যুগলের সংকেতটা বুঝে নেয় বিনয়। সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে ওঠে, স্যার, যুগল আপনাকে কিছু বলতে চায়।
পুরোনো ছাত্রর সঙ্গে নানা কথাবার্তায় আশু দত্ত এতটাই মগ্ন ছিলেন যে যুগলের দিকে নজর ছিল না। এবার তার সম্বন্ধে মনোযোগী হলেন, তুই আগরপাড়ায় থাকিস না?
সেদিন শিয়ালদার প্রচণ্ড ভিড়ে, তুমুল হট্টগোলে আগরপাড়ার কথাটা একবারই বলেছিল বিনয়। সেটা ভুলে যাননি আশু দত্ত। বেশ অবাক হল যুগল। বলল, ঠিক আগরপাড়ায় না। ইস্টিশানে লাইমা পুবে দুই মাইল হাটলে মুকুন্দপুর। আমি হেইখানে থাকি মাস্টর মশয়–
সেদিনও তোকে বিনুর সঙ্গে দেখেছি। আজও তার সঙ্গে এসেছিস। রোজই তুই অতদূর থেকে বিনুর কাছে আসিস না কি?
রোজ নয়, ফি বেস্পতিবার কী কারণে তাকে কলকাতায় আসতে হয় এবং তারপর কোথায় বিনয়ের সঙ্গে দেখা করে, জানিয়ে দিল যুগল। খুব সংক্ষেপে।
আশু দত্ত বললেন, কী বলতে এসেছিস, এবার শোনা যাক–
যুগল বিনয়ের দিকে তাকায়, আপনেই কন ছুটোবাবু। আমি কি মাস্টরমশয়ের লাখান পণ্ডিত মাইনষেরে গুছাইয়া হগল কইতে পারি?
বিনয় একটু হাসল। তারপর দেশভাগের পর যুগল পশ্চিম বাংলায় এসে কীভাবে বন জঙ্গল সাফ করে মুকুন্দপুরে জবরদখল কলোনি বসিয়েছে তার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিতে থাকে। কাজটা মসৃণভাবে হয়নি। যে জমিতে তারা উপনিবেশ গড়ে তুলেছে তার মালিক ওদের উৎখাত করার জন্য দিন নেই রাত নেই, যখন তখন হানাদার পাঠাচ্ছে। যুগল এবং তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে এই সশস্ত্র বাহিনীর প্রায়ই লড়াই বাধে। যুগলদের অদম্য জেদ, একবার তারা পাকিস্তানে ভিটেমাটি খুইয়ে এসেছে। মুকুন্দপুরের নতুন বাসস্থানের দখল কিছুতেই ছাড়বে না। এর জন্য দরকার হলে আমরণ লড়াই চালিয়ে যাবে।
বিনয় আরও জানায়, মানুষের বাসভূমি শুধু তো কয়েকটা বাড়িঘরের সমষ্টি নয়। তার জন্য আরও অনেক কিছু দরকার। স্কুল, হাসপাতাল, শিক্ষিত মানুষ। যুগলের স্বপ্ন, মুকুন্দপুরে রাজদিয়ার মতো একটা জনপদ গড়ে তোলা। শিয়ালদা স্টেশন, রিফিউজি ক্যাম্প ইত্যাদি নানা জায়গা থেকে খুঁজে খুঁজে রাজদিয়া অঞ্চলের প্রচুর মানুষজন নিয়ে সেখানে জড়ো করেছে সে। এখন দরকার একটা স্কুলের। কিছুদিন ধরেই যুগল এমন একজন নিঃস্বার্থ মাস্টার মশায়ের সন্ধান করে বেড়াচ্ছিল যিনি মুকুন্দপুরে স্কুল বসাবেন। ছিন্নমূল মানুষদের কলোনিতে ছড়িয়ে দেবেন শিক্ষার দিব্য বিভা। আশু দত্তকে দেখার পর থেকে যুগলের মনে হয়েছে, এতদিনে তার ইচ্ছাপূরণ হতেও পারে।
শুনতে শুনতে আশু দত্তর দুচোখ বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছিল। হেমনাথের বাড়ির এক কামলা, অক্ষরপরিচয়হীন, দেশে থাকতে যে ধান বুনত, সর্ষে কলাই রুইত, পাট জাগ দিত, খাল বিল নদীতে মাছ ধরে বেড়াত, সে যে এমন বড় আকারে ভাবতে পারে, পূর্ব বাংলার এক স্বপ্নবৎ জনপদকে পশ্চিম বাংলার এক প্রান্তে নতুন করে গড়ে তুলতে চায়–সব শোনার পরও যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়। ব্যগ্র সুরে বললেন, তোদের কলোনিতে একদিন আমাকে নিয়ে যাবি যুগল?
