সুধা অবাক হল, কেন বল তো? এত তাড়া কীসের?
যুগল বলল, ছুটোবাবুরে লইয়া মুকুন্দপুরে যামু। আশু দত্তর কথাটা অবশ্য সে জানালো না।
ভাইয়ের দিকে ফিরে সুধা জিজ্ঞেস করল, আজ যে মুকুন্দপুর যাবি, আগে বলিসনি তো?
বিনয় বলল, আগে কী জানতাম যে যাব? তুই যখন চান করছিলি যুগল একটা সুখবর দিল।
কী সুখবর রে?
সেবার যখন মুকুন্দপুরে যাই, ওরা বলেছিল, বাকি জঙ্গল কাটার পর যে-জমি বেরুবে তার থেকে আমাকে সাত কাঠা দেবে। জঙ্গল সাফ হয়েছে। জমি বুঝিয়ে দেবার জন্যে যুগল আমাকে নিতে এসেছে।
আশু দত্তর সঙ্গে দেখা করার কথাটা বিনয়ও বলল না। সেই প্রসঙ্গ তুললে অনেক প্রশ্নের জবাব। দিতে হবে। এখন আর বকবক করতে ভাল লাগছে না। মুকুন্দপুর থেকে ফিরে এসে সুধা এবং হিরণকে সব জানিয়ে দেবে।
ঝুমাদের বাড়ি থেকে ফেরার পর কটা দিন ঘরের কোণে পড়ে আছে বিনয়। চুপচাপ, বিষণ্ণ। সুধা ভাবল, যুগলের সঙ্গে গেলে মন হালকা হবে ছেলেটার, বিষাদের ভাবটা কেটে যাবে। লঘু সুরে বলল, তুই তো হলে জমিদার হয়ে যাচ্ছিস?
বিনয় হাসল, তাই তো দেখছি।
কখন ফিরবি?
সুধার প্রশ্নটার উত্তর দিল যুগল, আগে তো ছুটোবাবু মুকুন্দপুর পৌঁছাউক, হের পর তো ফিরনের কথা। রাইত বেশি হইলে ছাড়ুম না কিলাম (কিন্তু)। আমাগো উইখানেই রাইখা দিমু। না ফিরলে চিন্তা কইরেন না।
সুধা আর দাঁড়ালো না। ব্যস্তভাবে ভেতর দিকে চলে গেল।
.
১৩.
আধ ঘণ্টা পর খাওয়াদাওয়া সেরে যুগলকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিনয়। ধুতি আর শার্টের ওপর ফুল-হাতা সোয়েটার পরে নিয়েছে সে। সন্ধের পর আজকাল জাঁকিয়ে শীত পড়ছে। তাই একটা গরম চাদরও সঙ্গে নিল।
টালিগঞ্জ থেকে বাস ধরে কালীঘাট ট্রাম ডিপোর স্টপেজে যুগলকে নিয়ে নেমে পড়ল বিনয়। রাস্তা পেরিয়ে কালী টেম্পল রোড আর সদানন্দ রোড হয়ে একটু ঘুরপথে ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে পৌঁছতে তিন চার মিনিটের বেশি লাগল না।
মাসখানেক পেরিয়ে গেছে পাকিস্তান থেকে কলকাতায় চলে এসেছে বিনয়। এর মধ্যে নিরুদ্দেশ ঝিনুককে পাগলের মতো খোঁজাখুঁজি করতে করতে এই বিশাল মহানগরের প্রচুর রাস্তাঘাট এবং অলিগলি চিনে ফেলেছে। তাছাড়া কোথাও একবার গেলে সহজে সেই জায়গাটা সে ভুলে যায় না।
সেদিন রাত্রিবেলা আশু দত্তকে ঘোড়ার গাড়িতে চাপিয়ে ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে পৌঁছে দিয়েছিল বিনয়। তখন ছিল গাঢ় কুয়াশা আর অন্ধকার। যদিও চারদিকে টিম টিম করে ইলেকট্রিক আলল, গ্যাসবাতি, হেরিকেন কী কেরোসিনের কুপি জ্বলছিল, তবু সব ঝাপসা ঝাপসা। বাড়িঘর ভুতুড়ে।
এখন দিনের আলোয় পাক খেতে খেতে এগিয়ে যাওয়া ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটের প্রায় শেষ মাথায় সন্তোষ নাগদের ২৭ বি বাড়িটা খুঁজে বার করতে আদৌ কোনও অসুবিধা হল না। এমনকি হদিস জানার জন্য রাস্তার কোনও লোককে জিজ্ঞেসও করতে হয়নি।
সেকেলে, পলেস্তারা-খসা, নোনা-লাগা বাড়িটার সদর দরজা বন্ধ ছিল। কড়া নাড়তে সেদিনের সেই কিশোরীটি দরজা খুলে দিল। সন্তোষ নাগের মেয়ে। বিনয়কে চিনতে পেরেছে সে। তার মুখটা আলো হয়ে উঠল। বলল, আপনি কদিন আগে জেঠু আর ঠাকুমাকে নিয়ে এসেছিলেন না?
