আশু দত্ত খাটের ধারে বসতে বসতে বিনয়দের বললেন, বোস্
তাঁকে প্রণাম করে একটা চেয়ারে বসল বিনয়। যথারীতি যুগল মেঝেতে বসেছে।
অনুযোগের সুরে আশু দত্ত এবার বিনয়কে বললেন, সেদিন রাত্তিরে আমাদের এখানে দিয়ে সেই যে চলে গেলি আর কোনও খবর নেই। ভাবলাম বুঝি ভুলেই গেছিস।
রামরতনের স্ত্রী আর মেয়েরা হুবহু এইভাবেই তাদের যাবতীয় অভিমান জানিয়েছিল।
মাঝখানে বিনয়ের জীবনে যা যা ঘটে গেছে সে-সব জোড়া লাগালে একখানা মহাভারত হয়ে যায়। সবিস্তার তা শুনিয়ে বৃদ্ধ মাস্টার মশাইটিকে ভারাক্রান্ত করতে ইচ্ছা হল না। বিনয় শুধু জানালো, আশু দত্তকে সে কি ভুলতে পারে? নানা সমস্যায় এমনই জড়িয়ে পড়েছিল যে এসে খোঁজ নিতে পারেনি। জিজ্ঞেস করল, ঠাকুমা কেমন আছেন?
ঠাকুমা অর্থাৎ আশু দত্তর মা। তিনি বললেন, ওই একইরকম। পাশের ঘরে শুয়ে আছে। কীভাবে যে বেঁচে রয়েছে। যে কোনও সময় প্রাণটা বেরিয়ে যাবে।
বিনয়েরও তেমনই ধারণা। জড়পিণ্ডের মতো যে বৃদ্ধাটিকে সেদিন শিয়ালদায় দেখেছে তার আয়ু যে ফুরিয়ে এসেছে সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত। বলল, সন্তোষবাবু আর তার অন্য ছেলেমেয়েদের তোত দেখছি না।
আশু দত্ত বললেন, সন্তোষের অফিস আছে না? কখন বেরিয়ে গেছে। তিনি আরও জানালেন, সন্তোষের আর দুটি ছেলেমেয়ে সবিতাদের স্কুলে পড়ে না। তাদের অন্য স্কুল। খেয়েদেয়ে দশটায় তারা চলে গেছে।
একটু চুপচাপ।
তারপর বিনয় বলল, এই কদিন কি বাড়িতেই ছিলেন স্যার?
আশু দত্ত বললেন, পায়রার খোপের মতো এই ঘরের ভেতর কতক্ষণ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা যায়। তাছাড়া
প্রশ্ন না করে উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে বিনয়।
আশু দত্ত পুরানো ছাত্রকে লক্ষ করছিলেন। বললেন, তুই তো জানিসই, মাত্র এক হাজার টাকা ছাড়া পাকিস্তান থেকে এপারে কিছুই নিয়ে আসতে পারিনি। রোজগারপত্তরের কিছু একটা চেষ্টা তো করতে হবে।
সেদিন রাতে শিয়ালদা থেকে আসার সময় তার দুর্ভাবনার কথা বলেছিলেন আশু দত্ত। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আয়ের একটা ব্যবস্থা না করলেই নয়। নইলে মহা বিপদ। বিনয় বলল, এই তো সবে দেশ থেকে এলেন। এর মধ্যে কাজকর্মের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলেন?
