ঝিনুকের জন্য ক্লেশ আর বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠতে খানিকটা সময় লাগল যুগলের। তারপর বলল, হেই ব্যাপারে আইজ আপনের লগে ম্যালা (অনেক) কথা আছে।
ঠিক আছে। বল–
বিলের কিনারে আলিসান জঙ্গলের কিছুটা কাইটা আমরা কুলোনি বহাইছি। হে তো আপনে দেইখাই আইছেন।
বিনয় সায় দেয়, হা–
যুগল বলে, হের পরেও তিন ডবল জঙ্গল রইছে। সাপখোেপ, শুয়োর, বাঘডাসার বাসা। চাইর দিন হইল আরও জঙ্গল আমরা সাফা করতে শুরু করছি।
বিনয়ের মনে পড়ল, যুগলের একমাত্র স্বপ্ন এবং সংকল্প, মুকুন্দপুরের অবশিষ্ট বনভূমি নির্মূল করে কলোনির বিস্তার ঘটাবে। ভাটির দেশ এবং রাজদিয়া অঞ্চলের মানুষজন খুঁজে খুঁজে এনে পূর্ব বাংলাকে সীমান্তের এপারে নতুন করে নির্মাণ করবে।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ বাকি জঙ্গলটা কাটছ কেন? কলোনিতে লোকজন কি বেড়েছে?
ম্যালা, ম্যালা (অনেক, অনেক)। যুগল জানায়, রাজদিয়া, ডাকাইতা পাড়া, গিরিগুঞ্জ, সুজনগুঞ্জ ইত্যাদি এলাকার যে-সব শরণার্থী কলকাতায় চলে এসেছিল, মুকুন্দপুর কলোনির খবর পেয়ে তারা দলে দলে হাজির হচ্ছে। কম করে পঞ্চাশ ষাট ঘর তো হবেই। কলোনিতে আগে এসে যারা থিতু হয়ে বসেছে তাদের বাড়িঘর তো আর রাজপ্রাসাদ নয় যে এত লোকজনকে ভাগাভাগি করে নিয়ে জায়গা দেবে। ফলে ওই উদ্বাস্তুরা খোলা আকাশের তলায় পড়ে আছে। দিনের বেলা একরকম কেটে যায়, কিন্তু হিমঋতুর রাতগুলো অসহ্য। খুব তাড়াতাড়ি ঘর তুলতে না পারলে বউ বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে শীতেই ওরা শেষ হয়ে যাবে। তাই জঙ্গলের যে অংশটা এখনও টিকে আছে তা কেটে না ফেলে উপায় নেই।
যুগল বলতে লাগল, ভুরে (ভোরে) সূর্য্য উঠনের লগে লগে কুলোনির পুরুষমানুষগুলান জঙ্গলে গিয়া সান্ধে (ঢোকে)। যতক্ষণ রইদ (রোদ) থাকে, কুড়াল আর দাও (দা) দিয়া বড় বড় গাছ আর ছুটো ছুটো ঝোপ কাটন (কাটা) চলে। এইর ভিতরে অনেকখানি জাগা (জায়গা) সাফা কইরা ফালান হইছে।
চকিতের জন্য বিনয়ের মনে হল, যেভাবে হাজারে হাজারে মানুষ পাকিস্তান থেকে চলে আসছে, পশ্চিম বাংলার কোথাও আর বনজঙ্গল এবং জলাভূমি অবশিষ্ট থাকবে না। জলা বুজিয়ে, বন কেটে গড়ে উঠবে উদ্বাস্তুদের বাসস্থান। ছিন্নমূল মানুষদের জন্য কলোনির পর কলোনি।
যুগল জিজ্ঞেস করে, আইজ আপনের কুনো জবোরি কাম আছে?
বিনয় অবাক হল, না, কেন?
তয় (তবে) আমার লগে মুকুন্দপুরে লন (চলুন)।
মুকুন্দপুরে যাব! কেন?
