এই তিন দিনে অবশ্য অন্য একটা ব্যাপার ঘটেছে। শওকত আলি খান এ-বাড়িতে লোক পাঠিয়েছিলেন। তিনি অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। হিরণদের রাজদিয়ার প্রপার্টির সঙ্গে তাঁদের বাড়ি খান মঞ্জিল এক্সচেঞ্জ করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইস্ট পাকিস্তানে চলে যেতে চান। দু সপ্তাহ সময় দিয়ে গেছে তাঁর লোক। এর ভেতর হিরণ যদি এক্সচেঞ্জের বন্দোবস্ত করে, শওকত সাহেবের হাতে অনেক খদ্দের আছে, পাকিস্তান থেকে হাজারে হাজারে মানুষ এপারে চলে আসছে, তাদের কারও সম্পত্তির সঙ্গে তিনি বাড়ি পালটাপালটি করে চলে যাবেন।
এক্সচেঞ্জের পর মুসলমানদের বাড়িতে গিয়ে থাকতে ভীষণ আপত্তি ছিল সুধা আর হিরণের জেঠিমার। সুধাকে অতি কষ্টে রাজি করানো হয়েছে। সে বুঝেছে, এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলে পরে আপশোশের অন্ত থাকবে না। হিরণের জেঠিমা এলে তাকেও বোঝানো হবে। আশা করা যায়, শেষপর্যন্ত তিনিও গোঁ ধরে থাকবেন না।
শওকত আলির লোকটির সঙ্গে কথা বলার পর হিরণ আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি। তক্ষুনি পাটনায় দ্বারিক দত্তকে টেলিগ্রাম করে দিয়েছে। তিনি যেন অবিলম্বে কলকাতায় চলে আসেন।
.
আজ বেস্পতিবার। নটা বাজতে না বাজতেই অফিসে চলে গেছে হিরণ। উমা রান্নাঘরে খুটখাট করে কীসব করছে। হিরণ অফিসে বেরিয়ে গেলেই স্নান সেরে নেয় সুধা। সে এখন বাথরুমে।
বিনয় তার ঘরে শুয়ে শুয়ে আজকের খবরের কাগজটা পড়ছিল। ওধারে সুধাদের চানঘর থেকে ছর ছর করে কলের জল পড়ার শব্দ আসছে। এছাড়া বাড়িটা প্রায় নিঝুম।
আচমকা বাইরে থেকে যুগলের হাঁক ভেসে আসে, ছুটোবাবু, ছুটো দিদি, আমি আইয়া গ্যাছি। উমারে সদর দুয়ার খুলতে কন– নিচু গলায় কথা বলতে পারে না সে। যখনই আসে, চারদিক উচ্চকিত করে ডাকাডাকি করে।
উমা বোধহয় শুনতে পেয়েছিল। যাই বলে সে ত্বরিত পায়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেল।
সেই যে ঝিনুকের খোঁজে সেদিন যুগলের সঙ্গে শিয়ালদা স্টেশনে গিয়েছিল, তারপর আর তার কথা খেয়াল ছিল না বিনয়ের। রামকেশব তাকে আমূল দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিলেন। কাগজটা এক পাশে রেখে বিছানা থেকে নেমে পড়ল সে। ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের প্যাসেজে আসতেই চোখে পড়ল সিঁড়ি বেয়ে উমার পেছন পেছন ওপরে উঠে আসছে যুগল। বিনয়কে দেখে হাসিমুখে বলল, হাসপাতাল থিকা পায়ের পট্টি (ব্যান্ডেজ) পালটাইয়া আইলাম। ডাক্তরবাবু কইছে, আর দুই বিষ্যদ্বার পর পট্টি বাতে (বাঁধতে) লাগব না। ঘাওখান (ঘাখানা) পুরা সাইরা যাইব।
জবরদখল কলোনি বসাতে গিয়ে মুকুন্দপুরের এক নৈশযুদ্ধে জমিদারের গুণ্ডাদের সড়কির ফলা যুগলের পা এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলেছিল। তখন থেকে লেকের ধারের পুরানো মিলিটারি হাসপাতলে ফি বেস্পতিবার পা ড্রেস করাতে আসে সে। সেখান থেকে সোজা সুধাদের বাড়ি।
বিনয় কিছু বলল না। অল্প হেসে যুগলকে সঙ্গে করে বাইরের ঘরে এসে একটা চেয়ারে বসল। প্রাক্তন মনিবের নাতি নাতনিদের সামনে চেয়ারে বসে না যুগল। আগের মতোই সে মেঝেতে বসে পড়ল। বিনয় লক্ষ করল, পা ভালই মুড়তে পারছে যুগল। কিছুদিন আগের কষ্টটা নেই বললেই হয়।
যুগল বলল, চিল্লাইয়া চাইর দিক ফাইড়া ফালাইলাম। আমার গলা হুনলেই তো ছুটোদিদি লৌড়াইয়া (দৌড়ে) আহে (আসে)। তেনি কি বাড়ি নাই?
