জবর দরকার ছুটোবাবু।
প্রথমটা বিনয় ভেবেছিল আশু দত্ত দেশের মানুষ। সেদিন রিফিউজি স্পেশাল থেকে সবে শিয়ালদায় নেমেছেন। ক্লান্ত। বিধ্বস্ত। ভাল করে কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না। তাই তাঁর সঙ্গে দেখা করে হয়তো পাকিস্তানের হালচাল জানতে চায় যুগল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তার অন্য কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে।
বিনয় জানতে চাইল, কীরকম?
বিপুল উৎসাহে যুগল বলতে থাকে, আপনেরে কইছিলাম না, মুকুন্দপুরে একখান ইস্কুল বমু (বসাব)। মনে আছে?
বিনয় সোজা হয়ে বসে, আছে।
দ্যাশে থাকলে কুননা চিন্তা আছিল না। কত যে খাল বিল আর নদী হের (তার) ল্যাখাজোখা নাই। তার উপুর মাইলের পর মাইল চাষের জমিন। এক মাথায় খাড়ইলে আর-এক মাথা দেখা যায় না। হেইখানে মাছ ধর, ধান রোও (বোনো), পাট বরাও, রবিশস্যের খন্দে কলই সউরষা মুং (মুগ) মুসৈর বরাও। জনম কাইটা যাইব। কিন্তু এইখানে? জল কই? মরা মরা নদী, কয়টা খাল, আর কয়টা বিল আছে হাতে গইন্যা কওন যায়। এইখানকার খাল বিলের উপর ভরসা কইরা কি বাচন যায়? অন্যের জমিনে যে কাম করুম হের উপায় নাই। মালিকগো বান্ধা কিষান আছে। এক নাগাড়ে বলতে বলতে হাঁপিয়ে পড়েছিল যুগল। দম নিয়ে ফের সে শুরু করে, আমাগো জনম তো হাবিজাবি টাণ্টামাষ্ঠা কইরা (উঞ্ছবৃত্তি করে) কুনোরকমে কাইটা যাইব। কিন্তু আমাগো পোলামাইয়াগো?।
যুগল কী ইঙ্গিত দিচ্ছে মোটামুটি আন্দাজ করতে পারছে বিনয়। সে উন্মুখ হয়ে থাকে।
যুগল বলে, চাকরি বাকরি ছাড়া ইন্ডিয়ায় আমাগো লাখান রিফুজগো গতি নাই, কিন্তুক চাকরি তো মুখের কথা খসাইলে হয় না। হের লেইগা বিদ্যা চাই। প্যাটে কালির অক্ষর সান্ধাইতে (ঢোকাতে) হইব। হে তো অ্যামনে অ্যামনে হয় না। ইস্কুল বহাইতে (বসাতে) হইব। আশু মাস্টমশয় দ্যাশ ছাইড়া আহনে (আসায়) আন্ধারে আলোর ইটু রেখ (অন্ধকারে আলোর রেখা) দেখতে পাইতে আছি। তেনি যদিন মুকুন্দপুরে ইস্কুল বহান (বসান), কুলোনির পোলাপানগুলান মানুষ হইব।
মুগ্ধ বিস্ময়ে যুগলের দিকে তাকিয়ে থাকে বিনয়। অক্ষরপরিচয়হীন এই যুবকটি একসময় ছিল খুবই আলাভোলা ধরনের। খাল বিল নদী মাছ পাখি ধানের খেত পাটের খেত-এ-সবের বাইরে অন্য কোনও দিকে নজর ছিল না। সীমান্তের এপারে এসে সে বুঝেছে, লেখাপড়া ছাড়া উদ্বাস্তুদের ছেলে-মেয়েদের গতি নেই। শিক্ষাই হল আসল শক্তি। সেটা ছাড়া তারা টিকে থাকতে পারবে না, একেবারে শেষ হয়ে যাবে।
মুকুন্দপুরে স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা আগেও বিনয়কে জানিয়েছিল যুগল। সেজন্য পছন্দমতো মাস্টার মশায়ের খোঁজ করছিল সে। কিন্তু তেমন কারওকে পাচ্ছিল না। ফলে কিছুটা হতাশই হয়ে পড়েছিল। আশু দত্তকে দেখার পর তার স্বপ্নটা নতুন করে ফিরে এসেছে।
যুগল এবার উৎসুক সুরে জিজ্ঞেস করে, আপনের কী মনে লয় (হয়) ছুটোবাবু, আশু মাস্টরমশয় কি মুকুন্দপুরে ইস্কুল বহাইবেন (বসাবেন)?