আশু দত্ত বিশদভাবে জানালেন, মাসতুতো ভাই সন্তোষ মাঝারি ধরনের একটা চাকরি করে। কত আর মাইনে! এদিকে স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও ওর তিন ছেলেমেয়ে। রেশনে চাল গম চিনির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দিনকে দিন বাজার আগুন হয়ে উঠছে। মাছ মাংস আনাজপাতিতে হাত ঠেকানো যায় না। খরচের কী অন্ত আছে? বাড়িভাড়া, খাওয়ার খরচ। ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ। ট্রাম ভাড়া, বাস ভাড়া। তার ওপর সবিতা তেরো পেরিয়ে চোদ্দয় পা দিয়েছে। বড় জোর আর তিন চার বছর। তারপর মেয়েটার বিয়ে দিতে হবে।
ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটের এই বাড়িটায় যুদ্ধ লাগার অনেক আগে থেকেই আছে সন্তোষরা। পুরো একতলাটা নিয়ে। দোতলায় থাকে বাড়িওলারা। তারা মানুষ ভালই। যে ভাড়ায় সন্তোষরা ঢুকেছিল এখনও মাসে মাসে তাই দিয়ে যাচ্ছে। বাড়িওলা ভাড়া বাড়ানোর কথা মুখ ফুটে আজ পর্যন্ত বলেনি। এটুকুই যা বাঁচোয়া।
তবে দুবছর আগেও এই রাস্তার বেশির ভাগ বাড়িতে অনেক ঘর ফাঁকা পড়ে থাকত। পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্তের এপারে মানুষের ঢল নামার পর কোনও বাড়িই আর খালি নেই। মওকা বুঝে বাড়িওলারা ভাড়ার মাত্রা দ্বিগুণ, তিনগুণ করে দিয়েছে। সন্তোষদের বাড়িওলা কতদিন নির্লোভ মহাপুরুষ হয়ে থাকবে, ঠিক নেই।
আশু দত্ত বলতে লাগলেন, এই অবস্থায় আমরা এসে পড়েছি। সন্তোষরা আমাদের শেলটার দিয়েছে। কিন্তু এটা তো বেশিদিন চলতে পারে না। ওদের কথাও তো ভাবতে হবে।
শুনতে শুনতে রামরতনের স্ত্রী, বাসন্তী, ছায়া আর মায়ার মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বিনয়ের। হুবহু একই চিত্র। একই পরিস্থিতি। তফাতের মধ্যে আশু দত্তরা যথেষ্ট আদর যত্নে আছেন। রামরতনের পরিবারের জন্য শুধুই লাঞ্ছনা, অসম্মান।
আশু দত্ত থামেননি, বুঝলি বিনু, একদিন কালীঘাট আর চেতলার অনেকগুলো স্কুল ঘুরলাম। হেড মাস্টার মশাইদের সঙ্গে দেখা করে বললাম, রাজদিয়া হাইস্কুলে চল্লিশ বছর পড়ানোর এক্সপিরিয়েন্স আছে। শয়ে শয়ে ছাত্র আমার হাত দিয়ে বেরিয়েছে। আমি একজন ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া এম এ। কপর্দকশূন্য হয়ে ইন্ডিয়ায় এসেছি। যদি আমাকে একটা কাজ দেওয়া হয়, বেঁচে যাব। সব শুনে হেডমাস্টার মশাইরা অনেক সহানুভূতির কথা বললেন। চা খাওয়ালেন। সেই সঙ্গে জানালেন, আপাতত কোনও ভ্যাকেন্সি নেই। তাছাড়া আমার বয়েসটাও অনেক বেশি হয়ে গেছে। নতুন চাকরি পাওয়ার পক্ষে সেটাও বড় বাধা। তবু স্কুলের গভর্নিং বডিকে বলবেন, স্পেশাল কেস হিসেবে যদি কিছু করা যায়। মাঝে মাঝে গিয়ে খোঁজ নিতে বলেছেন। একটু থেমে বিমর্ষ মুখে ফের শুরু করেন, আশার কোনও লক্ষণ দেখি না। তবে সন্তোষ আমার জন্যে প্রাইভেট টিউশনের খোঁজ করছে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছাত্র পড়িয়ে কোনওদিন তো টাকা পয়সা নিইনি। কী জানি, শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়তো নিতে হবে।
এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি যুগল। মেঝেতে বিনয়ের কাছাকাছি নীরবে বসে ছিল। এবার আঙুল দিয়ে বিনয়ের পায়ে আলতো একটা ঠেলা দিল। বিনয় তার দিকে তাকাতেই মাথা সামান্য ঝাঁকিয়ে চোখের একটা ইঙ্গিত করল।