যুগল জানালো, এর আগে বিনয় যখন মুকুন্দপুরে গিয়েছিল, তখনই ঠিক করা হয়েছে কলোনির পাশের জঙ্গল সাফ হলে তাকে সাত কাঠা জমি দেওয়া হবে। মুকুন্দপুর বাস্তুহারা কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি হরনাথ কুণ্ডু পাকা খাতায় তা লিখেও রেখেছিল। এখন জমি বেরিয়েছে। বিনয় গিয়ে, যে জায়গা পছন্দ করবে, সেটাই তাকে দেওয়া হবে। যুগল তো বটেই, মুকুন্দপুরবাসীদের সনির্বন্ধ আর্জি–হেমকর্তার নাতি কষ্ট করে একবার সেখানে গিয়ে জমি বেছে নিক। তারা বিশেষভাবে যুগলকে, বলে দিয়েছে, আজই যেন বিনয়কে মুকুন্দপুরে নিয়ে যায়।
বিনয়ের একটু মজাই লাগল। তার বাবা কলকাতার বাড়ি বেচে তাকে একরকম রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে গেছেন। যদিও সুধারা আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু চিরকাল তো তার পক্ষে সেখানে থাকা সম্ভব নয়। এই বিশাল মহানগরে নিজের বলতে এক ইঞ্চি জায়গা তার নেই। আর মুকুন্দপুরের মানুষজন, বিশেষ করে যুগল, সম্পূর্ণ অনাত্মীয়, তার সঙ্গে রক্তের কোনও সম্পর্ক নেই, কতকাল আগে হেমনাথের বাড়িতে কামলা খাটত, সে কি না তার জন্য জমির ব্যবস্থা করে ছুটে এসেছে!
বিনয়ের বুকের ভেতরটা গভীর আবেগে তোলপাড় হয়ে যায়। যাঁর রক্ত আজন্ম তার শিরায় শিরায় বয়ে চলেছে সেই অবনীমোহন তাঁর জীবনের পরিধি থেকে তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু যুগল তাকে কত কাছে টেনে নিয়েছে। অবনীমোহনের দিক থেকে অনেক কিছু হারিয়েছে বিনয়, কিন্তু যুগল তার দুহাত ভরে দিয়েছে। তার আগ্রহ, তার প্রগাঢ় ভালবাসা, তার নিবিড় আন্তরিকতা তুচ্ছ করার মতো নয়। কোনওদিনই হয়তো মুকুন্দপুরে থাকা হবে না, তবু বিনয় বলল, তোমাদের ওই জমি আমি নেব। হাতে এখন কাজ নেই। চল, তোমার সঙ্গে মুকুন্দপুরেই ঘুরে আসি।
যুগলের চোখেমুখে আলোর ঝলক খেলে যায়। দুই হাত মুঠো করে শরীরটা বাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে খুশিতে শিশুর মতো কুটিপাটি হতে থাকে যুগল, আপনে আমাগো কাছে থাকবেন কী আনন্দ যে হইতে আছে ছুটোবাবু!
খবরের কাগজে চাকরি হয়েছে। কলকাতা থেকে অত দূরে বাড়িঘর বানিয়ে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সে-কথা বলা গেল না। যুগল দুঃখ পাবে। বিনয় হাসিমুখে চুপ করে থাকে।
যুগল এবার বলে, আমার আর-একখান কথা আছে ছুটোবাবু
বল
আশু মাস্টারমশয়ের লগে আইজই একবার দেখা করতে চাই
মাঝখানে কটা দিন যা যা ঘটে গেছে তাতে আশু দত্তর কথা ঘুণাক্ষরেও মনে পড়েনি বিনয়ের। অথচ শিয়ালদা স্টেশন থেকে ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে তাঁকে পৌঁছে দিয়ে বলে এসেছিল, খুব শিগগিরই একদিন গিয়ে দেখা করবে। কথা রাখা যায়নি। ভীষণ অন্যায় হয়ে গেছে।
বিনয় বলল, ঠিক আছে। তোমার সঙ্গে মুকুন্দপুরে তো যাচ্ছিই। যাবার পথে আশু স্যারের ওখানে হয়ে যাব। কিন্তু
কী?
তুমি আশু স্যারের সঙ্গে দেখা করতে চাইছ কেন? কোনও দরকার আছে?