এই সুযোগটা হাতছাড়া করল না যুগল, অন্য দিন না, আইজই আপনেরে লইয়া যাইতে চাই। বিনয়কে দেখিয়ে বলল, ছুটোবাবুও আমার লগে যাইব। না কইরেন না মাস্টর মশয়।
সামান্য দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন আশু দত্ত। সন্তোষ তাঁদের আশ্রয়দাতা। তাঁকে না জানিয়ে হুট করে যুগলদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়াটা কী ঠিক হবে?
যুগল বলতে লাগল, মুকুন্দপুরে গ্যালে আপনের বড় ভালা লাগব। দ্যাশের ম্যালা (অনেক) মাইনষের লগে দেখা হইব। আপনের কথা বেবাকরে (সবাইকে) কইছি। হেরা নিজের চৌখে আপনেরে দ্যাখলে কী আনন্দ যে পাইব, মুখে কইয়া কতটুক আর বুঝাইতে পারুম?
যুগলের ব্যাকুলতা আশু দত্তকে ভেতরে ভেতরে ঝাঁকি দিচ্ছিল। তিনি বললেন, কিন্তু মুকুন্দপুর তো অনেক দূরের পথ।
কদ্দুর আর। আধা ঘণ্টার ভিতরে বাইর হইলে সন্ধ্যার পর পর ছুটোবাবুর লগে ফিরা আইতে পারবেন। যদিন সাহস দ্যান, একখান কথা কই।
যুগলের এত আগ্রহ, এমন আন্তরিকতা হেলাফেলার বস্তু নয়। সস্নেহে হেসে আশু দত্ত বললেন, ঠিক আছে, বল
ছুটোবাবুরে কইতে আছিলেন, এইখানে ইস্কুলে ইস্কুলে ঘুরতে আছেন, কিন্তুক কাম পাইবেন কি না, ঠিকনাই। হের থিকা আমাগো মুকুন্দপুরে গিয়া ইস্কুল বহান (বসান)। আমরা তো জানি, আপনে কত বড় বিদ্বান, দ্যাশের মানুষ আপনেরে কত সোম্মান করত। আপনে মুকুন্দপুরে গ্যালে আমাগো পোলাপানগুলান মানুষ হইব। আপনেরে আমরা মাথায় কইরা রাখুম।
দেশভাগের পর সামান্য কটা বছরে কত কিছুই না ঘটে গেল। না, রাজদিয়ায় কেউ তাঁকে হত্যা করতে চায়নি। কিন্তু সমস্ত পরিবেশ রাতারাতি বিষবাষ্পে ভরে গেছে। যে-স্কুল তিনি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন, চল্লিশটা বছর যা ছিল তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান, তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখান থেকে তাঁকে তাড়ানো হল। রাজদিয়ায় তার মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত। চারপাশের মানুষজনের চোখে অবিশ্বাস, ঘৃণা, সন্দেহ। ওখানে বাস করা আর সম্ভব হচ্ছিল না। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।
যুগলের কথাগুলো শুনতে শুনতে আশু দত্তর সমস্ত শরীরে খাড়া ঝিলিকের মতো কিছু খেলে যায়। বিচিত্র এক বিদ্যুৎ-তরঙ্গ। চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছর আগে সব প্রলোভন হেলায় ছুঁড়ে ফেলে হেমনাথ আর মোতাহার হোসেন চৌধুরির সঙ্গে হাত মিলিয়ে একদিন রাজদিয়া হাইস্কুলের পত্তন করেছিলেন। সেই বিপুল উদ্দীপনা যেন নতুন করে ফিরিয়ে দিয়েছে যুগল। তাঁর নিষ্প্রভ ঘোলাটে চোখে আশ্চর্য দ্যুতি ফুটে ওঠে। ব্যগ্র স্বরে বললেন, আমি যাব তোদের সঙ্গে। দরজার কাছে সবিতা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তাকে বললেন, তোর মাকে ডেকে নিয়ে আয়–