বিনয় লক্ষ করল, যুগলের চোখেমুখে বিপুল উদ্দীপনা। একটু চিন্তা করে বলল, ওঁর সঙ্গে কথা বলে দেখ।
রাইজদায় তো দেখছি, লিখাপড়া, ইস্কুল আর ছাত্র, দিনরাইত এই লইয়াই থাকতেন। আপনে তেনির কাছে পড়তেন। কী ভালাটাই না আপনেরে বাসেন। হের উপুর হ্যামকর্তার নাতি আপনে। যদিন তেনিরে ইটু বুঝাইয়া কন–
ঠিক আছে, ওঁকে বলব। তারপর দেখা যাক উনি কী করেন–
মিনতির সুরে যুগল বলতে লাগল, য্যামন কইরা পারেন মাস্টর মশয়রে রাজি করাইতেই হইব ছুটোবাবু। আপনে ত্যামন কইরা ধরলে তেনি না কইতে পারবেন না।
যুগলের ব্যাগ্রতা বিনয়কে নাড়া দিয়ে গিয়েছিল। বলল, আচ্ছা আচ্ছা। আগে তো ওঁর সঙ্গে দেখা করি।
সুধা ঘরে এসে ঢুকল। সবে চান সেরেছে। পরনে পাটভাঙা শাড়ি, চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। হাতে একটা ট্রেতে তিন কাপ চা আর মিষ্টির প্লেট। এক কাপ চা আর মিষ্টি যুগলের জন্য। বাকি দুকাপ চা তার এবং বিনয়ের। ট্রেটা টেবলে নামিয়ে রেখে একটা বেতের সোফায় বসতে বসতে সুধা হাসিমুখে যুগলকে বলল, চানঘর থেকে তোমার গলা শুনতে পাচ্ছিলাম। নাও, চা খাও
যুগল একমুখ হাসল, ছুটোদিদিরে কিছু কইতে হয় না। আমার পরানটা যে অহন চা চা করতে আছিল, ঠিক ট্যার পাইয়া গ্যাছে। চা বানাইয়া নিজের হাতে লইয়া আইছে। এ-বাড়িতে তার কোনওরকম সংকোচ নেই। ট্রে থেকে চায়ের কাপ তুলে নিল সে।
বিনয় এবং সুধাও তাদের কাপ তুলে নিয়েছে। চায়ে চুমুক দিয়ে যুগলদের খোঁজখবর নিতে লাগল সুধা। পাখি এবং তার ছেলেরা কেমন আছে, মুকুন্দপুরের বাসিন্দারা কে কী করছে, রাজদিয়া অঞ্চলের আরও মানুষজন সেখানে এসেছে কি না, ইত্যাদি ইত্যাদি।
চা খাওয়া হয়ে গেলে সুধা উঠে পড়ল, এক্ষুনি ধোপা আসবে। ময়লা কাপড়চোপড়ের লিস্টটা করে ফেলি।
বিনয় জানে, কাছাকাছি এক ধোপাবাড়ির সঙ্গে সুধাদের মাসকাবারি ব্যবস্থা আছে। ফি বেস্পতিবার ধোপা এসে সারা সপ্তাহের ময়লা জামাকাপড় নিয়ে যায়। সুধা একটা খাতায় তা লিখে রাখে। মাসের শেষে হিসেব করে টাকা মিটিয়ে দেয়। সে যখন দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে, যুগল ডাকল, ছুটোদিদি
সুধা থেমে গেল, কিছু বলবে?
আপনের রান্ধন (রায়া) কদ্দূর?
হয়ে গেছে।
তাইলে আমারে আর ছুটোবাবুরে যত তরাতরি পারেন, খাইতে দ্যান।
