দ উঠছে ঝুন ঝুন ঝুন ঝুন–
তিনজনে কথা বলতে বলতে কখনও জমির আলের ওপর দিয়ে, কখনও সরু মেঠো পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল।
চারদিক দেখতে দেখতে আশু দত্তর খুব ভাল লাগছে। বললেন, অনেকটা আমাদের দেশের মতো
এলাকাটা যে মাস্টার মশায়ের পছন্দ হয়েছে, সেজন্য বেজায় খুশি যুগল। বিপুল উৎসাহে সে বলতে থাকে, নানা খানে ঘুইরা এই জাগাখান (জায়গা) বিচরাইয়া বাইর করছি। নাইলে যাদবপুর বাশধানি গইড়ায় (গড়িয়ায়) জমিন পাইছিলাম। লই নাই। হেই হল জাগাতে খালি মানুষ। মাইনষের মাথা মাইনষে খায়। আর ঘিঞ্জি ঘিঞ্জি, গায়ে গায়ে বাড়ি। উয়াস (নিশ্বাস) ফালান যায় না।