যুগলকে দেখলে বিনয় খুব খুশি হয়। এর মধ্যে এমন একটা আপন-করা ভাব আছে যাতে ওকে ভাল না লেগে পারা যায় না।
বিনয় জানায়, সুধা বাথরুমে আছে। যুগলের ডাক নিশ্চয়ই তার কানে গেছে। চান হলেই এ ঘরে চলে আসবে।
হেই কন। এই বাড়িত আইয়া ছুটোদিদিরে না দেখলে মন খারাপ হইয়া যায়। যুগল একটু হাসল। তারপর গলার স্বর নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ঝিনুক বইনের কিছু খবর নি পাইলেন?
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়, না
এইর ভিতরে থানায় গ্যাছিলেন?
ঝিনুকের সন্ধানে প্রায়ই যে বিনয় থানায় যায়, যুগল তা জানে। বিনয় বলল, কদিন যাওয়া হয়নি। খবর থাকলে পুলিশ থেকে জানিয়ে দিত। ছোটদির বাড়ির ঠিকানা থানায় দেওয়া আছে।
বিষাদ-মাখা মুখে চুপচাপ বসে থাকে যুগল। এই নিরক্ষর যুবকটি চূড়ান্ত আশাবাদী। তার ধারণা ছিল, নিশ্চয়ই ঝিনুককে এই বিশাল মহানগরের জনারণ্যের ভেতর থেকে খুঁজে বার করা যাবে। বিনয়ের সঙ্গে দেখা হলে কত ভাবেই না সে সাহস জুগিয়েছে। কিন্তু আজ মনে হল, তার বিশ্বাস এবং আশার ভিতটা যেন নড়বড়ে হয়ে গেছে।
যুগল বলল, মুকুন্দপুরে আমাগো রাইজদার ম্যালা (অনেক) মানুষ আছে। হেরা (তারা) নানান কামকাইজে রোজই কইলকাতায় আহে (আসে)। তাগো কইয়া রাখছি, ঝিনুক বইনেরে দ্যাখলে য্যান (যেন) মুকুন্দপুরে লইয়া যায়। কিন্তুক কেও হেরে দ্যাখে নাই। আমিও যে কইলকাতায় আহি, দুই চৌখ মেইলা (মেলে) হেরে (তাকে) বিচারেই (খুঁজি)। কত মানুষ দেখি, খালি ঝিনুক বইনই বাদ। কী যে হইব তার বুক তোলপাড় করে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। ঝিনুককে যে পাওয়া যাবেই, এমন কথা তার মুখ থেকে আজ আর বেরুল না।
ঝুমাদের বাড়ি থেকে আসার পর তিনটে দিন মন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে বিনয়ের। ঝিনুকের জন্য মানসিক চাপ আর নিতে পারছে না সে। তাই একেবারে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল, তোমাদের মুকুন্দপুরের খবর কী?
তাদের কলোনির কথা উঠলেই যুগল একেবারে অন্য মানুষ। তার সারা শরীর যেন চনচন করতে থাকে। তখন তার কী যে উদ্দীপনা! জঙ্গল কেটে, হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মরণপণ লড়াই চালিয়ে, নতুন এক জনপদ গড়ে তুলছে, সে-জন্য উন্মাদনার শেষ নেই।