হাসিমুখে বিনয় বলল, হ্যাঁ। স্যার কি বাড়িতে আছেন?
আছেন। আসুন
মেয়েটির সঙ্গে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বিনয় জিজ্ঞেস করল, কী নাম তোমার?
সবিতা।
কোন ক্লাসে পড়?
এইটে। মহারানী গার্লস হাইস্কুলে।
আজ তো বেস্পতিবার। স্কুল যাওনি?
না। আজ আমাদের স্কুলের ফাউন্ডনেশন ডে। তাই ছুটি!
সবিতা মেয়েটা বেশ সপ্রতিভ। লেশমাত্র জড়তা নেই। বিনয়ের খুব ভাল লাগল তাকে।
বাড়ির বাইরেটা যেমনই হোক, ভেতরটা কিন্তু বেশ পরিষ্কার। সদর দরজার গা থেকেই বাঁধানো উঠোন। দুএক জায়গায় সিমেন্ট সামান্য উঠে গেলেও তকতক করছে। সেটার এক পাশে কলতলা এবং জোড়া পায়খানা।
একতলায় খানতিনেক ঘর এবং এক ফালি রান্নাঘর চোখে পড়ল বিনয়ের। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। দোতলাটাও নিচের তলারই মতো। সারি সারি শোবার ঘর, রান্নাঘর ইত্যাদি। বাড়তির মধ্যে ওপরের ঘরগুলোর সামনে ঢালাই লোহার রেলিং-দেওয়া চওড়া বারান্দা, নিচে যা নেই।
বাড়িটা প্রায় নিঝুম। পায়ের শব্দে একজন মাঝবয়সী মহিলা আর একজন বৃদ্ধা দোতলার কোনও ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দার রেলিংয়ের কাছে এসে দাঁড়ালো। কৌতূহলী চোখে বিনয়দের দেখতে লাগল।
একতলার রান্নাঘরে সন্তোষের স্ত্রী খুব সম্ভব বাসনকোসন গুছিয়ে রাখছিলেন। মহিলাকে আগের দিনই দেখে গেছে বিনয়। তাই চিনতে পারল।
উঠোন থেকেই ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে সবিতা, মা, জেঠু, দেখ কারা এসেছেন–
ঘোমটা সিঁথি পর্যন্ত টেনে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সন্তোষ নাগের স্ত্রী। কোণের দিকের একটা ঘর থেকে ততক্ষণে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন আশু দত্ত। প্রাক্তন ছাত্রটিকে দেখে খুব খুশি। বললেন, আয়, আয়-যে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন সেখানেই বিনয়দের নিয়ে গেলেন। সবিতা সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল। সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।
ঘরের একধারের দেওয়াল ঘেঁষে বড় তক্তপোশে বিছানা পাতা। আর-এক দিকের দেওয়ালে কাঠের তাক বসিয়ে আয়না চিরুনি ইত্যাদি রাখার ব্যবস্থা। তিন চারটে বেতের চেয়ারও রয়েছে। একটা টেবলও।
